ঢাকা ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৩ মার্চ ২০২৪, ২০ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo ১৭ মার্চ ও ২৬ মার্চের আহ্বায়কসহ তিনজনকে প্রত্যাহারের আহ্বান কুবি শিক্ষক সমিতির Logo সিলেটে সাইবার ট্রাইব্যুনালে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের Logo ড. ইউনূসের মামলা পর্যবেক্ষণ করছে জাতিসংঘ Logo কাভার্ডভ্যান ও অটোরিকশার সংঘর্ষে ছাত্র নিহত, আহত ৩ Logo রাজশাহীতে যুবলীগ কর্মীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৫ Logo এবার ঢাবি অধ্যাপক নাদিরের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ  Logo সন্দ্বীপ থানার ওসির পিপিএম পদক লাভ Logo মালয়েশিয়ায় ১৩৪ বাংলাদেশি গ্রেফতার Logo শাবির ছাত্রীহলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্থাপন, কমবে চুরি ও বহিরাগত প্রবেশ, বাড়বে নিরাপত্তা Logo গণতন্ত্র মঞ্চের কর্মসূচিতে হামলার নিন্দা ১২ দলীয় জোটের




বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৯:১৬:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩ ৩২৯ বার পড়া হয়েছে

বর্জ্য হলো বিভিন্ন উৎস থেকে আসা যে সব পদার্থ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে আসে না, তাকে বর্জ্য বলে। বর্জ্য সাধারণত কঠিন, তরল, গ্যাসীয়, বিষাক্ত ও বিষহীন- এই পাঁচ প্রকারের হয়ে থাকে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে আবর্জনা সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পূণর্ব্যবহার এবং নিষ্কাশনের সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বোঝায়। সাধারণত মানুষের কার্যকলাপে সৃষ্ট অপ্রয়োজনীয় বস্তুসমূহ সংক্রান্ত কাজগুলোকে বুঝানো হয়ে থাকে; ঐ বস্তুগুলোর থেকে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ক্ষতিকারক প্রভাব প্রশমিত করার জন্য, কিংবা পরিবেশের সৌন্দর্য্য রক্ষার কাজগুলোই এই প্রক্রিয়াতে অন্তর্ভুক্ত হয়। এছাড়াআবর্জনা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আবর্জনা থেকে পরিবেশের ক্ষতি রোধ করার কাজ এবং আবর্জনা থেকে পূণর্ব্যবহারযোগ্য বস্তু আহরণ সংক্রান্ত কাজও করা হয়ে থাকে। এতে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি এবং দক্ষতার দ্বারা কঠিন, তরল কিংবা বায়বীয় বর্জ্য সংক্রান্ত কাজ করা হয়। সমন্বিত এবং সম্পূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনটি R নীতি প্রয়োগ করা হয়। তিনটি R নীতি হলো- Reduce (কমানো), Re-use (পুনব্যবহার) এবং Recycle (পুনশ্চক্রীকরণ) ।

জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর।বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা অতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর সেসাথে বাড়ছে মানুষজনের তৈরি আবর্জনাও। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে শহরাঞ্চলে কঠিন বর্জ্য উৎপাদন বাড়ছে। আলমগীর এবং আহসান (2007) এর রিপোর্ট অনুসারে, বাংলাদেশের ছয়টি প্রধান শহর যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল এবং সিলেট থেকে প্রতিদিন মোট 7690 টন মিউনিসিপ্যাল কঠিন বর্জ্য (MSW) উৎপন্ন হয়, যেখানে ঢাকা শহরটি মোট বর্জ্য প্রবাহের 69% অবদান রাখে। সমগ্র বর্জ্য প্রবাহের গঠন প্রায় 74.4% জৈব পদার্থ, 9.1% কাগজ, 3.5% প্লাস্টিক, 1.9% টেক্সটাইল এবং কাঠ, 0.8% চামড়া এবং রাবার, 1.5% ধাতু, 0.8% কাচ এবং 8% অন্যান্য বর্জ্য। বর্জ্য সংমিশ্রণে অবদান রাখার কারণগুলি হল জনসংখ্যার ঘনত্ব, জীবনধারা, অর্থনৈতিক অবস্থা, ফলের ঋতু, জলবায়ু, পুনর্ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি।বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় 25,000 টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়, প্রতি বছর মাথাপিছু 170 কিলোগ্রাম (কেজি) হয় । তাই এ শহরের ক্ষেত্রে বর্জ্য সংগ্রহ করে তা আবর্জনার স্তূপে পাঠিয়ে দেয়ার পরিবর্তেপ্রয়োজন পরিকল্পিত সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

