ঢাকা ০২:২৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo জাপানে নিটসু লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী Logo দেশে বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের জোরালো আহ্বান রাষ্ট্রপতির Logo রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত: প্রধানমন্ত্রী Logo জ্বালানি ও বিনিয়োগ সহযোগিতায় গুরুত্বারোপ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের Logo মাথাপিছু জিডিপিতে এ বছর ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ: আইএমএফ Logo মোটরসাইকেলের চেইন পরিষ্কার ও লুব করার সঠিক নিয়ম Logo নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের প্রথম পর্বের ৪০ খেলোয়াড় বিকেএসপিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণে ভর্তির সুযোগ Logo তেহরানে বৈঠকে বসছে মক্কা প্যাক্ট ও ইরান Logo নিত্যপণ্যের আমদানি বেড়েছে, রমজানে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার আশা Logo লগি-বৈঠার আঘাতে নিহতদের স্মরণ করলেন বিরোধীদলীয় নেতা

“শেষ আশ্রয়টুকুও হারানোর ভয়, বানিয়াশান্তায় বাঁচার লড়াই” যৌন পেশা ছাড়তে চান অনেক নারী

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৪০:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ১৪১ বার পড়া হয়েছে

অস্তিত্বের সংকটে ৪২০ বাসিন্দা, দাবি টেকসই বাঁধ, নিরাপদ পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের

এস এম সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট | সুন্দরবন থেকে ফিরে:  দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন উপকূলে পশুর নদের তীরে অবস্থিত বানিয়াশান্তা যৌনপল্লির বাসিন্দাদের জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার ছায়া। নদীভাঙন, দারিদ্র্য, জীবিকার সংকট ও সামাজিক বঞ্চনায় বিপর্যস্ত এই জনপদের প্রায় ৪২০ বাসিন্দা এখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন। খুলনার দাকোপ উপজেলার বাজুয়া ইউনিয়নে অবস্থিত এই জনপদের মানুষের বড় উদ্বেগ—পশুর নদের ভাঙনে শেষ আশ্রয়টুকু হারালে তাঁরা কোথায় যাবেন, কীভাবে বাঁচবেন?
স্থানীয় সূত্রের হিসাবে, এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে নারী প্রায় ১২০ জন। তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে প্রতিকূল পরিবেশে জীবন কাটাচ্ছেন। অভাব-অনটন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যেও নতুনভাবে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখছেন অনেকে। বিশেষ করে যৌন পেশা ছেড়ে সম্মানজনক বিকল্প জীবিকা গড়ে তুলতে আগ্রহী নারীরা চান প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ। কিন্তু পুঁজি, দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা এবং সামাজিক সহযোগিতার অভাবে তাঁদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ সহজ হচ্ছে না।
এর মধ্যে পশুর নদের ভাঙন তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নদীর তীরঘেঁষা বসতিগুলো ঝুঁকিতে থাকায় যেকোনো সময় ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে বাসিন্দাদের। তাঁদের দাবি, দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

অতীতের ক্ষত পেরিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন
বানিয়াশান্তার অনেক নারীর জীবনে রয়েছে প্রতারণা, অসহায়ত্ব ও ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের গল্প। কেউ সম্পর্কের সূত্রে প্রতারিত হয়ে, কেউ ভালো চাকরি কিংবা উন্নত জীবনের আশায় এসে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। কারও জীবনে আপনজনের বিশ্বাসঘাতকতা তৈরি করেছে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। সেই বাস্তবতার মধ্যেও অনেকেই অতীত পেছনে ফেলে নতুনভাবে বাঁচতে চান।
কেউ ছোট একটি দোকান দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন, কেউ সেলাই বা কারিগরি কাজ শিখে স্বাবলম্বী হতে চান। আবার অনেকের প্রধান আকাঙ্ক্ষা সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। কিন্তু নতুন জীবনের শুরুতে প্রয়োজনীয় পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ না থাকায় তাঁদের অনেকের ইচ্ছাই বাস্তবে রূপ নিতে পারছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে তাঁদের অনেকেই স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবেন। এ ক্ষেত্রে সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।

কমেছে আয়, বেড়েছে অনিশ্চয়তা
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আগের তুলনায় ক্রেতা কমে যাওয়ায় অনেকের আয় কমেছে। ফলে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীভাঙনের আতঙ্ক। ঘরবাড়ি বিলীন হলে কোথায় আশ্রয় নেবেন, সন্তানদের নিয়ে কীভাবে জীবন চালাবেন—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তাঁরা।
বাসিন্দাদের কাছে নদীভাঙন শুধু বসতভিটা হারানোর আশঙ্কা নয়, জীবিকার শেষ অবলম্বন হারানোরও ভয়। দীর্ঘদিনের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়া তাঁদের জন্য সহজ নয়। আবার নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত না হলে নতুন করে জীবন শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়বে।

