ঢাকা ০৫:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo গ্যাস সংকট আগের সরকারের পাপের ফল: ডা. জাহেদ Logo ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই-নির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চালু Logo প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যুবরাজ বিন সালমান Logo ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo সরকারের ১৮০ দিনের সালতামামি: ধ্বংসস্তূপ থেকে পরিকল্পিত পুনর্গঠনের পথে বাংলাদেশ Logo শিগগিরই জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করবে সরকার : নজরুল ইসলাম খান Logo রাষ্ট্র ও মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই সরকারের বড় সাফল্য:সালেহ শিবলী Logo শেখ হাসিনার কোন স্ট্যাটাসে ভারতে আছেন জানা নেই: চিফ প্রসিকিউটর Logo ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপনের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর Logo আগামীকাল কিশোরগঞ্জ সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী

কুড়িগ্রামে পল্লী চিকিৎসকদের চিকিৎসা প্রতারণা! 

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৪৯:৪০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ২৯৪ বার পড়া হয়েছে

জেলা প্রতিনিধি

কুড়িগ্রামে পল্লী চিকিৎসকরা নিজেদের ডাক্তার পরিচয় দিয়ে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে অনুমোদন ছাড়াই ফার্মেসির ব্যবসা করায় মোটা অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। অভিযোগ না থাকা আর আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অসহায় স্বাস্থ্য বিভাগ।

কুড়িগ্রাম জেলার ৯টি উপজেলার প্রায় ২৫ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এমবিবিএস চিকিৎসকের পাশাপাশি পল্লী চিকিৎসরাও চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্যই পল্লী চিকিৎসকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা দেন। পল্লী চিকিৎসক পরিচয়ে চিকিৎসা সেবা দেয়ার বিধান থাকলেও ডাক্তার পরিচয় তুলে ধরার নিয়ম নেই। কিন্তু জেলার সিংহভাগ পল্লী চিকিৎসক এই বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের প্রেসক্রিপশন প্যাডে নিজেদের ডাক্তার পরিচয় দিচ্ছেন।

এমনি এক প্রতারণা ফাঁদ পেতে বসেছেন উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গোড়াইহাট বাজারের পল্লী চিকিৎসক এমএ রাজ্জাক। তিনি ‘মানব সমাজ কল্যাণ সংস্থা (এমএসকেএস)’ নামে একটি সামাজিক সংগঠনের সাইনবোর্ড লাগিয়ে নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ রোগীদের চিকিৎসা করছেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে নিজেকে পারদর্শী ডাক্তার পরিচয় দিয়ে সকল প্রকার চিকিৎসা দেন। তিনি চিকিৎসার পাশাপাশি চেম্বারে যোগ করেছেন কম্পিউটার এনালাইসিস মেশিনের মাধ্যমে রোগ নির্ণয়ের প্রতারণার নতুন ফাঁদ।

কম্পিউটারের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করতে তিনি ভিজিট নেন ৫০০ টাকা। অথচ তার এ সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞান নেই। চিকিৎসার নামে গ্রামের দরিদ্র মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রতিদিন তিনি মোটা অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।

তার চেম্বারে সরেজমিনে দেখা যায়, একটি কক্ষে জরাজীর্ণ অবস্থায় বেশ কিছু মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধসহ রক্ত পরীক্ষার সেম্পল পড়ে রয়েছে।

এই এলাকার বাসিন্দা মজিবর, জব্বার, আজম ব্যাপারীসহ অনেকেই বলেন, প্রায় বছর দুয়েক থেকে রাজ্জাক ডাক্তার কম্পিউটার দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন। ভিজিট নেন ৫০০ টাকা।

তারা বলেন, ‘কম্পিউটারে কি কি করে হামরা তো বুঝি না। ডাক্তার যা কও তাই বুঝি। কিন্তু টাকাই খরচ হয় ভালো আর হয় না। ওই ফির ঘুরিয়া হাসপাতালের ডাক্তার দেখার জন্য যাওয়া লাগে। হামার গ্রামের মানুষ কাই ডাক্তার আর কাই ডাক্তার নুয়ায় সেটা কেমনে বুঝি। কোনো অফিসার বা আইনের লোকজন কোনোদিন এগলা জায়গাত আসে নাই। হামার গ্রামের মানুষের কথা কাই চিন্তা করে বাহে। সবাই সবারটা নিয়া আছে।’