বাংলাদেশের পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আইনি কাঠামো গড়ে উঠেছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের উপর ভিত্তি করে। এছাড়াও জাতীয় সংসদে প্রণীত আইন, নিয়মাবলী, উপ-আইন ও বিভিন্ন বিধিমালা নিয়ে এ ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়ে থাকে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ (১) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, “জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন।” এছাড়াও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ২০১১ সালের ৩০ জুন পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১৮ (ক) ধারা যোগ করা হয়। নতুন এই ধারায় বলা হয়েছে যে, “রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণির সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।”

বাংলাদেশে পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সর্ম্পকিত যে সকল পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইন, বিধিমালা ও আদেশ রয়েছে সেগুলো হলো- (১) বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫, (২) বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধিত), ২০০০, (৩) বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধিত), ২০০২, (৪) বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধিত), ২০১০, (৫) পরিবেশ আদালত আইন, ২০০০, (৬) পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭, (৭) পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা (সংশোধিত ফেব্রুয়ারি), ১৯৯৭, (৮) পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা (সংশোধিত আগস্ট), ১৯৯৭, (৯) পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ (সংশোধিত ২০০৫), (১০) পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ (সংশোধিত ২০১০)। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত যেসকল বিধিমালা ও আদেশ রয়েছে সেগুলো হলো- (১) চিকিৎসা-বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা, ২০০৮, (২) বিপদজনক বর্জ্য ও জাহাজ ভাঙ্গার বর ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১১, (৩) ইলেকট্রিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক পণ্য হইতে সৃষ্ট বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৭ (খসড়া)।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ সিটি কর্পোরেশন ও ও পৌরসভাগুলোতে বর্জ্য ডাম্পিং করা হয় খোলা স্থানে। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন তাদের সংগ্রহকৃত বর্জ্য সিটিবাইপাস এলাকায় রাখে তেমনিভাবে , সিলেট সিটি কর্পোরেশন সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ রোডের পাশে, খুলনা সিটি কর্পোরেশন রাজবাদ, শায়লা, মাথাভাঙ্গা, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন হালিশহর ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন ঝাকুনি পাড়া এলাকায় সব ধরনের বর্জ্য ডাম্পিং করে।

কিন্তু বর্তমান সময়ে বিভিন বিদেশি সংস্থার সহযোগিতায় সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা (জাইকা) এর যৌথ উদ্যোগে ঢাকার কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ক্লিন ঢাকা মাস্টার প্ল্যান নামে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সোশ্যাল বিজনেস এন্টারপ্রাইজ ওয়েস্ট কনসার্ন, বাসাবাড়ি পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ করছে। তেমনি ইউনিসেফ সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করেছে।

“কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি” “বাংলাদেশ পরিবেশ সুরক্ষা আইন ১৯৯৫” অনুসারে পরিবেশ অধিদপ্তর দ্বারা লেখা হয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিতে জৈব এবং অজৈব আবর্জনা পৃথক করার জন্য একটি ধারা রয়েছে। আইনে বলা হয়েছে যে জৈব এবং অজৈব আবর্জনা আলাদা করতে ব্যর্থ হলে পুনরাবৃত্তির জন্য সর্বোচ্চ ২,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৪,০০০ টাকা জরিমানা হতে পারে।

