ঢাকা ০২:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo গ্যাস সংকট আগের সরকারের পাপের ফল: ডা. জাহেদ Logo ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই-নির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চালু Logo প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যুবরাজ বিন সালমান Logo ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo সরকারের ১৮০ দিনের সালতামামি: ধ্বংসস্তূপ থেকে পরিকল্পিত পুনর্গঠনের পথে বাংলাদেশ Logo শিগগিরই জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করবে সরকার : নজরুল ইসলাম খান Logo রাষ্ট্র ও মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই সরকারের বড় সাফল্য:সালেহ শিবলী Logo শেখ হাসিনার কোন স্ট্যাটাসে ভারতে আছেন জানা নেই: চিফ প্রসিকিউটর Logo ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপনের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর Logo আগামীকাল কিশোরগঞ্জ সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী

নদীপথে নতুন গতি: সলিম উল্লাহর উদ্যোগে পুনরুজ্জীবনের পথে বিআইডব্লিউটিসি

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:২২:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬ ২৪৮ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের নদীনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালুর পর মাওয়া ফেরি সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংস্থাটির আয়ের একটি বড় উৎস কমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সংস্থাটিকে পুনরুজ্জীবিত ও আধুনিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সলিম উল্লাহ।

২০২৫ সালের ৬ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বিআইডব্লিউটিসিকে কার্যকর, আধুনিক ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। তার পরিকল্পনায় দ্বীপাঞ্চলের যোগাযোগ উন্নয়ন, দক্ষিণাঞ্চলের নৌরুট সম্প্রসারণ, বহর আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা গুরুত্ব পাচ্ছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর অবহেলিত দ্বীপাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ করতে কয়েকটি নতুন রুট চালু করা হয়েছে। চট্টগ্রামের বাঁশবাড়িয়া থেকে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া পর্যন্ত উপকূলীয় ফেরি সার্ভিস চালুর ফলে দ্বীপাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সমস্যার সমাধান হয়েছে। একই সঙ্গে মহেশখালী ও কক্সবাজার রুটে সি-ট্রাক সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার ফলে যাত্রী ও যানবাহন পরিবহন আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীসেবা বাড়ানোর লক্ষ্যেও নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা-ইলিশা-ঢাকা এবং ঢাকা-বেতুয়া-ঢাকা রুটে এমভি বাঙ্গালি ও এমভি মধুমতি জাহাজ চার্টার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন নির্মিত অত্যাধুনিক যাত্রীবাহী জাহাজ এমভি রূপসা ও এমভি সুগন্ধ্যা এসব রুটে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সংস্থার আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যেও চারটি কন্টেইনারবাহী জাহাজ চার্টার দেওয়া হয়েছে।

নৌপর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী প্যাডল স্টিমার পিএস মাহসুদকে ডকিং মেরামতের মাধ্যমে আবার চালু করা হয়েছে। বর্তমানে এটি ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে পর্যটন সার্ভিস হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে, যা যাত্রীদের নদীপথে ভ্রমণের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী নৌযানের অভিজ্ঞতা দিচ্ছে।

সংস্থার বহর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ৩৫টি নতুন জলযান নির্মাণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ছয়টি নতুন ফেরি বহরে যুক্ত হয়েছে এবং উপকূলীয় রোপেক্স ফেরি সংগ্রহের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

নৌযান পরিচালনায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। রাডার, ইকো সাউন্ডার, জিপিএস ও ভিএইচএফসহ আধুনিক নেভিগেশনাল প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। পাশাপাশি ভেসেল ট্র্যাকিং সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে নৌযানের চলাচল পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফেরি ও অন্যান্য নৌযানে সোলার সিস্টেম স্থাপন এবং গ্রিন ভেসেল ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব নৌপরিবহন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

যাত্রী নিরাপত্তা জোরদার করতেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নৌযানগুলোতে পর্যাপ্ত লাইফ সেভিং ও ফায়ার ফাইটিং সরঞ্জাম রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি নাবিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং দুর্যোগকালীন সতর্কবার্তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হয়েছে।

প্রশাসনিক জীবনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মো. সলিম উল্লাহ ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি নওগাঁ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

প্রতিষ্ঠাকালে বিআইডব্লিউটিসির বহরে ৬০০-এর বেশি জলযান থাকলেও বর্তমানে সচল জলযানের সংখ্যা প্রায় ৯০। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, আর্থিক সংকট এবং অবকাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে সংস্থাটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে নতুন পরিকল্পনার আওতায় বিদ্যমান আটটি ফেরি রুটের পাশাপাশি আরও আটটি সম্ভাব্য রুটের সমীক্ষা চলছে।

নৌপরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন রুট চালু, বহর আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বিআইডব্লিউটিসিকে নতুন করে গতিশীল করতে পারে। দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে সংস্থাটি আবারও দেশের নৌপরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
error: Content is protected !!

