স্বল্প বেতনে এলজিইডি গাড়িচালকের সম্পদের অট্টালিকা
- আপডেট সময় : ০১:৩০:০৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬ ৮৮ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি:
মাসিক বেতন মাত্র ৩৪ হাজার টাকা। সরকারি দপ্তরের একজন সাধারণ গাড়িচালক। অথচ রাজধানীর ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেই তার নামে বা সংশ্লিষ্টতায় দাঁড়িয়ে আছে একের পর এক ফ্ল্যাট, জমি আর বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ। এমন বিস্ময়কর সম্পদ নিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর গাড়িচালক রুহুল আমিন সরদার।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একতা হাউজিং ও চন্দ্রিমা হাউজিং এলাকায় সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সেখানে তার নামে বা ঘনিষ্ঠ সংশ্লিষ্টতায় একাধিক জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, অন্তত ২১টি ফ্ল্যাটে বিদ্যুতের মিটার তার নামেই নিবন্ধিত। অথচ সরকারি চাকরির মাসিক বেতন মাত্র ৩৪ হাজার টাকা।
রুহুল আমিনের কর্মজীবনের শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ। ১৯৯৬ সালে তিনি এলজিইডিতে দৈনিক ৬০ টাকা হাজিরায় চুক্তিভিত্তিক গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন। তবে চাকরিতে যোগদানের কিছুদিনের মধ্যেই নানা অনিয়মের অভিযোগে তার চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটে। পরে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক কারণে তাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।
সময়ের পরিক্রমায় আবারও তিনি এলজিইডিতে ফিরে আসেন। গত বছরের ১৫ আগস্ট তাকে পুনরায় গাড়িচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পুনঃনিয়োগের পরও তিনি নিয়মিত গাড়ি চালানোর দায়িত্ব পালন করেন না। বরং রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটানোর ক্ষেত্রেই বেশি সক্রিয় দেখা যায় তাকে। নিজেকে জিয়া পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবেও পরিচয় দিয়ে থাকেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে এলজিইডিকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত থেকে বিভিন্ন ধরনের তদবির বাণিজ্য, টেন্ডারের গোপন তথ্য ফাঁস এবং সরকারি গাড়ির তেল আত্মসাতের মতো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল। এসব অনিয়মের পথ ধরেই অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা।
মোহাম্মদপুরের একতা হাউজিংয়ের ৪, ৫, ৭ ও ৮ নম্বর সড়কে রয়েছে তার জমি এবং প্রায় আটটি ফ্ল্যাট। একই এলাকায় একসঙ্গে তিন থেকে চারটি ভবনের নির্মাণকাজ চলতেও দেখা গেছে। অন্যদিকে চন্দ্রিমা হাউজিংয়েও রয়েছে তার দুটি ফ্ল্যাট। এর মধ্যে একতা হাউজিংয়ের ৫ নম্বর রোডের ১০১ নম্বর জয়েন্ট টাওয়ার এবং চন্দ্রিমা মডেল টাউনের এভিনিউ–২, ব্লক–ই, বাড়ি নম্বর ১৮ রয়েল প্যাসিফিক টাওয়ারে তার ফ্ল্যাটের তথ্য মিলেছে। এছাড়া একই মডেল টাউনের ব্লক–বি, রোড–২, প্লট নম্বর ১০/৭–এও তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয় সূত্র আরও জানিয়েছে, শুধু রাজধানীতেই নয়, শরিয়তপুরে তার গ্রামের বাড়িতেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি ও সম্পদ।
এদিকে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, রুহুল আমিন সরদারের নামে অন্তত ২১টি ফ্ল্যাটে বিদ্যুতের মিটার ইস্যু করা হয়েছে। এই তথ্যই তার সম্পদের বিস্তৃতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রুহুল আমিন সরদার। তার দাবি, তিনি একা নন, মোট ১৮ জন মিলে একটি ভবন নির্মাণ করেছেন। বিদ্যুৎ বিভাগের ভুলের কারণে ওই ভবনের ১৮টি ফ্ল্যাটের মিটার ও একটি কমন মিটার তার নামে নিবন্ধিত হয়েছে। পাশাপাশি পাশের আরেকটি ভবনের দুটি মিটারও ভুলবশত তার নামে চলে এসেছে বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, এতগুলো মিটারের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে তার নিজের একটি মিটারই রয়েছে।
এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে দপ্তরের বিভিন্ন স্তরে চলা অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতির চিত্রই যেন এই সম্পদের বিস্ময়কর গল্পের ভেতর ধরা পড়েছে। তাদের মতে, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত সত্য সামনে আসবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।