নতুন নীতি বিশেষ করে আবর্জনাকে সম্পদে রূপান্তরিত করার জন্য পুনর্ব্যবহার করতে সহায়তা করবে, যা জাতির উপর একটি উল্লেখযোগ্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলবে। দেশে একটি শক্তিশালী পুনর্ব্যবহারযোগ্য খাত গড়ে তোলার জন্য, সরকার জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অধীনে “3-R প্রকল্প” এবং ” ৬৪ টি জেলায় কম্পোস্টিং” সহ বেশ কয়েকটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশ সরকার ভিশন ২০২১ এবং ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়িত করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ঢাকাসহ দেশের সব বিভাগীয় শহর কমিউনিটি-ভিত্তিক ট্র্যাশ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছে। বেশ কয়েকটি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে, বাসাবাড়ি থেকে পচনশীল এবং অ-পচনশীল আবর্জনা আলাদাভাবে সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই আবর্জনার সাহায্যে, কম্পোস্ট সার এবং নবায়নযোগ্য শক্তি প্রদানের জন্য একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শোধনাগার তৈরি করা হয়েছে। সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে হবে।বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য ঝুঁকি, শহুরে বসবাসযোগ্যতা এবং অর্থনৈতিক উদ্বেগকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সামগ্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে মোকাবেলা করা উচিত। এই ধরনের একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিস্থিতির জরুরিতার দিকে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য সম্পদের একত্রিতকরণকে উৎসাহিত করতে পারে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি SDG 11 (sustainable cities and communities) অর্জনকে উত্সাহিত করতে পারে এবং SDG 7 (affordable and clean energy) এর মতো অন্যান্য লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলি সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের মেনে চলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা প্রদান করবে এবং শহরগুলিতে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কাঠামো এবং অনুশীলনগুলি বিকাশের জন্য স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সহযোগিতা পরিচালনা করবে। একমাত্র সম্মিলিত ও সমন্বিত পদ্ধতির মাধ্যমেই বাংলাদেশের শহরগুলি নিরাপদ, বসবাসযোগ্য এবং সম্পদপূর্ণ হয়ে উঠবে।

 

মো. নাজিরুল হাসান বাইজিদ
লোক প্রশাসন বিভাগ,কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :




বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ০৯:১৬:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

বর্জ্য হলো বিভিন্ন উৎস থেকে আসা যে সব পদার্থ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে আসে না, তাকে বর্জ্য বলে। বর্জ্য সাধারণত কঠিন, তরল, গ্যাসীয়, বিষাক্ত ও বিষহীন- এই পাঁচ প্রকারের হয়ে থাকে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বলতে আবর্জনা সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পূণর্ব্যবহার এবং নিষ্কাশনের সমন্বিত প্রক্রিয়াকে বোঝায়। সাধারণত মানুষের কার্যকলাপে সৃষ্ট অপ্রয়োজনীয় বস্তুসমূহ সংক্রান্ত কাজগুলোকে বুঝানো হয়ে থাকে; ঐ বস্তুগুলোর থেকে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ক্ষতিকারক প্রভাব প্রশমিত করার জন্য, কিংবা পরিবেশের সৌন্দর্য্য রক্ষার কাজগুলোই এই প্রক্রিয়াতে অন্তর্ভুক্ত হয়। এছাড়াআবর্জনা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আবর্জনা থেকে পরিবেশের ক্ষতি রোধ করার কাজ এবং আবর্জনা থেকে পূণর্ব্যবহারযোগ্য বস্তু আহরণ সংক্রান্ত কাজও করা হয়ে থাকে। এতে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি এবং দক্ষতার দ্বারা কঠিন, তরল কিংবা বায়বীয় বর্জ্য সংক্রান্ত কাজ করা হয়। সমন্বিত এবং সম্পূর্ণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনটি R নীতি প্রয়োগ করা হয়। তিনটি R নীতি হলো- Reduce (কমানো), Re-use (পুনব্যবহার) এবং Recycle (পুনশ্চক্রীকরণ) ।

