ইইডির সবচেয়ে ধনাঢ্য প্রকৌশলী: বদলিতেও বদলায়নি ‘লীগপন্থী’ বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা প্রকৌশলী আলিফের দুর্নীতির চিত্র!
- আপডেট সময় : ০৩:৫৭:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭৬ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিবেদক:
গ্রামের কোনো এক জীর্ণ সরকারি স্কুল। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে কোমলমতি শিশুদের বই-খাতা ভিজে একাকার হয়ে যায়, আবার খড়রোদ উঠলে টিনের চালের নিচে বসে হাঁসফাঁস করতে হয় তাদের। দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর মাথার ওপর একটি নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলার দায়িত্ব ছিল যে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি), সেই দপ্তরের বরাদ্দের টাকায় নিজস্ব ভাগ্য বদলেছেন এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দলীয় দাপট খাটিয়ে শতকোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া এমনই এক বহুল আলোচিত নাম—বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সক্রিয় সদস্য ও ইইডির প্রকৌশলী মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ।
এক বছর আগে পাঁচ কোটি টাকার বিনিময়ে প্রধান কার্যালয় বদলি হলেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ উঠে।
এছাড়াও গণমাধ্যমে তার থলথলে দুর্নীতির সাম্রাজ্য ও অবৈধ সম্পদের বিস্তারিত চিত্র ফুটে উঠলেও কোনো দৃশ্যমান শাস্তি অথবা তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হতে হয়নি তাকে। আইনি কিংবা বিভাগীয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে নামমাত্র লোকদেখানো বদলি করা হয়েছে তাকে। বর্তমানে ইইডির চাঁদপুর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি হয়ে কর্মরত থাকলেও সেখানে বসেই আগের মতো পুরোনো নেটওয়ার্ক ও প্রভাব বহাল রেখেছেন তিনি। স্থান বদলালেও তার দুর্নীতির ধরন ও অধরা থাকার কৌশল বদলায়নি একটুও।
বদলিই কি অপরাধের মুক্তি?
সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা আর শিক্ষার বাজেটের অর্থ লুটপাট করে যারা নিজের আখের গুছিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা বা আইডিয়াল শাস্তির বদলে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে বদলি করাকে ‘শাস্তি’ নয়, বরং এক ধরনের ‘সুরক্ষা’ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইইডির অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, এক বছর আগে আলিফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে তীব্র তোলপাড় হলেও, প্রশাসনিক মারপ্যাঁচে তিনি কেবল চাঁদপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেব এ বদলির আদেশ পান। বদলিকৃত নতুন কর্মস্থলে গিয়েও তার স্বভাবসুলভ প্রশাসনিক চতুরতার মাধ্যমে নিজের আধিপত্য ধরে রেখেছেন। ইইডির ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ, মেগা প্রকল্পের কমিশন বাণিজ্য এবং পছন্দের লোকজনকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অদৃশ্য সিন্ডিকেট তিনি এখনো দূর থেকেই পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের।
কোমলমতির শিক্ষার টাকায় গড়া শতকোটি টাকার প্রাসাদ
যে বয়সে শিশুদের হাতে ভালো বই আর সুন্দর শ্রেণিকক্ষ পাওয়ার কথা, সেই বয়সে তাদের প্রাপ্য অধিকার কেড়ে নিয়ে প্রকৌশলী আলিফ গড়ে তুলেছেন টাকার পাহাড়। নথিপত্র ও
অনুসন্ধানে উঠে আসে:
রাজধানীতে বিলাসবহুল রাজত্ব: রাজধানীর সেগুনবাগিচাসহ অভিজাত এলাকাগুলোতে একাধিক মূল্যবান ফ্ল্যাট ও প্লটের মালিক তিনি।
বেনামে সম্পদের পাহাড়: নিজের অবৈধ উপার্জনের কাঁচা টাকা ঢাকতে নিজ গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন ও নিকটজনদের নামে কিনেছেন বিঘার পর বিঘা জমি ও স্থাবর সম্পত্তি।
আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয়ে একছত্র প্রভাব: ২০২২ সালের ২৭ জুলাই গঠিত ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’-এর ১৯ সদস্যের বিতর্কিত আহ্বায়ক কমিটিতে নাম লিখিয়ে ইইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শাহ্ নইমুল কাদের ও আবুল হাসেম সরদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে পুরো দপ্তরে সিন্ডিকেট রাজত্ব চালান তিনি।
এক বছর পরও মেলেনি জবাব, কাটেনি অসন্তোষ
এক বছর আগে যখন এসব দুর্নীতির বিষয়ে তার মুখোমুখি হওয়া হয়েছিল, তখন প্রকৌশলী আলিফ দাবি করেছিলেন, “এসব মিথ্যে। কেউ আমার চেয়ারে বসার জন্য আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ছড়াচ্ছে।”
কিন্তু এক বছর পেরিয়ে নতুন জায়গায় বদলি হওয়ার পরও তার বিশাল সম্পদের রাজত্ব কিংবা আয়ের সাথে সঙ্গতিহীন জীবনযাপনের কোনো সদুত্তর মেলেনি। দেশের লাখ লাখ শিশু যখন ভাঙাচোরা শ্রেণিকক্ষে বসে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে, তখন একজন সরকারি প্রকৌশলীর এভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলি হয়ে পার পেয়ে যাওয়া পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর এক বড় ধরনের উপহাস।
সুশাসনের দাবিতে সোচ্চার নাগরিক সমাজ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের এখন একটাই প্রশ্ন—নামমাত্র বদলির চাদরে আর কতদিন ঢাকা থাকবে আলিফের মতো কর্মকর্তাদের দুর্নীতি? অবিলম্বে তার অর্জিত সম্পদের সঠিক উৎস অনুসন্ধান করে আইনি পদক্ষেপ না নিলে, সরকারি দপ্তরগুলোতে অপরাধের এই মহোৎসবে কখনোই লাগাম টানা সম্ভব হবে না।























