ঢাকা ০৭:২৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo গ্যাস সংকট আগের সরকারের পাপের ফল: ডা. জাহেদ Logo ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই-নির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চালু Logo প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যুবরাজ বিন সালমান Logo ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo সরকারের ১৮০ দিনের সালতামামি: ধ্বংসস্তূপ থেকে পরিকল্পিত পুনর্গঠনের পথে বাংলাদেশ Logo শিগগিরই জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করবে সরকার : নজরুল ইসলাম খান Logo রাষ্ট্র ও মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই সরকারের বড় সাফল্য:সালেহ শিবলী Logo শেখ হাসিনার কোন স্ট্যাটাসে ভারতে আছেন জানা নেই: চিফ প্রসিকিউটর Logo ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপনের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর Logo আগামীকাল কিশোরগঞ্জ সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী

শুভ জন্মদিন পদ্মা নদীর মাঝির অমর স্রষ্টা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৪২:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ মে ২০১৯ ২৯৭ বার পড়া হয়েছে

সকালের সংবাদ; 

পদ্মা নদীর মাঝির কুবের-গণেশ-মালা, প্রাগৈতিহাসিকের ভিখু-পাঁচীর মতো দারিদ্র্যপীড়িত অসাধারণ চরিত্রগুলো নিয়ে জীবনঘনিষ্ঠ গল্পে পাঠকহৃদয় কেড়েছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক তিনি।

আজ এ প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিকের জন্মদিন। ১৯০৮ সালের ১৯ মে বিহারের সাঁওতাল পরগনা, বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দুমকা শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুরে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম রাখা হয়েছিল অধরচন্দ্র। বাবার দেয়া নাম ছিল প্রবোধকুমার আর ডাকনাম মানিক।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী জুড়ে মানবিক মূল্যবোধের চরম সংকটময় মূহুর্তে বাংলা কথা-সাহিত্যে যে কয়েকজন লেখকের হাতে সাহিত্যজগতে নতুন এক বৈপ্লবিক ধারা সূচিত হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।

তার রচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল মধ্যবিত্ত সমাজের কৃত্রিমতা, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, নিয়তিবাদ ইত্যাদি। ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণ ও মার্কসীয় শ্রেণীসংগ্রাম তত্ত্ব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন যা তার রচনায় ফুটে উঠেছে।

তার নাটক, গল্প, সাহিত্যের সব বিখ্যাত চরিত্রের মধ্য দিয়ে নিজের ওপর পড়া দারিদ্র্যের কষাঘাত ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি পাঠকের কাছে।

মানিক বন্দোপাধ্যায়ের বাবা ছিলেন ঢাকা জেলার সেটেলমেন্ট বিভাগের সাবরেজিস্ট্রার। বাবার বদলির চাকরির সূত্রে মানিকের শৈশব-কৈশোর ও ছাত্রজীবন কেটেছে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার বিভিন্ন জেলা শহরে।

তার মায়ের আদি নিবাস ছিল পূর্ববঙ্গের গাউদিয়া গ্রামে। এ গ্রামের পটভূমিতেই তিনি রচনা করেন তার প্রসিদ্ধ উপন্যাস পুতুলনাচের ইতিকথা।

১৯২৬ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মেদিনীপুর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯২৮ সালে বাঁকুড়ার ওয়েসলিয়ান মিশন থেকে আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন। কিন্তু সাহিত্যের পোকা মাথায় ঢোকার কারণে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি।

সাহিত্যের পথে যাত্রাটা ছিল তার বেশ আত্মবিশ্বাসী। প্রথম ছাপা গল্প ‘অতসী মামি’ এ আত্মবিশ্বাসেরই ফসল। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অনার্সে পড়ার সময় এক বন্ধুর সঙ্গে অনেকটা চ্যালেঞ্জ ধরেই লিখেছিলেন গল্পটি। ‘বিচিত্রা’য় ছাপা হয়েছিল সেটি।

পদ্মানদীর মাঝি এ সাহিত্যিকের কালজয়ী উপন্যাস। নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা জনবসতির সঙ্গে মানিক অনুভব করতেন এক আত্মিক বন্ধন। মাঝি-জেলেদের সঙ্গে গল্পে মজে থাকতেন, খাওয়া-দাওয়াও করতেন। সেই আত্মীয়তা থেকেই সৃষ্টি করেছিলেন তার সবচেয়ে জনপ্রিয় রচনা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’।