জনসংখ্যার ঘনত্বের দিক থেকে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর।বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে স্থানান্তরিত হওয়ার কারণে ঢাকা শহরের জনসংখ্যা অতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর সেসাথে বাড়ছে মানুষজনের তৈরি আবর্জনাও। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে শহরাঞ্চলে কঠিন বর্জ্য উৎপাদন বাড়ছে। আলমগীর এবং আহসান (2007) এর রিপোর্ট অনুসারে, বাংলাদেশের ছয়টি প্রধান শহর যেমন ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল এবং সিলেট থেকে প্রতিদিন মোট 7690 টন মিউনিসিপ্যাল কঠিন বর্জ্য (MSW) উৎপন্ন হয়, যেখানে ঢাকা শহরটি মোট বর্জ্য প্রবাহের 69% অবদান রাখে। সমগ্র বর্জ্য প্রবাহের গঠন প্রায় 74.4% জৈব পদার্থ, 9.1% কাগজ, 3.5% প্লাস্টিক, 1.9% টেক্সটাইল এবং কাঠ, 0.8% চামড়া এবং রাবার, 1.5% ধাতু, 0.8% কাচ এবং 8% অন্যান্য বর্জ্য। বর্জ্য সংমিশ্রণে অবদান রাখার কারণগুলি হল জনসংখ্যার ঘনত্ব, জীবনধারা, অর্থনৈতিক অবস্থা, ফলের ঋতু, জলবায়ু, পুনর্ব্যবহার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি।বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় 25,000 টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়, প্রতি বছর মাথাপিছু 170 কিলোগ্রাম (কেজি) হয় । তাই এ শহরের ক্ষেত্রে বর্জ্য সংগ্রহ করে তা আবর্জনার স্তূপে পাঠিয়ে দেয়ার পরিবর্তেপ্রয়োজন পরিকল্পিত সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

বাংলাদেশের পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আইনি কাঠামো গড়ে উঠেছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের উপর ভিত্তি করে। এছাড়াও জাতীয় সংসদে প্রণীত আইন, নিয়মাবলী, উপ-আইন ও বিভিন্ন বিধিমালা নিয়ে এ ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়ে থাকে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮ (১) ধারায় স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, “জনস্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন।” এছাড়াও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ২০১১ সালের ৩০ জুন পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১৮ (ক) ধারা যোগ করা হয়। নতুন এই ধারায় বলা হয়েছে যে, “রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব-বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণির সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।”

বাংলাদেশে পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সর্ম্পকিত যে সকল পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত আইন, বিধিমালা ও আদেশ রয়েছে সেগুলো হলো- (১) বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫, (২) বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধিত), ২০০০, (৩) বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধিত), ২০০২, (৪) বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (সংশোধিত), ২০১০, (৫) পরিবেশ আদালত আইন, ২০০০, (৬) পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭, (৭) পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা (সংশোধিত ফেব্রুয়ারি), ১৯৯৭, (৮) পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা (সংশোধিত আগস্ট), ১৯৯৭, (৯) পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ (সংশোধিত ২০০৫), (১০) পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ (সংশোধিত ২০১০)। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত যেসকল বিধিমালা ও আদেশ রয়েছে সেগুলো হলো- (১) চিকিৎসা-বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা, ২০০৮, (২) বিপদজনক বর্জ্য ও জাহাজ ভাঙ্গার বর ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১১, (৩) ইলেকট্রিক্যাল এবং ইলেকট্রনিক পণ্য হইতে সৃষ্ট বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৭ (খসড়া)।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ সিটি কর্পোরেশন ও ও পৌরসভাগুলোতে বর্জ্য ডাম্পিং করা হয় খোলা স্থানে। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন তাদের সংগ্রহকৃত বর্জ্য সিটিবাইপাস এলাকায় রাখে তেমনিভাবে , সিলেট সিটি কর্পোরেশন সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ রোডের পাশে, খুলনা সিটি কর্পোরেশন রাজবাদ, শায়লা, মাথাভাঙ্গা, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন হালিশহর ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন ঝাকুনি পাড়া এলাকায় সব ধরনের বর্জ্য ডাম্পিং করে।