পল্লী চিকিৎসক এমএ রাজ্জাকের কাছে কম্পিউটারের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দেবার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন নিয়ম নেই। তবে ব্যবসা করার জন্যই এমনটা করছেন। তবে মানুষের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, একই ইউনিয়নের যমুনা চৌমোহনী বাজারের অনুমোদনহীন কাসেম ফার্মেসীতে বসেন পল্লী চিকিৎসক শহীদুল ইসলাম। দীর্ঘদিন যাবত তিনি নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। কেন ডাক্তার পরিচয় দেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি প্যাডে ডাক্তার লিখিনি। এটা কোম্পানির পক্ষ থেকে লিখে দিয়েছে।

ফার্মেসির অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, লাইসেন্স করব। আসলে প্রশাসনের তেমন নজরদারি না থাকায় করা হয় না। শুধু আমি না অনেকেই এমন রয়েছেন।

এছাড়াও বুড়াবুড়ি বাজারে পল্লী চিকিৎসক মাইদুল ইসলাম নিজের ডাক্তার পদবি সম্বলিত প্রেসক্রিপশন প্যাডে পরিচয় তুলে ধরেছেন। ভুয়া পরিচয়ের পাশাপাশি সরকারের অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে তিনিও ফার্মেসি দিয়ে দিব্বি চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এই পল্লী চিকিৎসক বলেন, ডাক্তার পরিচয় তুলে ধরার নিয়ম নেই। কিন্তু আমরা নিজেদের ডিমান্ড বাড়ানোর জন্য করে থাকি।

এই বিষয়ে একাধিক ওষধ কোম্পানির ম্যানেজারসহ অনেক প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পল্লী চিকিৎসকদের জন্য টাকাসহ বিভিন্ন ধরনের গিফট দেয়া হয়। এজন্যই তারা এন্টিবায়োটিক ওষুধও লিখে দেন রোগীদের। আর এই গিফট দিয়ে ওষুধ লেখার জন্য এক ধরনের প্রতিযোগিতা কাজ করে মার্কেটে।

কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, লিখিত অভিযোগ ছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে কোনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব নয়। প্রশাসনের পক্ষ হতে মোবাইল কোর্ট করার বিধান থাকলেও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে তা নেই। মোবাইল কোর্টে আমাদের প্রতিনিধি থাকে। ফলে প্রশাসনের সঙ্গে স্বমন্বয় করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে গিয়ে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় মৌখিক অভিযোগ পেলেও কিছুই করার থাকে না বলে তিনি জানান।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
error: Content is protected !!

কুড়িগ্রামে পল্লী চিকিৎসকদের চিকিৎসা প্রতারণা! 

আপডেট সময় : ১০:৪৯:৪০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯

জেলা প্রতিনিধি

কুড়িগ্রামে পল্লী চিকিৎসকরা নিজেদের ডাক্তার পরিচয় দিয়ে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে অনুমোদন ছাড়াই ফার্মেসির ব্যবসা করায় মোটা অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। অভিযোগ না থাকা আর আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অসহায় স্বাস্থ্য বিভাগ।

কুড়িগ্রাম জেলার ৯টি উপজেলার প্রায় ২৫ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এমবিবিএস চিকিৎসকের পাশাপাশি পল্লী চিকিৎসরাও চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্যই পল্লী চিকিৎসকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে চিকিৎসা দেন। পল্লী চিকিৎসক পরিচয়ে চিকিৎসা সেবা দেয়ার বিধান থাকলেও ডাক্তার পরিচয় তুলে ধরার নিয়ম নেই। কিন্তু জেলার সিংহভাগ পল্লী চিকিৎসক এই বিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের প্রেসক্রিপশন প্যাডে নিজেদের ডাক্তার পরিচয় দিচ্ছেন।

এমনি এক প্রতারণা ফাঁদ পেতে বসেছেন উলিপুর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গোড়াইহাট বাজারের পল্লী চিকিৎসক এমএ রাজ্জাক। তিনি ‘মানব সমাজ কল্যাণ সংস্থা (এমএসকেএস)’ নামে একটি সামাজিক সংগঠনের সাইনবোর্ড লাগিয়ে নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ রোগীদের চিকিৎসা করছেন। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে নিজেকে পারদর্শী ডাক্তার পরিচয় দিয়ে সকল প্রকার চিকিৎসা দেন। তিনি চিকিৎসার পাশাপাশি চেম্বারে যোগ করেছেন কম্পিউটার এনালাইসিস মেশিনের মাধ্যমে রোগ নির্ণয়ের প্রতারণার নতুন ফাঁদ।