পারিবারিক জীবনে সংগ্রামের কথাও তিনি লিখে গেছেন তার ‘অপ্রকাশিত মানিক’ গ্রন্থে। স্ত্রী মৃত সন্তান প্রসব করার পর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘বাচ্চা মরে যাওয়ায় ডলি (স্ত্রী) অখুশি নয়। অনেক হাঙ্গামা থেকে বেঁচেছে। বলল, বাঁচা গেছে বাবা, আমি হিসেব করেছি বাড়ি ফিরে মাসখানেক বিশ্রাম করে রাঁধুনী বিদায় দেব। অনেক খরচ বাঁচবে।’

চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছিলেন মানিক বন্দোপাধ্যায়। কিছুদিন নবারুণ পত্রিকায় চাকরি করেন সহ-সম্পাদক হিসেবে। এরপর বঙ্গশ্রী পত্রিকায়ও একই পদে কাজ করেন। নিজের একটি প্রেস চালু করেছিলেন। কিন্তু অর্থাভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়।

মানিক বন্দোপাধ্যায় জীবনের অতি ক্ষুদ্র পরিসরে চল্লিশটি উপন্যাস ও তিনশ ছোটগল্প রচনা করেছেন। পুতুলনাচের ইতিকথা, দিবারাত্রির কাব্য, পদ্মা নদীর মাঝি ইত্যাদি উপন্যাস ও অতসী মামি, প্রাগৈতিহাসিক, ছোট বকুলপুরের যাত্রী ইত্যাদি বাংলাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে বিবেচিত হয়। ইংরেজি ছাড়াও তার রচনাগুলো বহু বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

ক্ষুধা, দারিদ্রে পিষ্ট হয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ক্লান্ত-শ্রান্ত এ সাহিত্যযোদ্ধা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘দেখো, দুটি ডাল-ভাতের সংস্থান না রেখে বাংলাদেশে কেউ যেন সাহিত্য করতে না যায়।’

বেঁচে থাকতে দিনের পর দিন ক্ষুধার তাড়নায় ছটফট করেছিলেন তিনি। কিন্তু মৃত্যুর পর রাশি রাশি ফুলের ভারে নুয়ে পড়ে তার মরদেহ।

১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়সে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী এ কথাসাহিত্যিক না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
error: Content is protected !!

শুভ জন্মদিন পদ্মা নদীর মাঝির অমর স্রষ্টা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

আপডেট সময় : ১০:৪২:০২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ মে ২০১৯

সকালের সংবাদ; 

পদ্মা নদীর মাঝির কুবের-গণেশ-মালা, প্রাগৈতিহাসিকের ভিখু-পাঁচীর মতো দারিদ্র্যপীড়িত অসাধারণ চরিত্রগুলো নিয়ে জীবনঘনিষ্ঠ গল্পে পাঠকহৃদয় কেড়েছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক তিনি।

আজ এ প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিকের জন্মদিন। ১৯০৮ সালের ১৯ মে বিহারের সাঁওতাল পরগনা, বর্তমান ঝাড়খণ্ড রাজ্যের দুমকা শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুরে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম রাখা হয়েছিল অধরচন্দ্র। বাবার দেয়া নাম ছিল প্রবোধকুমার আর ডাকনাম মানিক।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী জুড়ে মানবিক মূল্যবোধের চরম সংকটময় মূহুর্তে বাংলা কথা-সাহিত্যে যে কয়েকজন লেখকের হাতে সাহিত্যজগতে নতুন এক বৈপ্লবিক ধারা সূচিত হয় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।

তার রচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল মধ্যবিত্ত সমাজের কৃত্রিমতা, শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, নিয়তিবাদ ইত্যাদি। ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণ ও মার্কসীয় শ্রেণীসংগ্রাম তত্ত্ব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন যা তার রচনায় ফুটে উঠেছে।

তার নাটক, গল্প, সাহিত্যের সব বিখ্যাত চরিত্রের মধ্য দিয়ে নিজের ওপর পড়া দারিদ্র্যের কষাঘাত ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি পাঠকের কাছে।

