ঢাকা ০৬:৩৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo নিষিদ্ধ সংগঠনের ‘পুনর্গঠন’ বার্তা: ছাত্রলীগের নোটিশ ঘিরে প্রশ্ন ও শঙ্কা Logo দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নলীগ লুট করে আগষ্টিন শত কোটি টাকার মালিক Logo জিয়া শিশুকিশোর মেলার কেন্দ্রীয় কমিটির গণমাধ্যম বিষয়ক সম্পাদক হলেন হাফিজুর রহমান শফিক Logo জিয়া শিশু কিশোর মেলার নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা  Logo ভোলার জেলা রেজিস্ট্রার নুর নেওয়াজ ৫০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক Logo প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে শীর্ষ কর্মকর্তা আতিকুর পাহাড়সমান অভিযোগ নিয়েও বহাল Logo বদলি-বাণিজ্য ঘুষ বাণিজ্যে বেপরোয়া সাব-রেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন সিন্ডিকেট Logo রাজউকে দুর্নীতিতে আলোচনার শীর্ষে পরিচালক জাকারিয়া: ‘সেফ জন’ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ  Logo প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য Logo নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি নিয়ন্ত্রণ, বাজেট অপচয় ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলায় ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

৬০ টাকার হাজিরার কোটিপতি উমেদার: মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দুর্নীতির সাম্রাজ্য!

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০২:০১:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ জুন ২০২৫ ৩৩৬ বার পড়া হয়েছে

সংবাদ প্রতিবেদন:

ঢাকার মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে কর্মরত এক উমেদার, আব্দুল ছোবান—যিনি শুরু করেছিলেন মাত্র ৬০ টাকার হাজিরায়, এখন তিনি এক বিশাল সম্পদের মালিক। জমি, বাড়ি, গাড়ি, এমনকি দেশের বাইরেও জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছেন অবলীলায়। সাধারণ একজন সরকারি কর্মচারীর পক্ষে যা কল্পনাতীত, সেই বাস্তবতাই গড়ে তুলেছেন তিনি। প্রশ্ন হচ্ছে—কীভাবে?

 

২৬ বছর ধরে একই অফিসে কর্মরত ছোবান সময়ের সাথে সাথে পুরো অফিসটিই নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছেন। কাকে আগে ফাইল দিতে হবে, কাকে অফিসে আগে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে, কোন ফাইল কত টাকার বিনিময়ে অগ্রাধিকার পাবে—সবই নির্ধারণ করে তার গড়া সিন্ডিকেট। এমনকি সাব-রেজিস্ট্রার পর্যন্ত অনেক সময় তার ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেন। অফিসের ভিতরে ছোবানের কথাই শেষ কথা।

 

ছোবানের একাধিক ভূমিকা রয়েছে—তিনি কখনও উমেদার, কখনও জমির দালাল, আবার কখনও রেজিস্ট্রারের প্রতিনিধির ভান করেন। এই বহুরূপী চরিত্রই তাকে অফিসের ভেতরে একটি শক্তিশালী প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

 

সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ হলো—তিনি নিজের ভাগ্নে আয়নাল হোসেনকে অফিসে নিয়োগ দিয়েছেন সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। কোনও সরকারি নিয়োগপত্র না থাকা সত্ত্বেও আয়নাল অফিসের মূল চাবি রাখেন, এবং রাতের আঁধারে অফিস খুলে দলিল বদল, দাগ নম্বর পরিবর্তন, এমনকি জাল দলিল প্রস্তুতের মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত থাকেন। এসব কার্যকলাপ দেশের ভূমি ব্যবস্থার জন্য চরম হুমকি।

 

ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে ছোবান যে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন, তা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। বছিলায় তার ১৫ কাঠা জমি রয়েছে যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। আদাবরে রয়েছে নিজের নামে ৬ তলা ভবন, কাটাসুর ও সাতারকুলে আরও জমি, দক্ষিণখানে বড় একটি প্লট। তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে মিনিবাস, মাইক্রোবাস ও ইজিবাইক লাইনের মালিকানা। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা ও পারিবারিক ভ্রমণের খরচ চালানো হয় এই ঘুষের অর্থ থেকেই। অফিস থেকে প্রতিদিন যে ঘুষ ওঠে, তার পরিমাণ ১ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত—মাস শেষে যার পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

 

অথচ আয়কর রিটার্নে তিনি সম্পদের হিসাব দেখিয়েছেন মাত্র ৭৯ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। এই ভুয়া হিসাবের মাধ্যমে তিনি শুধু সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করেননি, বরং পুরো সিস্টেমকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন।

 

এই ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। এক সহকারী পরিচালক ছোবানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তবে এখনো পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো, অফিসে কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুললে বদলি, হুমকি ও মানসিক চাপে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।

 

তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—যেখানে একজন উমেদার পুরো সিস্টেমকে কিনে ফেলতে পারে, সেখানে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার কোথায়? সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান কি শুধুই বক্তৃতা আর নীতিগত অবস্থানেই সীমাবদ্ধ?

 

এখন সময় এসেছে সাহসিকতার সঙ্গে এই সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলার। আব্দুল ছোবান একা নন, তিনি একটি চক্রের প্রতিচ্ছবি। তাকে বিচারের মুখোমুখি না করলে দেশের অন্যান্য ভূমি অফিসেও এরকম দুর্নীতিবাজ চক্ররা শিকড় গেড়ে বসবে। আইনের শাসন ফিরিয়ে আনতে হলে, এদের মুখোশ উন্মোচন করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে—এটাই জনগণের দাবি।

 

এই বিষয়ে বক্তব্য নিতে আব্দুল ছোবানের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তার ভাগ্নে আয়নাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে তিনি কল ধরেন। কিন্তু সাংবাদিক পরিচয় শুনেই সঙ্গে সঙ্গে ফোন কেটে দেন এবং পরে আর ফোন ধরেননি।

মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে আব্দুল ছোবানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দুর্নীতির সাম্রাজ্য দেশের ভূমি ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখনই সময় আইনি ও প্রশাসনিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার—না হলে ছোবানের মতো আরও অনেকে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে গিলে ফেলবে।

 

Loading

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
error: Content is protected !!

