ড্রেজিং থেকে দরপত্র, তেল থেকে বালু বাণিজ্য
বিআইডব্লিউটিএতে ‘ক্ষমতাধর প্রকৌশলী সিন্ডিকেট’ নিয়ে নতুন অভিযোগের ঝড়
- আপডেট সময় : ০৪:২৮:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের নদী রক্ষা, নৌপথ সচল রাখা এবং ড্রেজিং কার্যক্রমের জন্য প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও সেই খাতেই দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ সামনে আসছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর প্রধান প্রকৌশলী (ডিজাইন অ্যান্ড মনিটরিং) আইয়ুব আলীকে ঘিরে নানা অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ড্রেজিং প্রকল্প, যন্ত্রপাতি ক্রয়, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি তেল ব্যবস্থাপনা এবং নদী থেকে উত্তোলিত বালু বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতরে একটি শক্তিশালী প্রভাব বলয় তৈরি হয়, যার সঙ্গে আইয়ুব আলীর নাম বারবার উঠে আসছে।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। বদলি, পদোন্নতি, প্রকল্প অনুমোদন কিংবা কাজ বণ্টনের মতো বিষয়েও তার প্রভাব ছিল বলে দাবি করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
ড্রেজিং প্রকল্প ঘিরে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নদী খননের নামে শত শত কোটি টাকার বিল উত্তোলন করা হলেও বাস্তব কাজের সঙ্গে ব্যয়ের বিশাল অমিল রয়েছে। প্রায় ১৪০ লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং দেখিয়ে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার বিল পরিশোধের অভিযোগ এখন তদন্তসংশ্লিষ্ট মহলে আলোচিত।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, কাগজে-কলমে বিপুল পরিমাণ খনন কাজ দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় প্রত্যাশিত নাব্যতা ফেরেনি। কোথাও কোথাও নদী থেকে উত্তোলিত পলি আবার নদীতেই ফেলে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
শুধু ড্রেজিং নয়, ড্রেজার পরিচালনায় ব্যবহৃত জ্বালানি তেল নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। অভ্যন্তরীণ কয়েকটি সূত্রের ভাষ্য, সরকারি তেল সরবরাহের একটি অংশ নিয়মিতভাবে বাইরে বিক্রি করা হতো এবং এ কাজে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় ছিল।
একই সঙ্গে “খনন সহায়ক কাজ” দেখিয়ে ছোট ছোট ভুয়া বিল তৈরি করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ৫০ হাজার টাকার নিচে অসংখ্য বিল দেখিয়ে দ্রুত অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হতো, যাতে উচ্চপর্যায়ের নজর এড়িয়ে যাওয়া সহজ হয়।
নদী থেকে উত্তোলিত বালু ও পলি বিক্রি নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি রাজস্ব খাতে জমা না দিয়ে এসব বালু স্থানীয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিক্রি করা হতো। এমনকি কোথাও কোথাও প্রয়োজন না থাকলেও বালু উত্তোলনের উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত ড্রেজিং পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র একাধিক প্রকল্পে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো যাতে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানই সুবিধা পায়। ফলে একই গোষ্ঠী বছরের পর বছর বড় বড় প্রকল্প বাগিয়ে নেয়।
ড্রেজার, টাগবোট, পাইপলাইন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি কেনাকাটায়ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কিছু যন্ত্রপাতি অল্প সময়ের মধ্যেই অকেজো হয়ে পড়ে, আবার কিছু সরঞ্জামের বাস্তব অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের সরঞ্জাম উচ্চমূল্যে কিনে সরকারি অর্থ অপচয় করা হয়েছে।
এদিকে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে। বিভিন্ন অভিযোগপত্রে ঢাকায় ফ্ল্যাট, প্লট, জমি, খামার ও বাণিজ্যিক বিনিয়োগের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও ঘুরপাক খাচ্ছে তদন্তসংশ্লিষ্ট মহলে।
যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও আইয়ুব আলীর পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, এত অভিযোগের পরও তদন্তে ধীরগতি কেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের নৌপথ উন্নয়ন ও নদী রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে যদি প্রকল্পভিত্তিক অনিয়ম, ভুয়া বিল ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতি বন্ধ না হয়, তাহলে সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগও কাঙ্ক্ষিত সুফল দেবে না।




















