• ১৩ই এপ্রিল ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৩০শে চৈত্র ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ আগুন : নিহত ১৯ আহত ৭৩ নিখোঁজ ২০

সকালের সংবাদ ডেস্ক;
প্রকাশিত মার্চ ২৯, ২০১৯, ০৯:৫৮ পূর্বাহ্ণ
বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ আগুন : নিহত ১৯ আহত ৭৩ নিখোঁজ ২০

কত অশ্রুজলে থামবে এমন মৃত্যু
ফায়ার সার্ভিস, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর ছয় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে * জীবন বাঁচাতে লাফিয়ে ও তার বেয়ে নামতে গিয়ে নিহত ও আহত হন অনেকে * আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে * ৪টি তদন্ত কমিটি গঠন * ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না, চাপাসিঁড়ি

 

রাজধানীতে ফের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে বনানীর ১৭ নম্বর রোডে ২২ তলা এফআর টাওয়ারের নবম তলায় এ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত। রাত ১টা ৩০ মিনিটে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শ্রীলংকার এক নাগরিকসহ ১৯ জন নিহত এবং ৭৩ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে আশঙ্কা করেন সংশ্লিষ্টরা। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। প্রায় ২০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট কাজ করে।

এদের সঙ্গে যোগ দেন সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর সদস্যরা। এলাকার সাধারণ মানুষও উদ্ধার কাজে অংশ নেন। উদ্ধার কাজে অংশ নেয় ৫টি হেলিকপ্টার। বালি-পানি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা চালানো হয়। হেলিকপ্টারগুলো বাতাস দিয়ে ধোঁয়া সরানোর চেষ্টা করে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ৬ ঘণ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।

সন্ধ্যায় একাংশের আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিস কর্মী ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ভবনের বিভিন্ন ফ্লোরে প্রবেশ করেন। সেখানে আহত ও নিহতদের উদ্ধার করে নিচে নামিয়ে আনেন।

এদের অনেকেই দগ্ধ হয়েছেন। ধোঁয়ার কারণে অজ্ঞান হয়েও মারা গেছেন কেউ কেউ। আবার জীবিতও অনেককে উদ্ধার করা হয়। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর একেএম শাকিল নেওয়াজ রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে যুগান্তরকে বলেন, বনানী এফআর টাওয়ারের আগুনে ১৯ জন মারা গেছেন।

এদের মধ্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ৭ এবং ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনজনের মৃতদেহ রয়েছে। তবে রাত ১১টার পর ফায়ার সার্ভিসের ঘোষণার পর মৃতের সংখ্যা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।

রাত সোয়া ৯টা পর্যন্ত বলা হয় ১৯ জন মারা গেছেন। কিন্তু হঠাৎ ১১টা ১০ মিনিটে ঘোষণা দেয়া হয় মৃতের সংখ্যা ২৫। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা কথা বলতে গেলে তারা দ্রুত মৃতের সংখ্যা গণনা শেষে ফের ঘোষণা দেন মৃত ১৯।

২৫ না ১৯ আসলে মৃত কত। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে চাইলে সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা খুরশেদ আনোয়ার যুগান্তরকে বলেন, কুর্মিটোলায় মৃত ৬ জনকে ঢাকা মেডিকেলের মৃতদেহের সঙ্গে যোগ দেয়া হয়েছে।

এটা দু’বার হওয়ায় সংখ্যা ২৫-এ দাঁড়িয়েছে। যা সঠিক নয়। পরে সব হাসপাতালের তথ্য হালনাগাদ করে দেখেছি আসলে ১৯ জনই মারা গেছেন। আজ সকাল ১০টা পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা ভবনটিতে উদ্ধার অভিযান চালাবেন।

এরপর পুলিশের কাছে এফআর টাওয়ার হস্তান্তর করা হবে। ২০ ফেব্রুয়ারি চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের ৩৬ দিনের মাথায় বনানীর এফআর টাওয়ারে অগুন লাগে। চুড়িহাট্টায় মৃতের সংখ্যা ছিল ৭১।

এর আগে পুরান ঢাকার নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডে ১১৯ জনের মৃত্যু হয়। এবার বনানীর এফআর টাওয়ারে মৃত ১৯। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় প্রতিদিনই অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে।

