এনবিআর সদস্য ড. মতিউর রহমানের সম্পদের পাহাড় শীর্ষক সংবাদের প্রতিবাদ ও প্রতিবেদকের বক্তব্য
- আপডেট সময় : ১০:৫৬:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ ৫৬৪ বার পড়া হয়েছে

সম্প্রতি পদোন্নতি পাওয়া এনবিআর সদস্য , রাজস্ব কর্মকর্তা ড. মতিউর রহমানের সম্পদের পাহাড় শিরোনামে সকালের সংবাদ অনলাইন ভার্সনে একটি অনুসন্ধানী সংবাদ প্রচারের পর প্রচারিত সংবাদের বিষয়ে লিখিত বক্তব্য পাঠিয়েছেন তিনি। উক্ত বক্তব্যে তিনি নিজেকে নিষ্পাপ এবং নির্দোষ দাবি করেন।
তার প্রতিবাদ ও প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রতিবেদকের বক্তব্য সহ নিচে তুলে ধরা হলো:
ড. মতিউর রহমানের ওঠানো বক্তব্য কোন প্রকার সংশোধন ছাড়া হুবহু তুলে ধরা হলো:
আপনি যেসব অভিযোগ করেছেন তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অসত্য। আমার বা আমার পরিবারের যে অর্থ সম্পদ আছে তা যথাযথ আইন দ্বারা সমর্থিত। কারো সম্পদ থাকলেই তা অবৈধ হয়ে যায় না। সরকারি চাকুরিতে নিয়োজিত থেকেও বৈধভাবে অর্থ উপার্জন করা যায়।
আপনার অবগতির জন্যে জানাচ্ছি যে, কাস্টমসে চাকুরি যদি এতই লোভনীয় হতো তাহলে আমি স্বেচ্ছায় প্রায় ৮ বছর কাস্টমস থেকে সরে যেতাম না। এই সময়ের মধ্যে ৩ বছর লিয়েনে ফরেন সার্ভিসে, ২ বছর রাজনৈতিক নিয়োগ হিসেবে তৎকালীন মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানকের প্রাইভেট সেক্রেটারি, আরও ৩ আমি কাস্টমসের বাইরে ছুটিতে ছিলাম। এতে স্পষ্ট কাস্টমস আমার কাছে কোন মধুর হাড়ি নয়।
সরকারি দায়িত্বপালনকালে সঠিক ভূমিকা রাখার জন্যে আমি অনেকেরই বিরাগভাজন হয়েছি। রাজস্ব প্রশাসনের স্বচ্ছতা আনতে সর্বত্র অটোমেশনের উপর গুরুত্ব দিয়েছি। বৃহৎ করদাতা ইউনিটের কমিশনার থাকাকালে সর্বোচ্চ পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের কৃতিত্বসহ ভ্যাট এলটিইউকে দুর্নীতিমুক্ত ঘোষণা করেছিলাম। এসব কারণে অনেকের বিরাগভাজন হয়েছি।
আমার চাকুরিকালীন সময়ে বহু মিথ্যা বেনামী অভিযোগ দিয়ে আমাকে নানাভাবে হয়রানী করা হয়েছে। এসব অভিযোগের উপর ভিত্তি করে দুদক ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলো বহুবার আমার বিষয়ে তদন্ত বা অনুসন্ধান করেছে। শেষ পর্যন্ত সব অভিযোগই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
বিশেষ করে পদোন্নতির সময়ে উদ্দেশ্যমূলক ও পরিকল্পিতভাবে এমন অভিযোগ এনে হয়রানী করা হয়। এটা অনেক পুরনো রীতি।
সর্বশেষ বলতে চাই, সঠিকভাবে দায়িত্বপালন করলেও ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। আমিও ভুলভ্রান্তির উর্দ্ধে নয়। আপনি আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগের কথা বলছেন তা আমি দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করছি। এসব পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কল্পকাহিনী কোন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পেলে তা যথাযথভাবে প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ প্রচলিত আইনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আমি বাধ্য হবো।
আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি আগ্রহ নিয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সংগ্রহ করার জন্যে। এসব পুরনো কাহিনী। আমি এসব ভিত্তিহীন অভিযোগের প্রুতবাদ জানাচ্ছি। আপনাকে আমার অফিসে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আপনার যদি আরও কোন প্রশ্ন থাকে আমি জবাব দিতে প্রস্তুতি আছি। ধন্যবাদ।
প্রতিবেদকের বক্তব্য:
ড. মতিউর রহমানের শত কোটি টাকার সম্পদ এর বিবরণ তুলে ধরে দুদুকে জমা করা অভিযোগ পত্রটি হাতে পৌঁছায়। উক্ত অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে অনুসন্ধান করে একাধিক ব্যবসা, বাড়ি ও ফ্ল্যাটের বাস্তবতা খুঁজে পাই।
বসুন্ধরা এলাকায় ব্লক – ডি এর ১ নাম্বার সড়কে ৫ কাঠার উপর বিলাসবহুল আলিশান বাড়ি পাওয়া গেছে, ওই বাড়ির দারোয়ান নিশ্চিত করে বলেন, বাড়িটি মতিউর রহমান স্যারের, প্রতিটি ইউনিট ভাড়া দেয়া রয়েছে, বাড়িটির দোতলায় স্যার সপরিবারে বসবাস করেন। (যার ভিডিও রয়েছে প্রতিবেদকের নিকট) এর আগেই অভিযোগের বিষয় মুঠোফোনে মতিউর রহমানের কাছে জানতে চাইলে ওই বাড়িটি তার মেয়ের নামে রয়েছে বলে প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেন। (যা প্রতিবেদকের নিকট কল রেকর্ডে সুরক্ষিত রয়েছে)।
এছাড়া অভিযোগে উল্লিখিত ব্লগ-ডি এর ১০ নম্বর সড়কে ৩৮৪ নাম্বার বাসার ফ্লাটটি সড়ক ৭/এ এর ৩৮৪ নম্বর বাড়ির ৫ তলায় ৫০১ নাম্বার ফ্লাট। যার মালিকানা তার স্ত্রীর নামে রয়েছে, উক্ত ফ্লাট ভাড়ায় দেয়া রয়েছে বলেও উক্ত ভবনের দারোয়ান ও ম্যানেজার সত্যতা স্বীকার করেন। যার ভিডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখিত গ্লোবাল সুজ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান থাকার বিষয়ে সরেজমিনে খোঁজখবর নিয়ে জানা যায় উক্ত সুজ ফ্যাক্টরিটি ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত। অনুসন্ধানে ভালুকার সিডস্টোর এলাকায় চেচুয়ার মোড়ে প্রায় ৩০০ একর জমির উপর বিস্তৃত আন্তর্জাতিক মানের জুতার কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। উক্ত কারখানার দায়িত্বে থাকা ডঃ মতিউর রহমানের নিজ ইউনিয়নের বিশ্বস্ত কাইয়ুম জানান, নোয়াখালীর তোফাজ্জল হোসেন ফরহাত স্যারের সাথে মতিউর স্যার অংশীদার হিসেবেই এই ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি প্রায় সময়ই বিদেশি ব্যবসায়ী পর্যবেক্ষকদের নিয়ে এখানে পরিদর্শনে আসেন। কাইয়ুম আরো জানান, এখানে উৎপাদিত পণ্য দেশের বাজারে বিক্রি হয় না এগুলো সরাসরি বিদেশে চলে যায় এখানে বিদেশী অনেক নাগরিকরাও কাজ করেন। প্রায় ২৫০ জনের মত শ্রমিক রয়েছে। এই ফ্যাক্টরিটি ওরিয়ান গ্রুপের কাছ থেকে ভাড়ায় নেয়া হয়েছে।
জুতা কারখানায় নিয়োজিত একাধিক দারোয়ান প্রতিবেদককে জানান, এখানে সরকারি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কারখানার সামনে ঝুলানো ব্যানার থেকে জানা যায় প্রকল্পটি এডিবির অর্থায়নে পরিচালিত। এসময় কথা হয় আশপাশের স্থানীয় একাধিক ব্যক্তিদের সাথে। তারা বলেন, এখানে মূলত বাইরের কাউকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না কারখানার ভিতরের যেসব শ্রমিক কর্মরত রয়েছে তাদেরকেই প্রশিক্ষণ করানো হয়। ( এডিবির অর্থায়নে যদি প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সেসব কর্মশালায় নিজের কর্মরত শ্রমিকদের দেখিয়ে ড. মতিউর রহমান অর্থ আত্মসাৎ করেছেন কিনা সে বিষয়ে আমার অনুসন্ধান চলমান)। গ্লোবাল সুজ ফ্যাক্টরির দারোয়ান, ইনচার্জ এবং স্থানীয় ব্যক্তিদের কথোপকথন প্রতিবেদকের নিকট সংরক্ষিত রয়েছে।
