ঢাকা ০৬:৩৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২১ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের জ্যেষ্ঠ নেতার পদোন্নতি সহ পিআরএল: রয়েছে শত কোটি টাকার লুটপাটের অভিযোগ! Logo দৈনিক সবুজ বাংলাদেশের সম্পাদক মোহাম্মদ মাসুদ এর জন্মদিন আজ Logo উন্নয়নের নামে লুটপাট: ডিএসসিসি এডিবি প্রকল্পে ‘১২ টেবিল’ ভাগাভাগি হয় ঘুষের টাকা  Logo বাংলাদেশ ভারত কোস্টগার্ডের তত্ত্বাবধানে ১৫১ জেলের মুক্তিতে বন্দি বিনিময়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস Logo জিয়া শিশু কিশোর মেলার কেন্দ্রীয় মিডিয়া সেল ঘোষণা Logo ঢাকা মহানগর দক্ষিণে স্বেচ্ছাসেবক দলের নির্বাচনী প্রচারণা টিম গঠন Logo ‘আওয়ামী প্রেতাত্মা’ পিডিপির নির্বাহী প্রকৌশলী মাইন উদ্দিন: ফতেহাবাদ সাবস্টেশনে চুরির ঘটনায় রহস্য! Logo গতকাল শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়ার মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাকেরগঞ্জ বিএনপির নেতারা Logo বিআরটিসিতে দুর্নীতির বরপুত্র চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা Logo শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে সমালোচনার ঝড়

অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) উদাসীন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৩৪:৫৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ মে ২০২৫ ৩৭১ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিবেদন: একসময়ের পরিচ্ছন্ন ও প্রাণবন্ত শহর, এখন অবৈধ স্থাপনার নগরীতে রূপ নিয়েছে। রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা, মার্কেট এবং বসতবাড়ি। অথচ এসব নির্মাণ বন্ধে আইনগত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কার্যত নির্বিকার। বারবার গণমাধ্যমে আলোচনার পরও তাদের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নগরবিদ ও সাধারণ নাগরিকরা।

📊 উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান

রাজউকের নিজস্ব তথ্য মতে, শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই রাজধানীতে ৩৫ হাজার অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি হয়। এর মধ্যে মাত্র ১,২৮৭টি স্থাপনার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, যা মোটের মাত্র ৩.৬৭%।
অন্যদিকে, বেসরকারি সংগঠন ‘নগর উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ ফোরাম’ এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ৮৭% বহুতল ভবন রাজউকের অনুমোদিত নকশাবহির্ভূতভাবে নির্মিত।

বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ ও পুরান ঢাকার বেশ কিছু এলাকায় রাজউকের নকশা বা অনুমোদন ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণ ও ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলোর অনেকগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই।

🏗️ উদাহরণ: খালের ওপর মার্কেট, মাঠে আবাসিক প্রকল্প

বেগুনবাড়ী খাল: রাজউকের নথি অনুযায়ী এটি একটি জলাধার এলাকা, অথচ বর্তমানে খালের পাশ ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ১৪টি দোকানপাট ও একটি চারতলা ভবন।

কুড়িল বিশ্বরোড: খাস জমি দখল করে গড়ে উঠেছে অন্তত ১১টি দোকান ও গুদামঘর।

খিলগাঁও শিশু পার্ক এলাকা: একটি খেলার মাঠের একাংশ ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ আবাসিক প্রকল্প।

⚖️ আইন আছে, প্রয়োগ নেই

রাজউকের কার্যক্রম পরিচালিত হয় Town Improvement Act, 1953 এবং Building Construction Rules অনুযায়ী। এসব আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অনুমোদনহীন কোনো ভবন নির্মাণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো ভবন নির্মাণের এক দশক পার হয়ে গেলেও রাজউক তা ভাঙছে না, বরং বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগও পেয়ে যাচ্ছে অনায়াসেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের এক কর্মকর্তা বলেন, “প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব অবৈধ নির্মাণ হয়েছে। আমরা অভিযান চালালে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল চাপ সৃষ্টি করে, ফলে আমরা অনেক সময় নীরব থাকতে বাধ্য হই।”

💬 নাগরিক সমাজের ক্ষোভ

অন্তর্ভুক্তি সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “রাজউক ইচ্ছা করলেই ঢাকাকে একটি নিরাপদ ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে দুর্নীতি, স্বচ্ছতার অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অবৈধ স্থাপনাগুলো দখল বজায় রাখছে।”

🚨 ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা বাড়ছে

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতে ২,৩৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা হয়েছে, যার অধিকাংশই রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত। এসব ভবনে অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা নেই, জরুরি বহির্গমন পথ নেই, এমনকি অনেক ভবনের স্থাপত্য কাঠামোই অস্থিতিশীল।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাড্ডায় একটি অনুমোদনহীন পাঁচতলা ভবন ধসে পড়ে তিনজন নিহত হন, আহত হন আরও সাতজন। রাজউকের নিকট ভবনটির কোনো নকশা বা ফাইল ছিল না।

🛑 দুদকের অনুসন্ধান ও প্রস্তাবনা

২০২৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজউকের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে, যারা অবৈধ ভবন নির্মাণের অনুমতি না দিলেও ‘চোখ বন্ধ রাখার’ বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করেছেন।
দুদক একটি সুপারিশ প্রতিবেদনে বলেছে,
“রাজউকে স্বচ্ছতা আনতে হলে ডিজিটাল নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে, এবং প্রতিটি নকশা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

 

অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে রাজউকের এই দীর্ঘদিনের নীরবতা এবং নির্লিপ্ততা নগরবাসীর নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। অবিলম্বে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত না করলে রাজধানী একটি বসবাসের অযোগ্য, অপরিকল্পিত, দুর্যোগপ্রবণ শহরে রূপ নেবে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এখনই সময় রাজউকের কাঠামোগত সংস্কার, দুর্নীতি রোধ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কার্যক্রম নিশ্চিত করার।

 

Loading

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
error: Content is protected !!

অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) উদাসীন

আপডেট সময় : ০১:৩৪:৫৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ মে ২০২৫

বিশেষ প্রতিবেদন: একসময়ের পরিচ্ছন্ন ও প্রাণবন্ত শহর, এখন অবৈধ স্থাপনার নগরীতে রূপ নিয়েছে। রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা, মার্কেট এবং বসতবাড়ি। অথচ এসব নির্মাণ বন্ধে আইনগত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কার্যত নির্বিকার। বারবার গণমাধ্যমে আলোচনার পরও তাদের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নগরবিদ ও সাধারণ নাগরিকরা।

📊 উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান

রাজউকের নিজস্ব তথ্য মতে, শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই রাজধানীতে ৩৫ হাজার অবৈধ স্থাপনার তালিকা তৈরি হয়। এর মধ্যে মাত্র ১,২৮৭টি স্থাপনার বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে, যা মোটের মাত্র ৩.৬৭%।
অন্যদিকে, বেসরকারি সংগঠন ‘নগর উন্নয়ন পর্যবেক্ষণ ফোরাম’ এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ৮৭% বহুতল ভবন রাজউকের অনুমোদিত নকশাবহির্ভূতভাবে নির্মিত।

বিশেষ করে মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ ও পুরান ঢাকার বেশ কিছু এলাকায় রাজউকের নকশা বা অনুমোদন ছাড়াই বহুতল ভবন নির্মাণ ও ব্যবহার করা হচ্ছে, যেগুলোর অনেকগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা পর্যন্ত নেই।

🏗️ উদাহরণ: খালের ওপর মার্কেট, মাঠে আবাসিক প্রকল্প

বেগুনবাড়ী খাল: রাজউকের নথি অনুযায়ী এটি একটি জলাধার এলাকা, অথচ বর্তমানে খালের পাশ ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ১৪টি দোকানপাট ও একটি চারতলা ভবন।

কুড়িল বিশ্বরোড: খাস জমি দখল করে গড়ে উঠেছে অন্তত ১১টি দোকান ও গুদামঘর।

খিলগাঁও শিশু পার্ক এলাকা: একটি খেলার মাঠের একাংশ ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ আবাসিক প্রকল্প।

⚖️ আইন আছে, প্রয়োগ নেই

রাজউকের কার্যক্রম পরিচালিত হয় Town Improvement Act, 1953 এবং Building Construction Rules অনুযায়ী। এসব আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অনুমোদনহীন কোনো ভবন নির্মাণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো ভবন নির্মাণের এক দশক পার হয়ে গেলেও রাজউক তা ভাঙছে না, বরং বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগও পেয়ে যাচ্ছে অনায়াসেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজউকের এক কর্মকর্তা বলেন, “প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় এসব অবৈধ নির্মাণ হয়েছে। আমরা অভিযান চালালে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল চাপ সৃষ্টি করে, ফলে আমরা অনেক সময় নীরব থাকতে বাধ্য হই।”

💬 নাগরিক সমাজের ক্ষোভ

অন্তর্ভুক্তি সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “রাজউক ইচ্ছা করলেই ঢাকাকে একটি নিরাপদ ও পরিকল্পিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে দুর্নীতি, স্বচ্ছতার অভাব এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অবৈধ স্থাপনাগুলো দখল বজায় রাখছে।”

🚨 ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা বাড়ছে

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতে ২,৩৪৮টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা হয়েছে, যার অধিকাংশই রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই নির্মিত। এসব ভবনে অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা নেই, জরুরি বহির্গমন পথ নেই, এমনকি অনেক ভবনের স্থাপত্য কাঠামোই অস্থিতিশীল।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাড্ডায় একটি অনুমোদনহীন পাঁচতলা ভবন ধসে পড়ে তিনজন নিহত হন, আহত হন আরও সাতজন। রাজউকের নিকট ভবনটির কোনো নকশা বা ফাইল ছিল না।

🛑 দুদকের অনুসন্ধান ও প্রস্তাবনা

২০২৪ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজউকের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে, যারা অবৈধ ভবন নির্মাণের অনুমতি না দিলেও ‘চোখ বন্ধ রাখার’ বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করেছেন।
দুদক একটি সুপারিশ প্রতিবেদনে বলেছে,
“রাজউকে স্বচ্ছতা আনতে হলে ডিজিটাল নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে, এবং প্রতিটি নকশা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।

 

অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে রাজউকের এই দীর্ঘদিনের নীরবতা এবং নির্লিপ্ততা নগরবাসীর নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। অবিলম্বে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত না করলে রাজধানী একটি বসবাসের অযোগ্য, অপরিকল্পিত, দুর্যোগপ্রবণ শহরে রূপ নেবে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এখনই সময় রাজউকের কাঠামোগত সংস্কার, দুর্নীতি রোধ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কার্যক্রম নিশ্চিত করার।

 

Loading