তিন দশকেও স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষা
বানিয়াশান্তায় প্রায় ৩০ বছর ধরে বসবাস করছেন এমন এক বাসিন্দার অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নদীভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধান হয়নি। তাঁর দাবি, দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ করে তাঁদের বসতভিটা ও শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা করতে হবে।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ প্রবীণদের দুশ্চিন্তাও কম নয়। স্বামীর সঙ্গে জীবনের ৬০ বছরের বেশি সময় এই এলাকায় কাটিয়েছেন এমন এক নারী জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর এখন আমড়া ও শসা বিক্রি করে কোনোমতে দিন চালান তিনি। দীর্ঘদিনের বসবাসের কারণে এই এলাকার সঙ্গে তাঁর জীবিকা ও স্মৃতি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। নদীভাঙনে শেষ আশ্রয়টুকু হারালে জীবনের শেষ বয়সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন, সেই চিন্তাই তাঁকে তাড়া করে ফিরছে।

বাঁধের পাশাপাশি পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দা মো. খাইরুল হোসেনের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তাঁর মতে, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসন এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাসিন্দারা বলছেন, শুধু বাঁধ নির্মাণ করলেই তাঁদের সংকটের পূর্ণ সমাধান হবে না। পাশাপাশি প্রয়োজন নিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুদের শিক্ষার সুযোগ, নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিকল্প কর্মসংস্থান। বিশেষ করে যৌন পেশা ছেড়ে নতুন জীবন শুরু করতে আগ্রহী নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা ও সম্মানজনক কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তাঁদের মতে, সামাজিক বঞ্চনা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক নারী বিকল্প পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। তাই সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো এবং তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথ সুগম করাও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশাসনের আশ্বাস
এ বিষয়ে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু জানান, বানিয়াশান্তা যৌনপল্লির বাসিন্দাদের বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং তাঁদের নিয়ে কাজ চলছে। পশুর নদের ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তবে বাসিন্দাদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আশ্বাসের বাস্তবায়ন। নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ, নিরাপদ পুনর্বাসন এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা কত দ্রুত নিশ্চিত হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে তাঁদের ভবিষ্যৎ।
শুধু বাঁধ নয়, চাই বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা

বানিয়াশান্তার সংকট কেবল নদীভাঙনের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, সামাজিক বঞ্চনা, অনিশ্চিত জীবিকা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রশ্ন। এখানকার অনেক নারী অতীতের পরিচয় পেছনে ফেলে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে চান। তাঁদের সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক সহযোগিতা।
পশুর নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে বানিয়াশান্তার বাসিন্দাদের দাবি তাই শুধু একটি টেকসই বাঁধের নয়—তাঁরা চান নিরাপদ আশ্রয়, সম্মানজনক জীবিকার সুযোগ এবং নতুন করে জীবন গড়ার নিশ্চয়তা। এখন দেখার বিষয়, তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি ও নতুন জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
error: Content is protected !!

“শেষ আশ্রয়টুকুও হারানোর ভয়, বানিয়াশান্তায় বাঁচার লড়াই” যৌন পেশা ছাড়তে চান অনেক নারী

আপডেট সময় : ০৭:৪০:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

অস্তিত্বের সংকটে ৪২০ বাসিন্দা, দাবি টেকসই বাঁধ, নিরাপদ পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের

এস এম সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট | সুন্দরবন থেকে ফিরে:  দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন উপকূলে পশুর নদের তীরে অবস্থিত বানিয়াশান্তা যৌনপল্লির বাসিন্দাদের জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার ছায়া। নদীভাঙন, দারিদ্র্য, জীবিকার সংকট ও সামাজিক বঞ্চনায় বিপর্যস্ত এই জনপদের প্রায় ৪২০ বাসিন্দা এখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছেন। খুলনার দাকোপ উপজেলার বাজুয়া ইউনিয়নে অবস্থিত এই জনপদের মানুষের বড় উদ্বেগ—পশুর নদের ভাঙনে শেষ আশ্রয়টুকু হারালে তাঁরা কোথায় যাবেন, কীভাবে বাঁচবেন?
স্থানীয় সূত্রের হিসাবে, এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে নারী প্রায় ১২০ জন। তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে প্রতিকূল পরিবেশে জীবন কাটাচ্ছেন। অভাব-অনটন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যেও নতুনভাবে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখছেন অনেকে। বিশেষ করে যৌন পেশা ছেড়ে সম্মানজনক বিকল্প জীবিকা গড়ে তুলতে আগ্রহী নারীরা চান প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের সুযোগ। কিন্তু পুঁজি, দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা এবং সামাজিক সহযোগিতার অভাবে তাঁদের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ সহজ হচ্ছে না।
এর মধ্যে পশুর নদের ভাঙন তাঁদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নদীর তীরঘেঁষা বসতিগুলো ঝুঁকিতে থাকায় যেকোনো সময় ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে বাসিন্দাদের। তাঁদের দাবি, দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

