ঢাকা ১২:২৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo কুকুর উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পাঠাতে জ্বালানি খরচের দাবি, ৩ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার Logo সরকারি কর্মচারীদের ‘গোলামি’ ও অঢেল সম্পদের পাহাড়: বেরিয়ে আসছে সদ্য বিদায়ী ডিজি জায়েদ কামালের থলের বিড়াল  Logo ফায়ার সার্ভিসের বদলি নীতিমালায় বড় পরিবর্তন: কর্মীরা পাবেন নিজ জেলায় কাজের সুযোগ Logo তৈরি পোশাকশ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার Logo সিডিবিএল চালু করবে মোবাইল অ্যাপ Logo দেশবিরোধী চক্রান্তের কাছে জাতীয়তাবাদী শক্তি আত্মসমর্পণ করবে না : রিজভী Logo গঙ্গা চুক্তি নবায়ন নয়, নতুন চুক্তি চায় এনসিপি: নাহিদ ইসলাম Logo ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের কল্যাণে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী Logo ফের মা হতে চলেছেন কিয়ারা Logo মানবতাবিরোধী অপরাধ : হানিফসহ ৪ আ. লীগ নেতার রায় যেকোনো দিন

বিআইডব্লিউটিএতে ‘বালু সিন্ডিকেট’ আতঙ্ক: ২ হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রির অভিযোগ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:২০:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬ ২৮২ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ঘিরে ভয়াবহ দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের অভিযোগে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। কক্সবাজারে মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ বালু ও মাটি নামমাত্র মূল্যে বিক্রির ঘটনায় উঠে এসেছে একটি শক্তিশালী ‘বালু সিন্ডিকেট’-এর নাম। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিনসহ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পদ মাত্র ২ কোটি ৭৯ লাখ ৩৯ হাজার ৭৩৮ টাকায় ‘টোকিও মিল জেভি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা ও পর্যবেক্ষক।

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৪ মার্চ, যখন কক্সবাজার সদর উপজেলার এন্ডারসন রোড এলাকার বাসিন্দা ও সিআইপি আতিকুল ইসলাম দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামে দুদক।

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মাতারবাড়ি প্রকল্পের ড্রেজিং কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। মহেশখালী চ্যানেলের নুনিয়ার ছড়া থেকে আদিনাথ মন্দিরের উজান পর্যন্ত এলাকা থেকে প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু ও মাটি উত্তোলন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বিপুল সম্পদ উত্তোলন ও বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় ছিল ভয়াবহ অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি এবং কমিশন বাণিজ্য।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুল পরিমাণ ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল উত্তোলনের অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশা। দুদক ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ ও যাচাই শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

২০২৫ সালের ২ অক্টোবর পরিচালিত একটি মোবাইল কোর্ট অভিযানের নথিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই অভিযানে ড্রেজড বালু ও মাটি বাণিজ্যের আড়ালে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের তথ্য সামনে আসে।

অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র মূল্যায়ন থেকে শুরু করে কার্যাদেশ প্রদান এবং চুক্তি সম্পাদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে সাজানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রশাসনের ভেতরে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী একটি চক্র বিআইডব্লিউটিএকে কার্যত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

শুধু কক্সবাজার নয়, পরিচালক এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীতীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নদীতীর ইজারা এবং রাজস্ব আদায়ে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে পুরো ঘটনার অনুসন্ধানে দুদক দুই সদস্যের একটি বিশেষ টিম গঠন করেছে। দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামকে প্রধান এবং সহকারী পরিচালক সুভাষ চন্দ্র মজুমদারকে সদস্য করে গঠিত এই টিম ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতির দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিআইডব্লিউটিএকে ঘিরে যে দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে আসছে, তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিরই প্রতিফলন। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার কারসাজি এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী চক্র বছরের পর বছর ধরে সুবিধা নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।

এখন জনমনে বড় প্রশ্ন, রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুটের অভিযোগে অভিযুক্ত এই চক্রের বিরুদ্ধে আদৌ কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি আগের মতোই অভিযোগগুলো সময়ের সঙ্গে চাপা পড়ে যাবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
error: Content is protected !!

বিআইডব্লিউটিএতে ‘বালু সিন্ডিকেট’ আতঙ্ক: ২ হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রির অভিযোগ

আপডেট সময় : ০৪:২০:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৭ মে ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ঘিরে ভয়াবহ দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের অভিযোগে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। কক্সবাজারে মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ বালু ও মাটি নামমাত্র মূল্যে বিক্রির ঘটনায় উঠে এসেছে একটি শক্তিশালী ‘বালু সিন্ডিকেট’-এর নাম। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিনসহ কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পদ মাত্র ২ কোটি ৭৯ লাখ ৩৯ হাজার ৭৩৮ টাকায় ‘টোকিও মিল জেভি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট অনেক কর্মকর্তা ও পর্যবেক্ষক।

ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ৪ মার্চ, যখন কক্সবাজার সদর উপজেলার এন্ডারসন রোড এলাকার বাসিন্দা ও সিআইপি আতিকুল ইসলাম দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামে দুদক।

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মাতারবাড়ি প্রকল্পের ড্রেজিং কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। মহেশখালী চ্যানেলের নুনিয়ার ছড়া থেকে আদিনাথ মন্দিরের উজান পর্যন্ত এলাকা থেকে প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু ও মাটি উত্তোলন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বিপুল সম্পদ উত্তোলন ও বিক্রির পুরো প্রক্রিয়ায় ছিল ভয়াবহ অনিয়ম, টেন্ডার কারসাজি এবং কমিশন বাণিজ্য।

এখন প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুল পরিমাণ ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল উত্তোলনের অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশা। দুদক ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ ও যাচাই শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

২০২৫ সালের ২ অক্টোবর পরিচালিত একটি মোবাইল কোর্ট অভিযানের নথিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই অভিযানে ড্রেজড বালু ও মাটি বাণিজ্যের আড়ালে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের তথ্য সামনে আসে।

অভিযোগ রয়েছে, দরপত্র মূল্যায়ন থেকে শুরু করে কার্যাদেশ প্রদান এবং চুক্তি সম্পাদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে সাজানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রশাসনের ভেতরে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী একটি চক্র বিআইডব্লিউটিএকে কার্যত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।

শুধু কক্সবাজার নয়, পরিচালক এ.কে.এম. আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে। তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীতীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নদীতীর ইজারা এবং রাজস্ব আদায়ে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে পুরো ঘটনার অনুসন্ধানে দুদক দুই সদস্যের একটি বিশেষ টিম গঠন করেছে। দুদকের উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলামকে প্রধান এবং সহকারী পরিচালক সুভাষ চন্দ্র মজুমদারকে সদস্য করে গঠিত এই টিম ইতোমধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।

দুদক সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ শেষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতির দাবিও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিআইডব্লিউটিএকে ঘিরে যে দুর্নীতির চিত্র বেরিয়ে আসছে, তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতিরই প্রতিফলন। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার কারসাজি এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী চক্র বছরের পর বছর ধরে সুবিধা নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।

এখন জনমনে বড় প্রশ্ন, রাষ্ট্রের হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুটের অভিযোগে অভিযুক্ত এই চক্রের বিরুদ্ধে আদৌ কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি আগের মতোই অভিযোগগুলো সময়ের সঙ্গে চাপা পড়ে যাবে।