কাজ ছাড়াই কোটি টাকার বিল, ডিএসসিসিতে প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদের কারসাজির অভিযোগ
- আপডেট সময় : ১১:৪০:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক:
পুরান ঢাকার একটি কমিউনিটি সেন্টারের বৈদ্যুতিক কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না হলেও আগেভাগেই প্রায় পৌনে এক কোটি টাকার বিল পরিশোধ করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশের কাজ না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল পাইয়ে দেন ডিএসসিসির বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ।
ডিএসসিসির নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে “মির্জা আবু তালিব (শায়েস্তা খাঁন) কমিউনিটি সেন্টার” নির্মাণ প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ছয়তলা ভবনটির নির্মাণকাজ তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে।
নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রকল্পের মোট এক কোটি ৮৭ লাখ টাকার কাজের মধ্যে ৬৯ শতাংশ অগ্রগতি দেখিয়ে এক কোটি ৪১ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। এর মধ্যে শুধুমাত্র বৈদ্যুতিক কাজ বাবদ দেওয়া হয় ৭৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। অথচ সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেই কাজের অধিকাংশই বাস্তবে হয়নি।
বিল অনুমোদনের আগে একই বছরের ২২ জুন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন নির্বাহী প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ ও সহকারী প্রকৌশলী মো. বজলুর রহমান। পরিদর্শন শেষে তারা কাজের গুণগতমান “সন্তোষজনক” উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেন। পরে শিডিউল ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হয়েছে মর্মে সনদ দিয়ে বিল ছাড়ের অনুমোদন দেন নূর মোহাম্মদ। সেই সনদের ভিত্তিতেই বৈদ্যুতিক কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম/এস শিউলি বিল্ডার্সকে অর্থ পরিশোধ করা হয়।
বিলে ৫৯ ধরনের কাজ, বাস্তবে নেই অধিকাংশ
পরিশোধিত বিলের তালিকায় ৫৯ ধরনের বৈদ্যুতিক ও অগ্নিনির্বাপণ সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে ছিল পিভিসি কনসিলড কন্ডুইট ওয়ারিং, ফ্যান পয়েন্ট, সুইচ-সকেট, ডিস্ট্রিবিউশন মিটার, সার্কিট ব্রেকার, এলইডি স্পট লাইট, গেট লাইট, আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল, আর্থিং সিস্টেম, মোটর ড্রাইভেন ফায়ার পাম্প, জকি পাম্পসহ নানা সরঞ্জাম স্থাপনের দাবি।
কিন্তু সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, অগ্নিনির্বাপণের জন্য কেবল কিছু পাইপ বসানো ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো কাজই হয়নি। এক সপ্তাহ আগে একটি ফায়ার পাম্প ভবনে আনা হলেও তা এখনো স্থাপন করা হয়নি। ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে কিছু মালামাল তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেখানে কোনো নিরাপত্তাকর্মীও ছিল না।
প্রকৌশল বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, ওই কক্ষে জকি পাম্প, মোটর ড্রাইভেন কন্ট্রোলার, স্টিল কেবিনেট সামগ্রী, অটো এয়ার ভেন্ট পাইপ ও ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার রাখা আছে।
বৈদ্যুতিক কাজ আটকে রেখেছে পুরো প্রকল্প
বৈদ্যুতিক কাজ শেষ না হওয়ায় ভবনের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ও অন্যান্য কাজও আটকে গেছে। চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ তলার নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা সোনার বাংলা এন্টারপ্রাইজের সাইট ইঞ্জিনিয়ার নাইমুল ইসলাম বলেন, “আমাদের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ। ছাদের ঢালাইও হয়ে গেছে। কিন্তু বৈদ্যুতিক কাজ শেষ না হওয়ায় ইন্টেরিয়রের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।”
একই প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও প্রহরীরা জানান, গত বছরের আগস্টের পর কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকলেও পরে আবার নির্মাণকাজ শুরু হয়। কিন্তু পুরো সময়জুড়ে তারা ভবনে উল্লেখযোগ্য কোনো বৈদ্যুতিক কাজ হতে দেখেননি। কেবল কয়েকদিন শিউলি বিল্ডার্সের কিছু লোকজনকে আসতে দেখা গেছে।
অর্থবছরের অজুহাত প্রকৌশলীর
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ বলেন, “অনেক সময় অর্থবছর শেষে বরাদ্দের টাকা ফেরত যাওয়ার আশঙ্কায় অগ্রিম বা অতিরিক্ত বিল দেওয়া হয়। এখানেও এমনটি হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও বিষয়টি জানতেন।”
তবে বিলটি দেওয়া হয়েছিল ডিসেম্বর মাসে, অর্থাৎ অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
এদিকে ডিএসসিসির এই প্রকৌশলীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তিনি ডুয়েট ছাত্রলীগ অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের অর্থ সম্পাদক এবং বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের একটি প্যানেলের সদস্য হিসেবে পরিচিত।
চলবে….


