৬০ টাকার হাজিরার কোটিপতি উমেদার: মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দুর্নীতির সাম্রাজ্য!

আপডেট সময় : ০২:০১:৩৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ জুন ২০২৫

সংবাদ প্রতিবেদন:

ঢাকার মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে কর্মরত এক উমেদার, আব্দুল ছোবান—যিনি শুরু করেছিলেন মাত্র ৬০ টাকার হাজিরায়, এখন তিনি এক বিশাল সম্পদের মালিক। জমি, বাড়ি, গাড়ি, এমনকি দেশের বাইরেও জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছেন অবলীলায়। সাধারণ একজন সরকারি কর্মচারীর পক্ষে যা কল্পনাতীত, সেই বাস্তবতাই গড়ে তুলেছেন তিনি। প্রশ্ন হচ্ছে—কীভাবে?

 

২৬ বছর ধরে একই অফিসে কর্মরত ছোবান সময়ের সাথে সাথে পুরো অফিসটিই নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছেন। কাকে আগে ফাইল দিতে হবে, কাকে অফিসে আগে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে, কোন ফাইল কত টাকার বিনিময়ে অগ্রাধিকার পাবে—সবই নির্ধারণ করে তার গড়া সিন্ডিকেট। এমনকি সাব-রেজিস্ট্রার পর্যন্ত অনেক সময় তার ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেন। অফিসের ভিতরে ছোবানের কথাই শেষ কথা।

 

ছোবানের একাধিক ভূমিকা রয়েছে—তিনি কখনও উমেদার, কখনও জমির দালাল, আবার কখনও রেজিস্ট্রারের প্রতিনিধির ভান করেন। এই বহুরূপী চরিত্রই তাকে অফিসের ভেতরে একটি শক্তিশালী প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

 

সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ হলো—তিনি নিজের ভাগ্নে আয়নাল হোসেনকে অফিসে নিয়োগ দিয়েছেন সম্পূর্ণ অবৈধভাবে। কোনও সরকারি নিয়োগপত্র না থাকা সত্ত্বেও আয়নাল অফিসের মূল চাবি রাখেন, এবং রাতের আঁধারে অফিস খুলে দলিল বদল, দাগ নম্বর পরিবর্তন, এমনকি জাল দলিল প্রস্তুতের মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত থাকেন। এসব কার্যকলাপ দেশের ভূমি ব্যবস্থার জন্য চরম হুমকি।

 

ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে ছোবান যে বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন, তা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। বছিলায় তার ১৫ কাঠা জমি রয়েছে যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। আদাবরে রয়েছে নিজের নামে ৬ তলা ভবন, কাটাসুর ও সাতারকুলে আরও জমি, দক্ষিণখানে বড় একটি প্লট। তার স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে রয়েছে মিনিবাস, মাইক্রোবাস ও ইজিবাইক লাইনের মালিকানা। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা ও পারিবারিক ভ্রমণের খরচ চালানো হয় এই ঘুষের অর্থ থেকেই। অফিস থেকে প্রতিদিন যে ঘুষ ওঠে, তার পরিমাণ ১ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত—মাস শেষে যার পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

 

অথচ আয়কর রিটার্নে তিনি সম্পদের হিসাব দেখিয়েছেন মাত্র ৭৯ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। এই ভুয়া হিসাবের মাধ্যমে তিনি শুধু সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করেননি, বরং পুরো সিস্টেমকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন।

 

এই ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। এক সহকারী পরিচালক ছোবানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। তবে এখনো পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো, অফিসে কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুললে বদলি, হুমকি ও মানসিক চাপে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।

 

তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—যেখানে একজন উমেদার পুরো সিস্টেমকে কিনে ফেলতে পারে, সেখানে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার কোথায়? সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান কি শুধুই বক্তৃতা আর নীতিগত অবস্থানেই সীমাবদ্ধ?

 

এখন সময় এসেছে সাহসিকতার সঙ্গে এই সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলার। আব্দুল ছোবান একা নন, তিনি একটি চক্রের প্রতিচ্ছবি। তাকে বিচারের মুখোমুখি না করলে দেশের অন্যান্য ভূমি অফিসেও এরকম দুর্নীতিবাজ চক্ররা শিকড় গেড়ে বসবে। আইনের শাসন ফিরিয়ে আনতে হলে, এদের মুখোশ উন্মোচন করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে—এটাই জনগণের দাবি।

 

এই বিষয়ে বক্তব্য নিতে আব্দুল ছোবানের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তার ভাগ্নে আয়নাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে তিনি কল ধরেন। কিন্তু সাংবাদিক পরিচয় শুনেই সঙ্গে সঙ্গে ফোন কেটে দেন এবং পরে আর ফোন ধরেননি।

মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে আব্দুল ছোবানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দুর্নীতির সাম্রাজ্য দেশের ভূমি ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এখনই সময় আইনি ও প্রশাসনিকভাবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার—না হলে ছোবানের মতো আরও অনেকে ধীরে ধীরে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে গিলে ফেলবে।

 

Loading