ঢাকা ০৫:২৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo গ্যাস সংকট আগের সরকারের পাপের ফল: ডা. জাহেদ Logo ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই-নির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চালু Logo প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যুবরাজ বিন সালমান Logo ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo সরকারের ১৮০ দিনের সালতামামি: ধ্বংসস্তূপ থেকে পরিকল্পিত পুনর্গঠনের পথে বাংলাদেশ Logo শিগগিরই জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করবে সরকার : নজরুল ইসলাম খান Logo রাষ্ট্র ও মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই সরকারের বড় সাফল্য:সালেহ শিবলী Logo শেখ হাসিনার কোন স্ট্যাটাসে ভারতে আছেন জানা নেই: চিফ প্রসিকিউটর Logo ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপনের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর Logo আগামীকাল কিশোরগঞ্জ সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী

সওজে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আজাদের ‘অদৃশ্য সাম্রাজ্য’ ও অবৈধ সম্পদ: পূর্বাচলে কয়েক কোটি টাকার প্লট

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৩:৫২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ২৪৮ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের মূল সংস্থা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট—যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি শুধু প্রভাব বিস্তারই করেননি, গড়ে তুলেছেন দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদের বিশাল নেটওয়ার্ক। অবৈধ টাকায় গড়েছেন রাজধানীতে শত কোটি টাকার প্লট সহ গোপন সম্পদের পাহাড়।

সম্পদের বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন:

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর বারিধারা ও পূর্বাচলে তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে একাধিক জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া টাঙ্গাইলে নিজ এলাকায় গড়ে উঠেছে বিস্তৃত জমি ও স্থাপনা। এসব সম্পদের বিপরীতে বৈধ আয়ের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

ট্রুথ কমিশন থেকে ফের প্রভাবশালী পদে:

২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে তিনি ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হন। পরবর্তীতে আবারও গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসেন। প্রশাসনের ভেতরের একাধিক সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তিনি একটি শক্তিশালী ‘নিরাপত্তা বলয়’ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

দুর্নীতির দায় স্বীকার ও আইনি জটিলতা

সরকারি নথি অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে ২০১২ সালে বিভাগীয় মামলা দায়ের হয় অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে। মামলাটি চলাকালে তিনি হাইকোর্টে রিট করেন, যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে কার্যক্রম স্থগিত থাকে।
এর আগে, একটি সড়ক প্রকল্পে অতিরিক্ত বিল প্রদান করে প্রায় ২১ লাখ টাকার অনিয়মের দায় স্বীকার করে ট্রুথ কমিশনে লিখিত স্বীকারোক্তিও দেন তিনি। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আংশিক অর্থ জমা দেন।

তিনস্তরের সিন্ডিকেটের অভিযোগ

সওজের ভেতরে তার নেতৃত্বে একটি ত্রিমুখী সিন্ডিকেট সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে— বদলি বাণিজ্য: পছন্দের পোস্টিংয়ের বিনিময়ে সুবিধা আদায়, প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ: টেন্ডার ও অনুমোদনে প্রভাব বিস্তার, অর্থপাচার নেটওয়ার্ক: বিদেশ সফরের আড়ালে অর্থ সরানোর অভিযোগ।

এই কার্যক্রমে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার নুরু ইসলামের নামও উঠে এসেছে, যিনি টেন্ডার ও প্রকল্প অনুমোদনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিদেশ সফর নিয়ে বিতর্ক

অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক কর্মকর্তার বিদেশ সফরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার বড় অংশ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও যুক্তরাজ্যকেন্দ্রিক। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ—উন্নয়নমূলক উদ্দেশ্যের আড়ালে এসব সফরকে ব্যবহার করা হয়েছে অর্থ পাচারের পথ হিসেবে।

সংস্কারের বদলে পুনর্বাসনের অভিযোগ

সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক সংস্কারের আলোচনা শুরু হলেও সওজে তার প্রতিফলন দৃশ্যমান নয়। বরং সাম্প্রতিক পদায়নে তাকে গুরুত্বপূর্ণ জোনে বসানো হয়েছে, যা অনেকের মতে সংস্কারের পরিবর্তে পুরনো প্রভাবশালীদের পুনর্বাসনের ইঙ্গিত।

জনদুর্ভোগ ও কৌশলী ব্যর্থতা

একাধিক কর্মকর্তা জানান, সিন্ডিকেটের একটি কৌশল হলো ‘ঠিকাদার সংকট’ তৈরি করে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটানো। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক অচল হয়ে পড়ে, বাড়ে জনদুর্ভোগ—কিন্তু দায় এড়াতে সক্ষম হন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা

প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সিন্ডিকেট শুধু একটি দপ্তরের সমস্যা নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি। এক সাবেক সচিবের ভাষায়,
“এ ধরনের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে না আনলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।”

সওজে দীর্ঘদিনের এই সিন্ডিকেট এখন সরকারের সংস্কার উদ্যোগের বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ.কে.এম আজাদ রহমান ও তার সহযোগীদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে না আনলে সড়ক উন্নয়ন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা—সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
error: Content is protected !!

