৭ দিনের নোটিশে এক বছর পার : অভিযোগ প্রমাণের পরেও বহাল অধ্যক্ষ

সকালের সংবাদ ডেস্ক;সকালের সংবাদ ডেস্ক;
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ১১:৪০ অপরাহ্ণ, ০৬ জুলাই ২০২০

অনলাইন ডেস্কঃ ২০১৯ সালের ৩০ জুলাই বাঞ্ছারামপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রহিমকে শোকজ করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর। অধ্যক্ষ নিয়োগের পরীক্ষায় জালিয়াতি ও তথ্য গোপন, বিধি লঙ্ঘন ও শিক্ষার্থীদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কেন এমপিও বাতিল করা হবে না- নোটিশে তা জানতে চেয়ে ৭ কর্ম দিবসের মধ্যে জবাব চাওয়া হয়। এক বছর পার হলেও শেষ হয়নি সেই ৭ দিন! প্রতিষ্ঠানে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, অধ্যক্ষ আবদুর রহিম বহাল তবিয়তেই তা করে যাচ্ছেন।

এছাড়া, অধ্যক্ষ আবদুর রহিম তার স্ত্রী রত্না খানমকে ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলা বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেন। সেক্ষেত্রেও তিনি জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। অবৈধ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দিয়ে তাকে প্রতি মাসে ২৩ হাজার ৫শ’ টাকা করে বেতন দিয়ে যাচ্ছেন, যা অস্বাভাবিক। শুধু তাই নয়, স্ত্রীর চাকরি সরকারিকরণের লক্ষ্যে অবৈধভাবে পদায়নের প্রস্তাব করাও রয়েছে।

নিজের নিয়োগে অনিয়ম, প্রতিষ্ঠানের অর্থ তছরুপ, স্ত্রীকে অবৈধ নিয়োগসহ বহু অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে। কিন্তু অদৃশ্য ক্ষমতাবলে তিনি স্বপদেই বহাল আছেন। এতো অভিযোগের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কোনো অ্যাকশন না আসায় তিনি ধরাকে সরাজ্ঞান করছেন। ১০ বছর ধরে তার নানাবিধ অপকর্ম চলমান থাকায় এই অধ্যক্ষের ক্ষমতার উৎস নিয়ে হতবাক সবাই। আদৌ তাকে থামানো যাবে কি-না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

এ বিষয়ে মাউশির সহকারী পরিচালক (বেসরকারি কলেজ শাখা) মোঃ আব্দুল কাদের বলেন, ‘অধ্যক্ষ আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন দুদকের কাছে পাঠানো হয়েছে। দুদকের পক্ষ থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অভিযোগ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে সুপারিশ করা হবে। মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে’।

এমপিও বাতিল বিষয়ে শোকজ করা হলেও এখনো কেন বাতিল হয়নি, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একজন শিক্ষকের এমপিও পাওয়া অনেক কষ্টের। কিন্তু কেড়ে নেয়াটা সহজ। একবার বাতিল হলে আবার পাওয়াটাও অনেক ঝামেলার। তাই অভিযোগের সত্যতার শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে এমপিও বাতিল করাটা ঠিক হবে না’।

বাঞ্চারামপুর উপজেলার বর্তমান নির্বাহী কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, ‘অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি ও তার স্ত্রীর নিয়োগে অবৈধ প্রক্রিয়ার তদন্ত রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। এক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে আর কিছু করণীয় নেই।’

অধ্যক্ষের নিয়োগে জালিয়াতি ও তথ্য গোপনঃ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আব্দুর রহিম অধ্যক্ষ নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৭ম স্থান অর্জন করেছিলেন। সেই পরীক্ষার খাতার কপি নাগরিক বার্তার হাতে রয়েছে, যাতে দেখা যাচ্ছে- উত্তরের পাশে দেওয়া নম্বর কেটে বাড়িয়ে মোট প্রাপ্ত ১৭ এর স্থলে ২৭ নম্বর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মৌখিক পরীক্ষার নম্বর শিটের ৪/৫টি কপিও পাওয়া গেছে। সেগুলোয় দেখা যায়, একেকটায় একেক নম্বর দেওয়া হয়েছে। মৌখিক পরীক্ষায় তাকে সর্বোচ্চ নম্বর দেওয়া হলেও প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় অবস্থানে আসতে পারেননি তিনি।