এছাড়াও দুদুকে জমা করা অভিযোগে উল্লেখিত গাজীপুর সাভার বিভিন্ন মৌজায় অসংখ্য জমির খতিয়ান উল্লেখ রয়েছে। ওই সমস্ত উল্লেখিত খতিয়ান ধরে সংশ্লিষ্ট ভূমি কার্যালয় থেকে পর্চা সংগ্রহ করে দেখা যায় সেখানে ডক্টর মতিউর রহমান ও তার স্ত্রী নামে অঢেঁল জমাজমি রয়েছে।
ড. মতিউর রহমান তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন এর আগেও দুদুকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়ে কেউ কেউ হয়রানি করেছে। এই বক্তব্যের জের ধরে প্রতিবেদক আগের তদন্ত রিপোর্ট ও অভিযোগ সংগ্রহের জন্য অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
বসুন্ধরা ডি ব্লকের একাধিক সূত্রে কথা বলে জানা গেছে, আই-ব্লকের চৌদ্দ তলা ভবন এবং ওই ভবনের কাজে নিয়োজিত ডেভলপার কোম্পানি সঙ্গে ড. মতিউর রহমানের যৌথ মালিকানা রয়েছে। এছাড়াও জেসিএক্স ডেভলপার লিমিটেড, গ্লোবাল সুজ সহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক কার্যালয় হিসেবে ঠিকানা উল্লেখ করা যেসিএক্স বিজনেস টাওয়ার, যেটি বসুন্ধরার আই-ব্লকে অবস্থিত ওই ভবনটির মালিকানায় মতিউর রহমানের মালিকানা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কিনা তা অনুসন্ধান শেষে জানানো যাবে।
ডঃ মতিউর রহমানের গ্রামের বাড়ি বরিশালে তার কি পরিমান সম্পত্তি রয়েছে সেটি নিয়েও সরজমিনে অনুসন্ধান চলমান।
এছাড়াও প্রতিবেদকের চলমান অনুসন্ধানে নাম প্রকাশ না করার স্বর্থে একাধিক সূত্র জানিয়েছেন মতিউর রহমান একজন বিএনপিপন্থী আমলা। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির আন্দোলনে অতি গোপনে ডোনেশন প্রদান করেন তিনি। কিন্তু নিজেকে অতি কৌশলে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সম্মিলিত সরজমিন প্রতিবেদন পরবর্তী পর্বে প্রকাশ করা হবে।
দুদকের অভিযোগের সূত্র ধরে এবং সরজমিনে পাওয়া সম্পদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে ড মতিউর রহমানের মুঠোফোন নাম্বারে ফোন করে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি একাধিক সিনিয়র সাংবাদিকের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে এবং বরিশাল বিভাগীয় ১৬০০ সরকারি কর্মকর্তাদের তিনি জেনারেল সেক্রেটারি বলে জানিয়েছেন। এসব বলে প্রতিবেদককে মৃদু সুরে ধমকের চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে মুঠোফোনের ক্ষুদেবার্তায় আমাকে বিভিন্ন মামলার ভয় দেখানো সহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে হয়রানি করার হুমকিও প্রদান করেন।
তার বক্তব্যে তিনি চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এর আগেও একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্যকে দিয়ে আমার সঙ্গে মিটমাট করার প্রচেষ্টা চালান। একাধিক সুত্রে তিনি ভয় ভীতি দেখিয়েছেন এবং শাসিয়ে বলেছেন, এসব প্রতিবেদন বন্ধ না করলে প্রতিবেদকের জীবনে যে কোন ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটতে পারে।
প্রতিবেদকের বিস্তর অনুসন্ধান চলমান রয়েছে…. যা পরবর্তী পর্বে প্রকাশ করা যাবে।
![]()


























