ঠিকাদারের মুখোশে ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে চাকরির প্রলোভনে কোটি টাকা লুটের অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০৭:২৭:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ মার্চ ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিনিধি: রাজধানীর মিরপুরে সরকারি চাকরি ও টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার নামে সংঘবদ্ধ প্রতারণা ও কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ফরিদুল আলম নিজেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর নেতা এবং সরকারি ঠিকাদার পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে আসছেন বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।
ভুক্তভোগীদের দাবি, রাজিয়া ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে তিনি পরিকল্পিতভাবে চালিয়েছেন নিয়োগ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলের ভয়ংকর নেটওয়ার্ক।
চাকরির টোপ, টেন্ডারের প্রলোভন:
অভিযোগ অনুযায়ী, ফরিদুল আলম রাজিয়া ট্রেডার্সকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করতেন। সরকারি চাকরির “গ্যারান্টি”, বড় প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং মন্ত্রণালয় পর্যায়ের “ডাইরেক্ট লিংক” থাকার দাবি করে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।
অনেকে জমি বিক্রি, স্বর্ণ বন্ধক এমনকি উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে টাকা দেন। কিন্তু চাকরি বা কাজ তো দূরের কথা—পরে টাকা ফেরত চাইলে শুরু হয় ভয়ভীতি, চাপ ও হুমকি।
মিরপুরে ঘাঁটি গড়ে প্রতারণার নেটওয়ার্ক:
অভিযুক্তের স্থায়ী ঠিকানা চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়ন হলেও, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ঢাকার মিরপুর–এর মিরপুর–২ নম্বর সেকশনের বড়বাগ এলাকায় অবস্থান করতেন। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এখান থেকেই নিয়োগ বাণিজ্যের পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালিত হতো।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, তিনি নিজেকে আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার দাবি করে সহজেই মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতেন।
নারী চক্র দিয়ে ব্ল্যাকমেইল:
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, ফরিদুল আলমের সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ নারী চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করত। টার্গেট ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে পরে ভিডিও, ছবি বা মিথ্যা অভিযোগের ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হতো।
যারা টাকা ফেরত চাইতেন বা প্রতারণার বিরুদ্ধে মুখ খুলতেন, তাদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন, চাঁদাবাজি কিংবা ফৌজদারি মামলার হুমকি দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি, গ্রেপ্তারের ভয়:
সম্প্রতি এক ভুক্তভোগী প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলার পর অভিযুক্ত ব্যক্তি WhatsApp-এ একের পর এক হুমকিসূচক বার্তা পাঠান বলে দাবি করা হয়েছে। বার্তায় তাকে ‘চাঁদাবাজ’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ প্রকাশ, মামলা সংক্রান্ত কাগজ ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
একটি বার্তায় লেখা হয় বলে অভিযোগ—
“আমি কী করতে পারি আর না পারি, সেটা পরে প্রমাণ হবে… তোকে অ্যারেস্ট করাবই—এই আমার চ্যালেঞ্জ।”
ভুক্তভোগীদের মতে, এই ভয় ও সন্ত্রাসের কারণেই বহু মানুষ এখনও মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
আত্মগোপনে অভিযুক্ত:
অভিযোগের বিষয়ে ফরিদুল আলম কিংবা রাজিয়া ট্রেডার্সের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোন বন্ধ এবং তিনি বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সর্বস্বান্ত পরিবার, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, “রাজিয়া ট্রেডার্স সরকারি ঠিকাদার শুনে বিশ্বাস করেছিলাম। চাকরির আশায় জমি বিক্রি করেছি। এখন টাকা চাইলে মামলা দিয়ে জেলে পাঠানোর ভয় দেখাচ্ছে।”
আরেকজন জানান, “বছরের পর বছর ঘুরছি। শুরুতে সময় নিত, পরে ফোন বন্ধ। এখন শুনছি এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।”
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ দাবি
ভুক্তভোগীরা দ্রুত তদন্ত, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং আত্মসাৎকৃত কোটি কোটি টাকা উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট থানার এক কর্মকর্তা জানান, লিখিত অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন:
অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় ঘিরে স্থানীয় অঙ্গনে তীব্র আলোচনা চলছে। দলীয় সূত্র বলছে, ব্যক্তিগত অপরাধের দায় দল নেবে না; অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত অভিযুক্ত ফরিদুল আলম ও রাজিয়া ট্রেডার্সের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।












