মশা নিয়ে ‘মশকরা’

সকালের সংবাদ ডেস্ক;সকালের সংবাদ ডেস্ক;
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০২:০৭ অপরাহ্ণ, ২৬ জুলাই ২০১৯

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ মিলনায়তনে চিকিৎসকদের সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ঢাকা শহরের এডিস মশার বৃদ্ধিকে এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দেশের বিশিষ্ট ও জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের সামনে তিনি বলেছেন, ‘যেভাবে রোহিঙ্গা পপুলেশন বাড়ে আমাদের দেশে এসে, সেভাবে মসকিউটো পপুলেশন বেড়ে যাচ্ছে।’

এডিস মশা ও রোহিঙ্গা নিয়ে আরও অনেক কথা বলেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠান শেষে দেশের সবচেয়ে বড় এই চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক এই প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘ছি, রোহিঙ্গাদের নিয়ে এইভাবে মশকরা!’

ঢাকা এখন ডেঙ্গুর শহর। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, আগের চেয়ে মশার ঘনত্ব ১০ গুণ বেড়েছে। মশা বেড়েছে বলে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু কত মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত, সেই সংখ্যা মন্ত্রী বলেননি।

গতকালই রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে ‘মশকনিধন ও পরিচ্ছন্নতা সপ্তাহ’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবের ভিত্তিতে তৈরি করা আক্রান্ত মানুষের অনুমিত সংখ্যাকে তিনি বলেছেন গুজব। সত্য কোনটা? আক্রান্তের সংখ্যাটি মেয়র মুখে আনলে গুজব দূর হয়ে যেত। ওই অনুমিত সংখ্যা হচ্ছে সাড়ে তিন লাখ।

অনুমিত সংখ্যার দরকারই হতো না যদি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হতো। মশা ১০ গুণ না বাড়লে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা এত হতো না। এখন মেয়র কি বলবেন, ১০ গুণ মশার কথা বলে গুজব ছড়াচ্ছেন কে? এই তথ্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর।

গুজবে কান না দিয়ে মেয়রের উচিত মশা নিধনে মনোনিবেশ করা। গত বছর দুই সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীরা ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন। ওই বছরের ২২ মে ফলাফল প্রকাশ করা হয়। বলা হয় ওষুধ অকার্যকর। কিন্তু ওষুধ পরিবর্তনের উদ্যোগ না নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আবার তা পরীক্ষা করা হয়েছিল। আবারও সেই একই ফল এল, ওষুধ অকার্যকর।

গত বুধবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মশা মারার যে ওষুধ আছে, তা অনেকটা অকার্যকর। আবার উত্তর সিটি করপোরেশন যে ওষুধ অকার্যকর বলে বাতিল করেছে, তা ব্যবহৃত হচ্ছে দক্ষিণে। তাহলে কি দক্ষিণ ও উত্তরের মশার পার্থক্য আছে?

তবে মানুষের দুর্ভোগের দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে দেশের উচ্চ আদালত দুই সিটি করপোরেশনের কাছে বেশ কিছু প্রশ্ন রেখেছেন। ১৭ জুলাই শুনানিতে সিটি করপোরেশনের আইনজীবীকে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘মশা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। পদক্ষেপ নেননি। মেয়র বলেন কিছু হয়নি। ডেঙ্গুতে কয়েক হাজার মানুষ অসুস্থ। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেন। যার সন্তান মারা গেছে, সে বোঝে কষ্টটা কী।’ গতকালও ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক মন্তব্য করে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘ঘরে ঘরে মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত। অনেকে হাসপাতালে যান না, গেলে এ সংখ্যা বেশি হতো। মানুষের জীবন আগে বাঁচাতে হবে। আমরা চাই মশা মরুক।’ হাইকোর্টের প্রশ্ন—রাষ্ট্রের এত মেশিনারি থাকতে এটি (ডেঙ্গু) রিমুভ করা যাবে না?

এই প্রশ্নগুলো এই শহরের মানুষের, এই দেশের সাধারণ মানুষের। মানুষ মশার কামড় খেতে চায় না। ডেঙ্গু থেকে দূরে থাকতে চায়।

মেয়রের সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেছেন, মশার ওষুধ পরীক্ষার পর দেখা গেছে, ওষুধে কোনো সমস্যা নেই। তাহলে কে সত্যি কথা বলছেন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী নাকি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী? আর সেই ওষুধের কার্যকারিতার পরীক্ষার ফল তো সবারই জানা, ওষুধে কাজ হয় না, মশা মরে না।

ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দিতে এখন ঢাকার হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষ কার্যকর, দৃশ্যমান ও আন্তরিক উদ্যোগ চায়। উদ্যোগ না নিলে আগামী দুই মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।

ডেঙ্গু থেকে সেরে ওঠা অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গতকালই বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আল্লাহ যেন কাউকে ডেঙ্গু জ্বর না দেয়।’

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষই এর কষ্ট বুঝতে পারেন। মানুষ তাঁদের ব্যক্তিগত কষ্টের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যক্ত করছেন। আর মেয়র সেই আক্রান্তের সংখ্যাকে বলছেন ‘গুজব’। পরীক্ষায় মশার ওষুধ অকার্যকর হলেও মন্ত্রী বলছেন তা কার্যকর। হাজারো, লাখো মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে মন্ত্রী ও মেয়র কি তাহলে ‘মশকরা’ করছেন? তাহলে মানুষ কার কাছে যাবে?

আপনার মতামত লিখুন :