প্রধানমন্ত্রীর নামে ভুয়া ব্যারিস্টার প্রিন্স ইলাহীর প্রতারণার মিশন!

সকালের সংবাদ ডেস্ক;সকালের সংবাদ ডেস্ক;
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৭:৫৪ অপরাহ্ণ, ০৩ জুলাই ২০২০

এইচ আর শফিক, ঢাকাঃ

এমন কোন তদবির নাই যা তিনি পারেন না, চাকরি দেওয়া, বদলি, পদোন্নতি, সরকারী কন্ট্রাক্ট পাইয়ে দেওয়া সহ যেকোনো মামলায় দেশের যেকোনো আদালত থেকে জামিন করিয়ে দেওয়া এমন অসংখ্য ক্ষমতার অধিকারী জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক পরিচয়ধারী ও ভুয়া ব্যারিষ্টার প্রিন্স এলাহীর। আর এভাবেই নিজেকে আওয়ামী রাজনীতির ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ থাকার কথা উল্লেখ করে সারাদেশে ছড়িয়েছেন তার প্রতারণার মিশন।

অসংখ্য প্রতারণার সম্রাট ভুয়া ব্যারিস্টার প্রিন্সের ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায় বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ থানাধীন বড় রঘুনাথপুর গ্রামের মোঃ হাবিবুর রহমান মাস্টারের পুত্র এই প্রতারক প্রিন্স কামরান ওরফে ব্যারিস্টার প্রিন্স ইলাহী। সূত্র জানায়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এমন অসংখ্য তদবিরের প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন ভুয়া ব্যারিস্টার প্রিন্স এলাহি। কথিত এই নেতা পরিচয়ধারী ও ভুয়া ব্যারিস্টার বর্তমানে লোকচক্ষুর আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে আছেন। জানা গেছে, আর এসব কর্মকাণ্ডে সহযোগী হিসেবে তার ছোট ভাইসহ একটি সিন্ডিকেট কাজ করতেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে সময়ে দেশে ঘুষ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা বাস্তবায়নে কঠোর ঠিক সেই সময়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে সারাদেশে অসংখ্য মানুষকে প্রতারিত করে যাচ্ছেন প্রিন্স ইলাহী।
প্রতারক প্রিন্স এলাহী শিক্ষা যোগ্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, ২০০২ সালে ৩.১৩ পেয়ে এসএসসি (রোলঃ ৫৬১৭০১) এবং দুই দুইবার ফেল করে। ২০০৬ সালে তৃতীয়বারে ৩.১০ পেয়ে এইচএইসসি (রোলঃ ৮০৪৬৮৯) পাশ করেন। অথচ এই প্রতারক নিজের নামের পাশে ভুয়া ব্যারিস্টার ডিগ্রী লাগিয়ে ও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নামে সংগঠনের নেতা পরিচয় দিয়ে গ্রাম্য সহজ সরল মানুষের সাথে প্রতারনা করে যাচ্ছে। তিনি ব্যারিস্টারি না পড়েও নিজের নামের সাথে নিয়মিত ব্যারিস্টার লিখে প্রতারনা করে বেড়াচ্ছে এই প্রতারক।

 

প্রতারক ভুয়া বেরিষ্টার প্রিন্স এলাহীর (পাসপোর্ট নং-BF0753736) সেখানে যুক্তরাজ্যের ভিসার কোন প্রমান পাওয়া যায়নি। ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলস এর চারটি ইনস অফ কোর্ট এবং বার কাউন্সিল অফ ইউকে তে আলাদা আলাদা ইমেইল দিয়ে ব্যারিস্টার প্রিন্স ইলাহী বা প্রিন্স কামরান নামে মেম্বারশিপের কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদস্থ ব্যক্তিদের সাথে সুকৌশলে ছবি তুলে তা গ্রাম্য সহজ সরল মানুষগুলোকে দেখিয়ে তাদেরকে চাকুরি দেয়ার কথা বলে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বিপুল পরিমান অর্থ। এছাড়াও টেন্ডারের কাজ পাইয়ে দেয়ার নামেও বিভিন্ন মানুষের কাছে থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে তিনি।


জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হলেও উক্ত সংগঠনের নাম ভাঙ্গিয়ে সারাদেশে বিভিন্ন কমিটির দিয়ে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

তার প্রতারণার কবল থেকে বাদ যায়নি নিজের গ্রামের নিরীহ মানুষেরাও তার গ্রামের লোকদের কাছে সে ব্যারিস্টার প্রিন্স এলাহী এবং জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সেজে বিভিন্ন তদবিরের কাজে প্রায় অর্ধকোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। একটি সূত্র জানায় তার এ প্রতারণার শিকার সারাদেশে শত শত ব্যক্তি। যাদের থেকে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। যেই টাকায় তিনি গ্রামের বাড়িতে গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। প্রতারক প্রিন্স এলাহী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের কাছে ব্যারিস্টার সেজে ও জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদের নেতার মিথ্যে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামেও নিয়েছে বিপুল পরিমান অর্থ।

এছাড়াও ব্যারিস্টার পরিচয় দিয়ে দেশের বিভিন্ন সার্কিট হাউজেও অবস্থান করার তথ্য পাওয়া গেছে। এই প্রতারকের আপন ছোট ভাই মোঃ সজলকে উক্ত সংগঠনের অর্থ সম্পাদকের পরিচয় দিয়ে কমিটি দেয়ার নাম করে অনেকের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায় জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদের নামে অনেকেই প্রচার প্রচারনা এবং এর সভাপতি ও সেক্রেটারী দাবি করলেও প্রিন্স এলাহী নিযুক্ত সংগঠনে কোন পদে বহাল নেই।
‘ব্যারিস্টার’ প্রিন্স এলাহীর প্রতারণার শিকার একই এলাকার বাসিন্দা হাসান মাহমুদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, প্রিন্স কামরান ওরফে ব্যারিস্টার প্রিন্স ইলাহী আসলে ভুয়া ব্যারিস্টার। কেউ বলতে পারে না তিনি কবে, কোথা থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেছেন। তার প্রকৃত নাম প্রিন্স কামরান। তার বাবা স্কুল শিক্ষক হাবীবুর রহমান।

