“বেইলী রোডের অগ্নিদগ্ধ ৪৬ লাশ” কিছু প্রশ্ন ও উত্তর খোঁজার চেষ্টা
- আপডেট সময় : ১২:৪২:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬ ৪৮ বার পড়া হয়েছে

এইচ আর শফিক || রাজধানীর বেইলী রোড একসময় যেটি ছিল নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক আবহের কেন্দ্র, সময়ের সঙ্গে সেটি ধীরে ধীরে রূপ নেয় বাণিজ্যিক ও কর্পোরেট হাবে। সেই পরিবর্তনের ভেতরেই গড়ে ওঠে বহুতল ভবন ‘গ্রিন কোজি কটেজ’। আর সেই ভবনেই ২০২৪ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৪৬ জনের প্রাণহানির ঘটনা আজও রেখে গেছে অসংখ্য প্রশ্ন!
ঘটনার সূত্রপাত আরও আগে। ২০১১ সালে ভবনটির নকশা অনুমোদনের সময়ই অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ নিরাপত্তা বিধি মানা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সংস্থা রাজউক-এর দায়িত্ব ছিল বিল্ডিং কোড নিশ্চিত করা। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর অনুমোদনে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি নির্গমন পথ কিংবা কাঠামোগত সুরক্ষা ছাড়াই ভবনটি নির্মাণ করা হয়।
পরে অনুমোদিত নকশা অমান্য করে ভবনটি সাততলার বেশি সম্প্রসারণ করা হয় এবং আবাসিক ভবনটি পুরোপুরি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে। সেখানে গড়ে ওঠে একাধিক রেস্টুরেন্ট ও কফিশপ যাদের অনেকেরই ছিল না বৈধ ট্রেড লাইসেন্স বা অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা।
২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি রাত। হঠাৎ আগুন লাগে ভবনটির একটি রেস্টুরেন্টে। তদন্তে উঠে আসে, আগুন লাগার পরও প্রধান ফটক বন্ধ ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, বিল পরিশোধ ছাড়া কাউকে বের হতে না দেওয়ার অনিয়মিত প্রথার কারণে এই ফটক খোলা হয়নি। ফলে ভেতরে থাকা মানুষজন ধোঁয়া ও তাপের মধ্যে আটকা পড়ে যায়। অল্প সময়েই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
সিআইডির তদন্তে বলা হয়েছে, ভবনের ভেতরে দাহ্য উপকরণে তৈরি ইন্টেরিয়র, গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার এবং ছাদে অবৈধ স্থাপনার কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। খোলা জায়গার অভাব এবং সংকীর্ণ সিঁড়ি বের হওয়ার পথকে আরও কঠিন করে তোলে। অনেকেই দিক হারিয়ে ফেলেন, কেউ শ্বাসরোধে অচেতন হয়ে পড়েন।
এই ঘটনায় ২০ জন পুরুষ, ১৮ জন নারী ও ৮ জন শিশুসহ মোট ৪৬ জন প্রাণ হারান। জীবিত উদ্ধার করা হয় ৭৫ জনকে। ঘটনার পর রাজধানীজুড়ে রেস্তোরাঁ ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় অভিযান চালানো হয় এবং শত শত প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি আইনের আওতায় আসে। সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে রাজউক কী মৃত্যু খেলা খেলছে প্রতিদিন!
দুই বছর আগে বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ এর সাততলা ভবনে আগুন লেগে ৪৬ জনের মৃত্যুর মামলায় ২২ জনকে অভিযুক্ত করে সিআইডির দেওয়া অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছে আদালত। বিচারিক আদলাত বিষয়ে প্রশ্ন তোলা আমাদের কাজ নয় হয়ত, আমি সজ্ঞানে তা করতেও চাইনি। শুধু প্রশ্ন তুলতে চেয়েছি; যারা ভবনটি নির্মাণ করলেন আর যে সংস্থা ও তাঁদের কর্তারা যারা সব কিছুর বৈধতা দিলেন- তারা কী কোনো ভাবেই অভিযুক্ত নয়?
প্রশ্ন থেকেই যায়, এত বড় প্রাণহানির পরও ভবন অনুমোদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিচারিক অগ্রগতি নেই কেন? অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগসূত্রের কারণে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদি তাই তবে আগামীতে এমন ঘটনার জন্ম অস্বাভাবিক কিছু হবে কী ?
রাজউকের মত প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার কোন দায়-ই নেবে না।
অভিযোগপত্রে তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক শাহজালাল মুন্সী সূত্র ধরেও যদি দেখি, তদন্তে জানা যায়, ভবনটির অনুমোদিত নকশা অমান্য করে নবম তলা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয় এবং আবাসিক অংশসহ পুরো ভবনই বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল।’ এখানেও কি দায় নেই রাজউকের ?
নিহতদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা এখনো ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। তাদের দাবি, এই ট্র্যাজেডি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয় এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতার ফল। তারা সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় আনতে নতুন করে কর্মসূচি নেওয়ার কথাও ভাবছেন।
বেইলী রোডের সেই আগুন নিভে গেছে, কিন্তু ৪৬টি প্রাণের বিনিময়ে ওঠা প্রশ্নগুলো এখনো জ্বলছে; কেন নিরাপত্তা ছিল না, কেন তদারকি হয়নি, আর কেন এখনো জবাবদিহি নেই?
