মানিক বন্দোপাধ্যায়ের বাবা ছিলেন ঢাকা জেলার সেটেলমেন্ট বিভাগের সাবরেজিস্ট্রার। বাবার বদলির চাকরির সূত্রে মানিকের শৈশব-কৈশোর ও ছাত্রজীবন কেটেছে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার বিভিন্ন জেলা শহরে।

তার মায়ের আদি নিবাস ছিল পূর্ববঙ্গের গাউদিয়া গ্রামে। এ গ্রামের পটভূমিতেই তিনি রচনা করেন তার প্রসিদ্ধ উপন্যাস পুতুলনাচের ইতিকথা।

১৯২৬ সালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মেদিনীপুর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯২৮ সালে বাঁকুড়ার ওয়েসলিয়ান মিশন থেকে আইএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিত বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন। কিন্তু সাহিত্যের পোকা মাথায় ঢোকার কারণে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি।

সাহিত্যের পথে যাত্রাটা ছিল তার বেশ আত্মবিশ্বাসী। প্রথম ছাপা গল্প ‘অতসী মামি’ এ আত্মবিশ্বাসেরই ফসল। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অনার্সে পড়ার সময় এক বন্ধুর সঙ্গে অনেকটা চ্যালেঞ্জ ধরেই লিখেছিলেন গল্পটি। ‘বিচিত্রা’য় ছাপা হয়েছিল সেটি।

পদ্মানদীর মাঝি এ সাহিত্যিকের কালজয়ী উপন্যাস। নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠা জনবসতির সঙ্গে মানিক অনুভব করতেন এক আত্মিক বন্ধন। মাঝি-জেলেদের সঙ্গে গল্পে মজে থাকতেন, খাওয়া-দাওয়াও করতেন। সেই আত্মীয়তা থেকেই সৃষ্টি করেছিলেন তার সবচেয়ে জনপ্রিয় রচনা ‘পদ্মা নদীর মাঝি’।

পারিবারিক জীবনে সংগ্রামের কথাও তিনি লিখে গেছেন তার ‘অপ্রকাশিত মানিক’ গ্রন্থে। স্ত্রী মৃত সন্তান প্রসব করার পর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘বাচ্চা মরে যাওয়ায় ডলি (স্ত্রী) অখুশি নয়। অনেক হাঙ্গামা থেকে বেঁচেছে। বলল, বাঁচা গেছে বাবা, আমি হিসেব করেছি বাড়ি ফিরে মাসখানেক বিশ্রাম করে রাঁধুনী বিদায় দেব। অনেক খরচ বাঁচবে।’

চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছিলেন মানিক বন্দোপাধ্যায়। কিছুদিন নবারুণ পত্রিকায় চাকরি করেন সহ-সম্পাদক হিসেবে। এরপর বঙ্গশ্রী পত্রিকায়ও একই পদে কাজ করেন। নিজের একটি প্রেস চালু করেছিলেন। কিন্তু অর্থাভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়।

মানিক বন্দোপাধ্যায় জীবনের অতি ক্ষুদ্র পরিসরে চল্লিশটি উপন্যাস ও তিনশ ছোটগল্প রচনা করেছেন। পুতুলনাচের ইতিকথা, দিবারাত্রির কাব্য, পদ্মা নদীর মাঝি ইত্যাদি উপন্যাস ও অতসী মামি, প্রাগৈতিহাসিক, ছোট বকুলপুরের যাত্রী ইত্যাদি বাংলাসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে বিবেচিত হয়। ইংরেজি ছাড়াও তার রচনাগুলো বহু বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

ক্ষুধা, দারিদ্রে পিষ্ট হয়ে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ক্লান্ত-শ্রান্ত এ সাহিত্যযোদ্ধা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘দেখো, দুটি ডাল-ভাতের সংস্থান না রেখে বাংলাদেশে কেউ যেন সাহিত্য করতে না যায়।’

বেঁচে থাকতে দিনের পর দিন ক্ষুধার তাড়নায় ছটফট করেছিলেন তিনি। কিন্তু মৃত্যুর পর রাশি রাশি ফুলের ভারে নুয়ে পড়ে তার মরদেহ।

১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়সে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী এ কথাসাহিত্যিক না ফেরার দেশে পাড়ি জমান।