হাসান মাহমুদ আরো বলেন, বরিশাল আদালতে চাকরি হবে— এমন আশ্বাস দিয়ে ডাচ বাংলা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে চার লাখ টাকা নেন প্রিন্স। পালিত গরু বিক্রি করে দুই লাখ টাকা দিয়েছি। ৮০ শতাংশ জমি বন্ধক রেখে মোট তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা তাকে দেই। এরপর আবারও টাকা চাইলে যত গাছ-গাছালি আর হাঁস-মুরগী ছিল, সব বিক্রি করে বাকি ৪০ হাজার টাকাও দেই। সেটা ২০১৬ সালের কথা। সব টাকা বুঝে নিলেও আমরা চাকরি এখনো হয়নি। সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে সংসারও চলে না। কিছুদিন আগে আমার মা স্ট্রোক করে বিছানায় পড়ে আছেন। টাকা চাইতে গেলে উল্টো মামলার ভয় দেখান। বন্ধক জমি কোনোদিন বের করতে পারব কি না, তাও জানি না। এখন আর গরু পালার মতো টাকাও নেই। আর বেশিরভাগ সময় প্রিন্সের মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকে। এলাকার জনপ্রতিনিধিদের নিকট এ বিষয়ে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পায়নি।
আরেক ভুক্তভোগী মো. রিপন ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, আমাকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এমএলএসএস পদে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নাম করে চার লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রিন্স। চাকরি না পাওয়ায় তার কাছে টাকা ফেরত চাইলে উল্টো আমাকেই পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। বলে, আমি একজন ব্যারিস্টার। জানিস কত কিছু করতে পারি?
আরেক ভুক্তভোগী দুলাল হোসেন বলেন, আমার ছোট ভাইকে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নাম করে নিয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। ২০১৭ সালে সেই টাকা দিয়েছি। এখন ২০২০ সাল। চাকরিও নেই, টাকাও নেই। টাকা চাইলে বলেন, টাকা দেবে। কিন্তু আজকাল করতে করতেই বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে। আমাদের সর্ব
আরেক ভুক্তভোগী দুলাল হোসেন বলেন, আমার ছোট ভাইকে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নাম করে নিয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। ২০১৭ সালে সেই টাকা দিয়েছি। এখন ২০২০ সাল। চাকরিও নেই, টাকাও নেই। টাকা চাইলে বলেন, টাকা দেবে। কিন্তু আজকাল করতে করতেই বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে। আমাদের সর্বোচ্চ হারিয়ে আমরা অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছি।
আবু বকর নামে আরো একজন ভুক্তভোগী বলেন, আমার কাছে থেকে ব্যাংকে চাকুরী দেয়ার নামে নিয়েছে তিন লাক্ষ টাকা টাকা দিবে দিবে বলে আর দিচ্ছেনা এখন টাকা চাইতে গেলে উলটো হুমকি দিচ্ছে।
জালাল গাজী নামে একজন বলেন, ৮০ হাজার টাকা ধার নিয়ে এখন টাকা চাইলে অস্বীকার করে বলেন, কিসের টাকা, তোরা কোনো টাকা পাবি না। এ বিষয় তিনি ধানমন্ডি থানায় ২৪/০৬/২০২০ তারিখে একটি সাধারন ডায়েরি করেছেন, সাধারন ডায়েরি নম্বর ৯১৩।
ব্যারিস্টার প্রিন্স এলাহী সম্পর্কে জানতে চাইলে বাকেরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন ডাকুয়া বলেন, তার নাম কামরান। এলাকার সবাই এবং তার আত্মীয়-স্বজনরাও তাকে কামরান বলেই ডাকে। ঢাকায় গিয়ে হঠাৎ করে সে প্রিন্স এলাহী হয়ে যায়। আবার নামের আগে ব্যারিস্টার লাগিয়েছে। লন্ডন কেন, বাংলাদেশের বাইরে একটি দেশেও যায়নি। তার পাসপোর্ট দেখেছি, সেখানে কোনো দেশের ভিসাও লাগেনি। চাকরি দেওয়ার নাম করে অনেক মানুষের টাকা-পয়সা নিয়ে মেরে দিয়েছে। লোকজন এসে অভিযোগ করে। এরপর থেকে কাছে ঘেঁষা তো পরের কথা, আশপাশের ১০ কিলোমিটারের মধ্যেও তাকে আসতে দেই না।
নিজেকে জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দাবি করে পোস্টারিং করেছে
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেয়র লোকমান বলেন, শুরুর দিকে পোস্টার লাগিয়েছিল। এরপর যখন জানতে পারি সে ভুয়া ব্যারিস্টার, তারপর থেকে আমার এলাকায় এসব করতে নিষেধ করেছি। আর করেনি। জননেত্রী শেখ হাসিনা নামে শুধু একটা দোকান খুলে অনেকের সাথে প্রতারণা করেছে মাত্র।
কথিত নেতা ও ভুয়া ব্যারিস্টার পরিচয়ধারী দিন সম্পর্কে জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদের বর্তমান সভাপতি মনির খানের নিকট জানতে চাইলে তিনি জানান ২০১৮ সালে প্রিন্স এলাহীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ এর কোনো অনুমোদন আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান এই সংগঠনের কোনো অনুমোদন নেই তারা অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ ঠিকানা ব্যবহার করেন এবং এটি একটি পেশাজীবি সংগঠন বলে জানান।
ভুয়া ব্যারিষ্টার ও জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদের নামে এসব অপরাধের অভিযোগ সম্পর্কে তার বক্তব্য জানার জন্য ব্যারিস্টার প্রিন্স ইলাহীর ব্যক্তিগত জিপি মুঠোফোন নাম্বারে একাধিকবার ফোন করলেও এই প্রতিবেদকের ফোন কল রিসিভ করেনি ।

আপনার মতামত লিখুন :