কলেজের একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, অবৈধভাবে এই অধ্যক্ষ নিয়োগে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন বাঞ্ছারামপুর সরকারি কলেজের (সাবেক বাঞ্ছারামপুর ডিগ্রি কলেজ) সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি সিরাজুল ইসলামসহ গভর্নিং বডির একাংশ।

তারা আরো বলেন, অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুর রহিমের নিয়োগ বৈধ নয়। নিয়োগ জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি এ কলেজে যোগদান করেছেন। শুধু তাই নয়, এর আগে ২০০৫ সালে যে প্রতিষ্ঠানে তিনি কর্মরত ছিলেন সেখানে শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডের দায়ে তাকে বরখাস্ত করা হয়। ওই সমস্ত তথ্য গোপন করে তিনি এখানে যোগ দেন।

জানা যায়, আব্দুর রহিম ২০১০ সালের ৩ আগস্ট বাঞ্ছারামপুর সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। এর আগে তিনি মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার এম এ রউফ ডিগ্রি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। কর্মরত অবস্থায় ২০০৫ সালের ৬ জুন আর্থিক কেলেঙ্কারি, শ্রেণি কক্ষে তাস খেলাসহ নয়টি অভিযোগে ওই কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। কিন্তু এ তথ্য গোপন রেখে জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্র তৈরি করেন।

২০১০ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে এম এ রউফ ডিগ্রি কলেজের বিভাগীয় তদন্ত চলমান ছিল। সে ক্ষেত্রে বাঞ্ছারামপুর ডিগ্রি কলেজে অধ্যক্ষ পদে যোগদানের কোনো সুযোগ থাকার কথা নয় বা সেটি বৈধ নয়। পরবর্তী সময়ে বাঞ্ছারামপুরের তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মামুন সরদার অধ্যক্ষ আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগের তদন্ত করে সবগুলোর সত্যতা পান।

অধ্যক্ষের স্ত্রীর নিয়োগে জালিয়াতিঃ
কলেজ সূত্রে জানা যায়, অধ্যক্ষ আব্দুর রহিমের স্ত্রী রত্না খানম ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগ পরীক্ষা দেন। তবে এ পরীক্ষায় তিনি চতুর্থ হলেও ৯ মাস পর তাকেই নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর স্বামী অধ্যক্ষ আব্দুর রহিমের সহযোগিতায় তথ্য জালিয়াতি করে এমপিওভুক্তও হন।

এরপর জাতীয়করণ করা হলে ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট শিক্ষা অধিদপ্তর কুমিল্লা অঞ্চল থেকে পরিদর্শন টিম বাঞ্ছারামপুর ডিগ্রি কলেজ ভিজিট করে। সে সময় অধ্যক্ষ আব্দুর রহিম নিজের এবং স্ত্রী রত্না খানমের চাকরির নিয়োগ সংক্রান্ত প্রকৃত তথ্য গোপন করে চাকরি জাতীয়করণের লক্ষ্যে জালিয়াতি করে তৈরি করা কাগজ প্রদর্শন করেন।

প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়মঃ
অধ্যক্ষ আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। কলেজের দুটি অভ্যন্তরীণ হিসাব নিরীক্ষা কমিটি তার বিরুদ্ধে ৫৬ হাজার ৯৪৫ টাকা ও ২ লাখ ৭১ হাজার ৮৬৯ টাকার আর্থিক অনিয়ম পান। পরবর্তী সময়ে ইউএনও এবং দুদকের তদন্তেও জালিয়াতির সত্যতা পাওয়া যায়। তবে প্রভাব খাটিয়ে এ বিষয়টিকেও ধামাচাপা দিয়ে দেন অধ্যক্ষ।

সকল অভিযোগ প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ আবদুর রহিম বলেন, ‘আমি অন্য জেলার মানুষ। চাকরি সূত্রে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আছি। যতো দুর্নীতি-জালিয়াতির অভিযোগ করা হচ্ছে, এগুলো সত্যি হলে অন্য জেলার মানুষ হয়ে এখানে টিকে থাকতে পারতাম না। শুরু থেকেই একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা আমাকে এখানে সরাতে বিভিন্ন সময় আমার বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।’

আপনার মতামত লিখুন :