কম্পিউটারের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করতে তিনি ভিজিট নেন ৫০০ টাকা। অথচ তার এ সম্পর্কে তার কোনো জ্ঞান নেই। চিকিৎসার নামে গ্রামের দরিদ্র মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রতিদিন তিনি মোটা অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন।

তার চেম্বারে সরেজমিনে দেখা যায়, একটি কক্ষে জরাজীর্ণ অবস্থায় বেশ কিছু মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধসহ রক্ত পরীক্ষার সেম্পল পড়ে রয়েছে।

এই এলাকার বাসিন্দা মজিবর, জব্বার, আজম ব্যাপারীসহ অনেকেই বলেন, প্রায় বছর দুয়েক থেকে রাজ্জাক ডাক্তার কম্পিউটার দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে থাকেন। ভিজিট নেন ৫০০ টাকা।

তারা বলেন, ‘কম্পিউটারে কি কি করে হামরা তো বুঝি না। ডাক্তার যা কও তাই বুঝি। কিন্তু টাকাই খরচ হয় ভালো আর হয় না। ওই ফির ঘুরিয়া হাসপাতালের ডাক্তার দেখার জন্য যাওয়া লাগে। হামার গ্রামের মানুষ কাই ডাক্তার আর কাই ডাক্তার নুয়ায় সেটা কেমনে বুঝি। কোনো অফিসার বা আইনের লোকজন কোনোদিন এগলা জায়গাত আসে নাই। হামার গ্রামের মানুষের কথা কাই চিন্তা করে বাহে। সবাই সবারটা নিয়া আছে।’

পল্লী চিকিৎসক এমএ রাজ্জাকের কাছে কম্পিউটারের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দেবার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন নিয়ম নেই। তবে ব্যবসা করার জন্যই এমনটা করছেন। তবে মানুষের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।

সরেজমিনে আরও দেখা যায়, একই ইউনিয়নের যমুনা চৌমোহনী বাজারের অনুমোদনহীন কাসেম ফার্মেসীতে বসেন পল্লী চিকিৎসক শহীদুল ইসলাম। দীর্ঘদিন যাবত তিনি নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। কেন ডাক্তার পরিচয় দেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি প্যাডে ডাক্তার লিখিনি। এটা কোম্পানির পক্ষ থেকে লিখে দিয়েছে।

ফার্মেসির অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, লাইসেন্স করব। আসলে প্রশাসনের তেমন নজরদারি না থাকায় করা হয় না। শুধু আমি না অনেকেই এমন রয়েছেন।

এছাড়াও বুড়াবুড়ি বাজারে পল্লী চিকিৎসক মাইদুল ইসলাম নিজের ডাক্তার পদবি সম্বলিত প্রেসক্রিপশন প্যাডে পরিচয় তুলে ধরেছেন। ভুয়া পরিচয়ের পাশাপাশি সরকারের অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে তিনিও ফার্মেসি দিয়ে দিব্বি চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এই পল্লী চিকিৎসক বলেন, ডাক্তার পরিচয় তুলে ধরার নিয়ম নেই। কিন্তু আমরা নিজেদের ডিমান্ড বাড়ানোর জন্য করে থাকি।

এই বিষয়ে একাধিক ওষধ কোম্পানির ম্যানেজারসহ অনেক প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পল্লী চিকিৎসকদের জন্য টাকাসহ বিভিন্ন ধরনের গিফট দেয়া হয়। এজন্যই তারা এন্টিবায়োটিক ওষুধও লিখে দেন রোগীদের। আর এই গিফট দিয়ে ওষুধ লেখার জন্য এক ধরনের প্রতিযোগিতা কাজ করে মার্কেটে।

কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, লিখিত অভিযোগ ছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে কোনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব নয়। প্রশাসনের পক্ষ হতে মোবাইল কোর্ট করার বিধান থাকলেও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে তা নেই। মোবাইল কোর্টে আমাদের প্রতিনিধি থাকে। ফলে প্রশাসনের সঙ্গে স্বমন্বয় করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে গিয়ে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় মৌখিক অভিযোগ পেলেও কিছুই করার থাকে না বলে তিনি জানান।