কিন্তু বর্তমান সময়ে বিভিন বিদেশি সংস্থার সহযোগিতায় সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা (জাইকা) এর যৌথ উদ্যোগে ঢাকার কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ক্লিন ঢাকা মাস্টার প্ল্যান নামে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সোশ্যাল বিজনেস এন্টারপ্রাইজ ওয়েস্ট কনসার্ন, বাসাবাড়ি পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ করছে। তেমনি ইউনিসেফ সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করেছে।

“কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি” “বাংলাদেশ পরিবেশ সুরক্ষা আইন ১৯৯৫” অনুসারে পরিবেশ অধিদপ্তর দ্বারা লেখা হয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিতে জৈব এবং অজৈব আবর্জনা পৃথক করার জন্য একটি ধারা রয়েছে। আইনে বলা হয়েছে যে জৈব এবং অজৈব আবর্জনা আলাদা করতে ব্যর্থ হলে পুনরাবৃত্তির জন্য সর্বোচ্চ ২,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৪,০০০ টাকা জরিমানা হতে পারে।

নতুন নীতি বিশেষ করে আবর্জনাকে সম্পদে রূপান্তরিত করার জন্য পুনর্ব্যবহার করতে সহায়তা করবে, যা জাতির উপর একটি উল্লেখযোগ্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলবে। দেশে একটি শক্তিশালী পুনর্ব্যবহারযোগ্য খাত গড়ে তোলার জন্য, সরকার জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অধীনে “3-R প্রকল্প” এবং ” ৬৪ টি জেলায় কম্পোস্টিং” সহ বেশ কয়েকটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশ সরকার ভিশন ২০২১ এবং ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়িত করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ঢাকাসহ দেশের সব বিভাগীয় শহর কমিউনিটি-ভিত্তিক ট্র্যাশ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছে। বেশ কয়েকটি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে, বাসাবাড়ি থেকে পচনশীল এবং অ-পচনশীল আবর্জনা আলাদাভাবে সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই আবর্জনার সাহায্যে, কম্পোস্ট সার এবং নবায়নযোগ্য শক্তি প্রদানের জন্য একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শোধনাগার তৈরি করা হয়েছে। সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করতে হবে।বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, স্বাস্থ্য ঝুঁকি, শহুরে বসবাসযোগ্যতা এবং অর্থনৈতিক উদ্বেগকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সামগ্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে মোকাবেলা করা উচিত। এই ধরনের একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিস্থিতির জরুরিতার দিকে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য সম্পদের একত্রিতকরণকে উৎসাহিত করতে পারে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি SDG 11 (sustainable cities and communities) অর্জনকে উত্সাহিত করতে পারে এবং SDG 7 (affordable and clean energy) এর মতো অন্যান্য লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলি সমস্ত স্টেকহোল্ডারদের মেনে চলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা প্রদান করবে এবং শহরগুলিতে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কাঠামো এবং অনুশীলনগুলি বিকাশের জন্য স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সহযোগিতা পরিচালনা করবে। একমাত্র সম্মিলিত ও সমন্বিত পদ্ধতির মাধ্যমেই বাংলাদেশের শহরগুলি নিরাপদ, বসবাসযোগ্য এবং সম্পদপূর্ণ হয়ে উঠবে।

 

মো. নাজিরুল হাসান বাইজিদ
লোক প্রশাসন বিভাগ,কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়