ধর্মীয় উসকানিতে দিপুর মৃত্যু আমাদের কোন আয়নায় দাঁড় করায়
- আপডেট সময় : ০৯:১৫:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ ৭৩ বার পড়া হয়েছে

হাফিজুর রহমান শফিক: একটা প্রশ্ন দিয়েই শুরু করা দরকার দিপুকে যে নির্মম পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া হলো, তা ইসলামের কোন কিতাব, কোন হাদিসে লেখা আছে? কোথায় বলা হয়েছে সন্দেহ, গুজব কিংবা উত্তেজিত জনতার রায়ে একজন মানুষকে পিটিয়ে, অপমান করে, আগুনে ঝলসে মারা যাবে?
হাদী চেয়েছিল একটি ইনসাফের বাংলাদেশ। সেই দাবি ঘিরে আমরা কত শোরগোল তুলেছি, কত মিছিল, কত স্লোগান। কিন্তু দিপুর জন্য রাস্তায় কয়জন নেমেছি? প্রায় কেউই না। কারণটা অস্বস্তিকর, কিন্তু সত্য -তার ধর্ম আমাদের সঙ্গে মেলেনি। অথচ দিপুও কারও মায়ের সন্তান। হাদী যেমন কারও বুকের ধন, দিপুও ঠিক তেমনি।
যে ঘটনা ঘটেছে, তা কোনো বিচারের ফল নয়। মিথ্যা অপবাদ, দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত মানুষের নীরবতা—সব মিলিয়ে এটি ছিল পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা। প্রশাসনের কাছে সাহায্য চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেখান থেকেও আশ্রয় মেলেনি। বরং যে জায়গাটি নিরাপত্তার প্রতীক হওয়ার কথা, সেটিই খুলে দেওয়া হলো উন্মত্ততার হাতে। মানুষ মরলো, আর বাকিরা মোবাইল তুললো।
এখানেই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা আসে—ইসলাম কি এটাই শেখায়? ইসলাম তো স্পষ্টভাবে বলে, ন্যায়ের আগে আবেগ নয়। প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ নয়। একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করলে তা যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল। বিচার কেবল আদালতের, জনতার নয়। অপমান, উলঙ্গকরণ, নির্যাতন—এসব তো মানবাধিকারেরও চরম লঙ্ঘন, ইসলামের তো নয়ই।
তবু এই সবকিছু ঘটলো “ধর্মের” নামে। যারা করলো, তারা নিজেদের ইসলামের ঠিকাদার ভাবলো। কিন্তু সত্যটা উল্টো—তারা ধর্মকে ঢাল বানিয়ে অমানবিকতাকে বৈধ করতে চেয়েছে। ধর্ম এখানে পথ দেখায়নি; পথ হারিয়েছে মানুষই।
আরেকটা আয়নায় তাকানো দরকার। ভারতে এমন কিছু হলে আমরা ধর্ম টেনে কঠোর সমালোচনা করি। তখন মানবতা আমাদের পাশে থাকে। আজ নিজের ঘরে এমন ঘটলে আমরা চুপ। কেন? কারণ আত্মসমালোচনা কঠিন। কারণ আমরা বেশি ধর্মীয় হতে গিয়ে মানুষ হওয়াটা ভুলে গেছি।
ধর্ম মানুষের জন্য। মানুষ ধর্মের বলি নয়। ইনসাফ মানে কেবল নিজের দলের, নিজের বিশ্বাসের জন্য নয়—ইনসাফ মানে সবার জন্য একই মানদণ্ড। দিপুর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ন্যায়বিচার যদি বিশ্বাসের সীমানায় আটকে যায়, তাহলে তা আর ন্যায় থাকে না।
আজ প্রশ্নটা দিপুকে নিয়ে নয় শুধু। প্রশ্নটা আমাদের সমাজকে নিয়ে। আমরা কি এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে গুজবই রায়, জনতাই আদালত, আর প্রশাসন নীরব দর্শক? নাকি এমন দেশ চাই, যেখানে ধর্ম মানুষকে মানবিক করে, নিষ্ঠুর নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর না খুঁজলে, দিপু একা থাকবে না। তালিকাটা শুধু বড় হবে।
লেখক: হাফিজুর রহমান শফিক (সাংবাদিক)














