অভিযোগের পাহাড় পেরিয়েও বহাল তবিয়তে ফায়ার সার্ভিসের ডিজি
- আপডেট সময় : ০১:০৯:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬ ৭৩১ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল–এর বিরুদ্ধে গত কয়েক বছরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগ–বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া থেকে শুরু করে বিভাগীয় অনিয়মের ঘটনায় নীরব থাকা—সব মিলিয়ে বিতর্ক যেন তার পিছু ছাড়ছে না। তবে এসব অভিযোগের পরও তিনি এখনো স্বপদে বহাল রয়েছেন।
নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ
২০২৫ সালের ফায়ার সার্ভিসের নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। চাকরিপ্রার্থীদের একাংশ দাবি করেন, পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্নপত্র একটি চক্রের মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রার্থীদের হাতে পৌঁছে যায়। অভিযোগ রয়েছে, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। একাধিক সংবাদমাধ্যম ও অনলাইন প্লাটফর্মে এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রমাণ ছড়িয়ে পড়ার পরেও নিশ্চুপ থেকেছেন ডিজি। ফায়ার সার্ভিসের নাম প্রকাশ্য অনিচ্ছুক একটি সূত্র দাবি করেছে জায়েদ কামালের নির্দেশেই হয়েছে নিয়োগ বাণিজ্য। চাকরি প্রত্যাশীদের বিভিন্ন হোটেলে টিম অনুসারে অবস্থান করা, পরীক্ষার ফলাফলে সিরিয়ালে ধারাবাহিক উত্তীর্ণ হওয়া সহ নানা অসঙ্গতি স্পষ্ট হয় সেই সময় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব বিষয়ে কোন প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ দূরের কথা সামান্য তদন্ত পর্যন্ত করা হয়নি।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ ও সংবাদ সম্মেলনে ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল, জড়িতদের শাস্তি এবং ডিজির অপসারণ দাবি করেন। তাদের অভিযোগ, এত বড় অনিয়মের পরও শীর্ষ পর্যায় থেকে দৃশ্যমান কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ‘রক্ষা’ করার অভিযোগ
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন মধ্য ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংবাদপত্রে একাধিক দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পরও ডিজি হিসেবে জাহেদ কামাল প্রকাশ্যে কোনো ব্যাখ্যা দেননি—এমন অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের তথ্য সামনে আসে, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এমনকি সাধারণ বদলিও করা হয়নি। বরং সংশ্লিষ্টদের অনেকেই নিজ নিজ পদে বহাল থেকেছেন।
বরিশালে স্পিডবোটের তেল চুরির অভিযোগ
বরিশালে অগ্নি প্রতিরোধে ব্যবহৃত একটি স্পিডবোটের জ্বালানি তেল আত্মসাতের ঘটনাও আলোচনায় আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ঘটনায় জড়িত হিসেবে যিনি অভিযুক্ত হন—ডিডি মিজানুর রহমান—তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং পরবর্তীতে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অধিদপ্তরের ভেতরে ক্ষোভ থাকলেও তা প্রকাশ্যে খুব একটা আসেনি। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, এতে অনিয়মকারীরা উৎসাহিত হচ্ছে।
বিভিন্ন সময়ে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ পায়নি। ডিজির দপ্তর থেকেও অভিযোগগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা জনসমক্ষে দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জননিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় এ ধরনের অভিযোগ বারবার ওঠা উদ্বেগজনক। তারা বলছেন, অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক—স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সব অভিযোগের পরও বহাল
নিয়োগ–বাণিজ্য, প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং বিভাগীয় অনিয়মে নীরব থাকার অভিযোগ—সব মিলিয়ে একাধিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।
তবে এতসব অভিযোগের পরও তিনি এখনো মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। কোনো আনুষ্ঠানিক অপসারণ, সাময়িক বরখাস্ত বা দৃশ্যমান তদন্ত প্রক্রিয়ার ঘোষণা না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে—অভিযোগগুলোর শেষ কোথায়?
জনস্বার্থে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি এখন আরও জোরালো হচ্ছে। কারণ ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে তার প্রভাব পড়তে পারে পুরো ব্যবস্থাপনায়।





