সওজে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আজাদের ‘অদৃশ্য সাম্রাজ্য’ ও অবৈধ সম্পদ: পূর্বাচলে কয়েক কোটি টাকার প্লট

আপডেট সময় : ০৯:৫৩:৫২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের মূল সংস্থা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে এক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট—যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান। অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি শুধু প্রভাব বিস্তারই করেননি, গড়ে তুলেছেন দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সম্পদের বিশাল নেটওয়ার্ক। অবৈধ টাকায় গড়েছেন রাজধানীতে শত কোটি টাকার প্লট সহ গোপন সম্পদের পাহাড়।

সম্পদের বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন:

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীর বারিধারা ও পূর্বাচলে তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে একাধিক জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া টাঙ্গাইলে নিজ এলাকায় গড়ে উঠেছে বিস্তৃত জমি ও স্থাপনা। এসব সম্পদের বিপরীতে বৈধ আয়ের স্বচ্ছ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

ট্রুথ কমিশন থেকে ফের প্রভাবশালী পদে:

২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে তিনি ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হন। পরবর্তীতে আবারও গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরে আসেন। প্রশাসনের ভেতরের একাধিক সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তিনি একটি শক্তিশালী ‘নিরাপত্তা বলয়’ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

দুর্নীতির দায় স্বীকার ও আইনি জটিলতা

সরকারি নথি অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে ২০১২ সালে বিভাগীয় মামলা দায়ের হয় অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে। মামলাটি চলাকালে তিনি হাইকোর্টে রিট করেন, যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে কার্যক্রম স্থগিত থাকে।
এর আগে, একটি সড়ক প্রকল্পে অতিরিক্ত বিল প্রদান করে প্রায় ২১ লাখ টাকার অনিয়মের দায় স্বীকার করে ট্রুথ কমিশনে লিখিত স্বীকারোক্তিও দেন তিনি। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আংশিক অর্থ জমা দেন।

তিনস্তরের সিন্ডিকেটের অভিযোগ

সওজের ভেতরে তার নেতৃত্বে একটি ত্রিমুখী সিন্ডিকেট সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে— বদলি বাণিজ্য: পছন্দের পোস্টিংয়ের বিনিময়ে সুবিধা আদায়, প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ: টেন্ডার ও অনুমোদনে প্রভাব বিস্তার, অর্থপাচার নেটওয়ার্ক: বিদেশ সফরের আড়ালে অর্থ সরানোর অভিযোগ।

এই কার্যক্রমে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার নুরু ইসলামের নামও উঠে এসেছে, যিনি টেন্ডার ও প্রকল্প অনুমোদনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিদেশ সফর নিয়ে বিতর্ক

অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক কর্মকর্তার বিদেশ সফরের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যার বড় অংশ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও যুক্তরাজ্যকেন্দ্রিক। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ—উন্নয়নমূলক উদ্দেশ্যের আড়ালে এসব সফরকে ব্যবহার করা হয়েছে অর্থ পাচারের পথ হিসেবে।

সংস্কারের বদলে পুনর্বাসনের অভিযোগ

সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনিক সংস্কারের আলোচনা শুরু হলেও সওজে তার প্রতিফলন দৃশ্যমান নয়। বরং সাম্প্রতিক পদায়নে তাকে গুরুত্বপূর্ণ জোনে বসানো হয়েছে, যা অনেকের মতে সংস্কারের পরিবর্তে পুরনো প্রভাবশালীদের পুনর্বাসনের ইঙ্গিত।

জনদুর্ভোগ ও কৌশলী ব্যর্থতা

একাধিক কর্মকর্তা জানান, সিন্ডিকেটের একটি কৌশল হলো ‘ঠিকাদার সংকট’ তৈরি করে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটানো। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক অচল হয়ে পড়ে, বাড়ে জনদুর্ভোগ—কিন্তু দায় এড়াতে সক্ষম হন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা

প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের সিন্ডিকেট শুধু একটি দপ্তরের সমস্যা নয়, বরং পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি। এক সাবেক সচিবের ভাষায়,
“এ ধরনের প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে না আনলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।”

সওজে দীর্ঘদিনের এই সিন্ডিকেট এখন সরকারের সংস্কার উদ্যোগের বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ.কে.এম আজাদ রহমান ও তার সহযোগীদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে না আনলে সড়ক উন্নয়ন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা—সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।