অতীতের ক্ষত পেরিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন
বানিয়াশান্তার অনেক নারীর জীবনে রয়েছে প্রতারণা, অসহায়ত্ব ও ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের গল্প। কেউ সম্পর্কের সূত্রে প্রতারিত হয়ে, কেউ ভালো চাকরি কিংবা উন্নত জীবনের আশায় এসে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। কারও জীবনে আপনজনের বিশ্বাসঘাতকতা তৈরি করেছে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা। সেই বাস্তবতার মধ্যেও অনেকেই অতীত পেছনে ফেলে নতুনভাবে বাঁচতে চান।
কেউ ছোট একটি দোকান দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন, কেউ সেলাই বা কারিগরি কাজ শিখে স্বাবলম্বী হতে চান। আবার অনেকের প্রধান আকাঙ্ক্ষা সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। কিন্তু নতুন জীবনের শুরুতে প্রয়োজনীয় পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ না থাকায় তাঁদের অনেকের ইচ্ছাই বাস্তবে রূপ নিতে পারছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে তাঁদের অনেকেই স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবেন। এ ক্ষেত্রে সামাজিক নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।

কমেছে আয়, বেড়েছে অনিশ্চয়তা
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আগের তুলনায় ক্রেতা কমে যাওয়ায় অনেকের আয় কমেছে। ফলে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীভাঙনের আতঙ্ক। ঘরবাড়ি বিলীন হলে কোথায় আশ্রয় নেবেন, সন্তানদের নিয়ে কীভাবে জীবন চালাবেন—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তাঁরা।
বাসিন্দাদের কাছে নদীভাঙন শুধু বসতভিটা হারানোর আশঙ্কা নয়, জীবিকার শেষ অবলম্বন হারানোরও ভয়। দীর্ঘদিনের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়া তাঁদের জন্য সহজ নয়। আবার নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত না হলে নতুন করে জীবন শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়বে।

তিন দশকেও স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষা
বানিয়াশান্তায় প্রায় ৩০ বছর ধরে বসবাস করছেন এমন এক বাসিন্দার অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নদীভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধান হয়নি। তাঁর দাবি, দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণ করে তাঁদের বসতভিটা ও শেষ আশ্রয়টুকু রক্ষা করতে হবে।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ প্রবীণদের দুশ্চিন্তাও কম নয়। স্বামীর সঙ্গে জীবনের ৬০ বছরের বেশি সময় এই এলাকায় কাটিয়েছেন এমন এক নারী জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর এখন আমড়া ও শসা বিক্রি করে কোনোমতে দিন চালান তিনি। দীর্ঘদিনের বসবাসের কারণে এই এলাকার সঙ্গে তাঁর জীবিকা ও স্মৃতি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। নদীভাঙনে শেষ আশ্রয়টুকু হারালে জীবনের শেষ বয়সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন, সেই চিন্তাই তাঁকে তাড়া করে ফিরছে।

বাঁধের পাশাপাশি পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের দাবি
স্থানীয় বাসিন্দা মো. খাইরুল হোসেনের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তাঁর মতে, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসন এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাসিন্দারা বলছেন, শুধু বাঁধ নির্মাণ করলেই তাঁদের সংকটের পূর্ণ সমাধান হবে না। পাশাপাশি প্রয়োজন নিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিশুদের শিক্ষার সুযোগ, নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিকল্প কর্মসংস্থান। বিশেষ করে যৌন পেশা ছেড়ে নতুন জীবন শুরু করতে আগ্রহী নারীদের জন্য প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা ও সম্মানজনক কাজের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
তাঁদের মতে, সামাজিক বঞ্চনা ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক নারী বিকল্প পেশায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন। তাই সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো এবং তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথ সুগম করাও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশাসনের আশ্বাস
এ বিষয়ে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু জানান, বানিয়াশান্তা যৌনপল্লির বাসিন্দাদের বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং তাঁদের নিয়ে কাজ চলছে। পশুর নদের ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
তবে বাসিন্দাদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আশ্বাসের বাস্তবায়ন। নদীভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ, নিরাপদ পুনর্বাসন এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা কত দ্রুত নিশ্চিত হবে, তার ওপরই নির্ভর করছে তাঁদের ভবিষ্যৎ।
শুধু বাঁধ নয়, চাই বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা

বানিয়াশান্তার সংকট কেবল নদীভাঙনের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দারিদ্র্য, সামাজিক বঞ্চনা, অনিশ্চিত জীবিকা ও নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রশ্ন। এখানকার অনেক নারী অতীতের পরিচয় পেছনে ফেলে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে চান। তাঁদের সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি, দক্ষতা উন্নয়ন, আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক সহযোগিতা।
পশুর নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে বানিয়াশান্তার বাসিন্দাদের দাবি তাই শুধু একটি টেকসই বাঁধের নয়—তাঁরা চান নিরাপদ আশ্রয়, সম্মানজনক জীবিকার সুযোগ এবং নতুন করে জীবন গড়ার নিশ্চয়তা। এখন দেখার বিষয়, তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি ও নতুন জীবনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।