নদীপথে নতুন গতি: সলিম উল্লাহর উদ্যোগে পুনরুজ্জীবনের পথে বিআইডব্লিউটিসি

আপডেট সময় : ০৫:২২:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৫ মার্চ ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের নদীনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালুর পর মাওয়া ফেরি সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংস্থাটির আয়ের একটি বড় উৎস কমে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সংস্থাটিকে পুনরুজ্জীবিত ও আধুনিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়ে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সলিম উল্লাহ।

২০২৫ সালের ৬ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বিআইডব্লিউটিসিকে কার্যকর, আধুনিক ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। তার পরিকল্পনায় দ্বীপাঞ্চলের যোগাযোগ উন্নয়ন, দক্ষিণাঞ্চলের নৌরুট সম্প্রসারণ, বহর আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা গুরুত্ব পাচ্ছে।

দায়িত্ব গ্রহণের পর অবহেলিত দ্বীপাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত সহজ করতে কয়েকটি নতুন রুট চালু করা হয়েছে। চট্টগ্রামের বাঁশবাড়িয়া থেকে সন্দ্বীপের গুপ্তছড়া পর্যন্ত উপকূলীয় ফেরি সার্ভিস চালুর ফলে দ্বীপাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সমস্যার সমাধান হয়েছে। একই সঙ্গে মহেশখালী ও কক্সবাজার রুটে সি-ট্রাক সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার ফলে যাত্রী ও যানবাহন পরিবহন আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীসেবা বাড়ানোর লক্ষ্যেও নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা-ইলিশা-ঢাকা এবং ঢাকা-বেতুয়া-ঢাকা রুটে এমভি বাঙ্গালি ও এমভি মধুমতি জাহাজ চার্টার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন নির্মিত অত্যাধুনিক যাত্রীবাহী জাহাজ এমভি রূপসা ও এমভি সুগন্ধ্যা এসব রুটে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সংস্থার আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যেও চারটি কন্টেইনারবাহী জাহাজ চার্টার দেওয়া হয়েছে।

নৌপর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী প্যাডল স্টিমার পিএস মাহসুদকে ডকিং মেরামতের মাধ্যমে আবার চালু করা হয়েছে। বর্তমানে এটি ঢাকা-বরিশাল-ঢাকা রুটে পর্যটন সার্ভিস হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে, যা যাত্রীদের নদীপথে ভ্রমণের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী নৌযানের অভিজ্ঞতা দিচ্ছে।

সংস্থার বহর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ৩৫টি নতুন জলযান নির্মাণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ছয়টি নতুন ফেরি বহরে যুক্ত হয়েছে এবং উপকূলীয় রোপেক্স ফেরি সংগ্রহের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।

নৌযান পরিচালনায় প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। রাডার, ইকো সাউন্ডার, জিপিএস ও ভিএইচএফসহ আধুনিক নেভিগেশনাল প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। পাশাপাশি ভেসেল ট্র্যাকিং সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে নৌযানের চলাচল পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ফেরি ও অন্যান্য নৌযানে সোলার সিস্টেম স্থাপন এবং গ্রিন ভেসেল ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা জ্বালানি সাশ্রয় ও পরিবেশবান্ধব নৌপরিবহন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

যাত্রী নিরাপত্তা জোরদার করতেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নৌযানগুলোতে পর্যাপ্ত লাইফ সেভিং ও ফায়ার ফাইটিং সরঞ্জাম রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি নাবিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং দুর্যোগকালীন সতর্কবার্তা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হয়েছে।

প্রশাসনিক জীবনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মো. সলিম উল্লাহ ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি নওগাঁ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

প্রতিষ্ঠাকালে বিআইডব্লিউটিসির বহরে ৬০০-এর বেশি জলযান থাকলেও বর্তমানে সচল জলযানের সংখ্যা প্রায় ৯০। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, আর্থিক সংকট এবং অবকাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে সংস্থাটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। তবে নতুন পরিকল্পনার আওতায় বিদ্যমান আটটি ফেরি রুটের পাশাপাশি আরও আটটি সম্ভাব্য রুটের সমীক্ষা চলছে।

নৌপরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন রুট চালু, বহর আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বিআইডব্লিউটিসিকে নতুন করে গতিশীল করতে পারে। দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে সংস্থাটি আবারও দেশের নৌপরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।