পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে পরিচালক মীর সাজেদুর রহমানকে ঘিরে প্রশাসনিক অনিয়মের বিতর্ক
- আপডেট সময় : ০৮:১১:২৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬ ৫৯৬ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক:
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও বর্তমান পরিচালক (প্রশাসন) মীর সাজেদুর রহমানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক লেনদেন এবং পেশাগত নৈতিকতার পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, তার বিরুদ্ধে একাধিকবার অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রভাবশালী অতিরিক্ত সচিবের প্রশ্রয় পেয়ে আসছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্তের মুখ দেখেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অধিদপ্তরের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গ্রেডেশন তালিকায় ৫১ নম্বরে অবস্থান করলেও ২০২১ সালের পর থেকে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি পরিচালক পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। নিয়ম অনুযায়ী পদোন্নতি না পেলেও তদবিরের মাধ্যমে ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় পরিচালকের দায়িত্ব পান বলে অভিযোগ রয়েছে, যা প্রচলিত প্রশাসনিক নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ময়মনসিংহ বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে তিনি আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে ময়মনসিংহের আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ফাহমি গোলন্দাজ বাবেলের তদবিরে তিনি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (আইইএম) পদে দায়িত্ব পান বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৬ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি অফিসে গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েন এবং ভয়ে অফিস ত্যাগ করেন। বিষয়টি নিয়ে সে সময় জাতীয় দৈনিকে সংবাদও প্রকাশিত হয়। এরপর কয়েকদিন তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে নিজেকে জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন এবং পটুয়াখালীর বাউফলের জামায়াত নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিতে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ওই নেতার নির্বাচনী কার্যক্রমে সহায়তার জন্য বাউফলের পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাঠকর্মীদের কাজে লাগানোর অভিযোগও উঠেছে।
পরবর্তীতে পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে একাধিক প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো লিখিত আবেদন বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুপারিশ ছাড়াই প্রায় ৩০০ জন চিকিৎসককে বদলি করা হয়েছে। এসব বদলির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি বদলির ক্ষেত্রে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। এ কাজে ডা. সুলতান আহমেদ নামে এক কর্মকর্তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে জানা গেছে।
এছাড়া অফিস সহায়ক থেকে অফিস সহকারী পদে পদোন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গোপন করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের ডেকে হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে নিজের খালাতো বোন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা আবিদা সুলতানাকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে খুলনার বটিয়াঘাটা থেকে পটুয়াখালী সদরে বদলি করা হয়। একইভাবে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি ও পদায়নে অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার একাধিক উদাহরণ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাবেক মহাপরিচালক সাইফুল্লাহ হিল আজমের দায়িত্ব ছাড়ার আগে ও পরে কয়েক দিনের নথিপত্র তদন্ত করলে এসব অনিয়মের বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, তৎকালীন প্রশাসন ইউনিটের নির্দেশে অনেক ফাইল ব্যাকডেট করে মহাপরিচালকের বাসা থেকে অনুমোদন আনা হয়েছিল এবং সেগুলোর জিও ধাপে ধাপে জারি করা হয়, যাতে বিষয়টি সহজে ধরা না পড়ে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মন্ত্রণালয়ের আদেশ বহাল থাকা সত্ত্বেও একজন কর্মকর্তাকে অধিদপ্তর থেকে আলাদা আদেশ জারি করে পদায়নের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ওই আদেশ বাতিল না করেই নতুন আদেশ জারি করা হয়, যা প্রশাসনিকভাবে অস্বাভাবিক।
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে উপসচিব পদে পদোন্নতির প্রস্তাব পাঠানোর ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে কয়েকজন সিনিয়র কর্মকর্তার আবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ রয়েছে, মীর সাজেদুর রহমান তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ৩১তম বিসিএস কর্মকর্তা নাজমুর রওশন সুমেলকে পদোন্নতি না থাকা সত্ত্বেও সহকারী পরিচালক হিসেবে ময়মনসিংহ বিভাগে পদায়ন করেন। পরবর্তীতে তাকে আইইএম ইউনিটে আনা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ময়মনসিংহ অঞ্চলে সুমেলের প্রভাব এতটাই বেশি ছিল যে তার অনুমতি ছাড়া কোনো ফাইলের কাজ এগোতো না।
নিয়োগ কার্যক্রম নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ফলাফল প্রকাশের আগেই নিয়োগ তালিকায় কারসাজির চেষ্টা করা হয় এবং এ কাজে মীর সাজেদুর রহমান ও নাজমুর রওশন সুমেলের সম্পৃক্ততা ছিল। এতে সহযোগিতা করতে চাপ দেওয়া হলে প্রশাসন ইউনিটের এক কর্মকর্তা চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন বলেও জানা গেছে।
অন্যদিকে উপপরিচালক সায়মা রেজাকে কেন্দ্র করেও অধিদপ্তরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট পদ না থাকা সত্ত্বেও প্রায় এক দশক ধরে তিনি সংযুক্তিতে পেনশন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এই ইউনিটে থাকার জন্য নিয়মবহির্ভূতভাবে দুটি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। পেনশন সংক্রান্ত ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অর্থ না পেলে ফাইল দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা হয়।
এছাড়া মীর সাজেদুর রহমান ও সায়মা রেজার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। এ কারণে প্রশাসন ইউনিটের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে অস্বাভাবিক প্রভাব পড়ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের কারণে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, শৃঙ্খলা ও সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা জনস্বার্থে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
চলবে….