এদিকে বৃহস্পতিবারও সড়ক দুর্ঘটনায় ২২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই সড়কে ঝরছে প্রাণ। লম্বা হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। এভাবে মৃত্যুর মিছিল কবে নাগাদ থামবে সেটাই এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন কুর্মিটোলা হাসপাতালে আহতদের দেখতে এসে সাংবাদিকদের বলেন, আগুনে যারা আহত হয়েছেন তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হবে। সব মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে। সেখান থেকেই হস্তান্তর করা হবে মরদেহ।

ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য আকবর হোসেন পাঠান বলেন, আমি ভবনের মালিককে ডাকব। তাদের কাছে ভবনের কাগজপত্র চাইব। কিভাবে তারা হাইরাইজ বিল্ডিং নির্মাণ করেছে।

একটা ভবনের সঙ্গে অন্য ভবন লাগানো। এ অনিয়ম সহ্য করা হবে না। আগুন লাগার পর থেকেই বনানী এফআর টাওয়ারের সামনে ভবনে আটকে পড়াদের উদ্বেগাকুল স্বজনদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

উপর থেকে কাউকে নামিয়ে আনার পরপরই তাকে দেখার জন্য অন্যদের সঙ্গে স্বজনরাও এগিয়ে গেছেন। বিশেষ করে রাতে হাসপাতালে স্বজনদের আহাজারি পরিবেশ আরও ভারি করে তোলে।

এ ঘটনায় যারা বেঁচে গেছেন তারা মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। এ যন্ত্রণা তারা সহজে ভুলতে পারবেন না। আরও অনেক দিন তাদের তাড়িয়ে বেড়াবে এ দুঃসহ স্মৃতি। এদিকে নিহত শ্রীলংকান নাগরিকের পরিবারের সদস্য তার মরদেহ নিতে রাতেই ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।

আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, এফআর টাওয়ারের আগুন এবং বিল্ডিং কোড মেনে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল কিনা তা তদন্ত করে দেখা হবে। যদি কারও গাফলতি পাওয়া যায় তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসের মধ্য দুপুরে এফআর টাওয়ারের সবাই ব্যস্ত ছিলেন যার যার কাজে। দুপুর পৌনে ১টায় হঠাৎ ভবনের নয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। তবে কিভাবে আগুন লেগেছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, শর্ট-সার্কিট থেকেই আগুনের সূত্রপাত।

তবে আগুনের ভয়াবহতা এতটা হবে, তা বুঝতে পারেননি ভবনে আটকে পড়া বা আশপাশের লোকজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে উৎকণ্ঠা। একপর্যায়ে আগুন আরও কয়েকটি ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় পুরো ভবন। অগ্নিকাণ্ডের পর এফআরসহ আশপাশের ভবনগুলোর বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর সার্বিক বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভয়াবহ এ ঘটনায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী গভীর শোক প্রকাশ করেন। এছাড়া জাতীয় পার্টি, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও এ ঘটনায় গভীর শোক জানান।

ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস ও রাজউক পাঁচ সদস্যের আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এছাড়া গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে। রাত সাড়ে ৯টায় ঘটনা সম্পর্কে ব্রিফ করেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন।

আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর রাতে ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক দিলীপ কুমার ঘোষ জানান, একটি বাণিজ্যিক বহুতল ভবনে যে পরিমাণ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, তা সেখানে ছিল না।

তবে দু-একটা ফ্লোরে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল। তিনি বলেন, অনেকে অনেক কিছুই বলার চেষ্টা করেছে, তবে আমরা বিশ্বমানের সেবার ব্যবস্থা করেছি। ফায়ার সার্ভিস আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করায় ৪টি ফ্লোরের বাইরে আগুন ছড়াতে পারেনি।

এমনকি এফআর টাওয়ারের লাগোয়া ভবনগুলোতেও আগুন ছড়ায়নি। ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মী জানান, ভবনটির ভেতরের সিঁড়িগুলো ছিল খুবই সরু। ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় আটকে পড়া অনেকেই সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারেননি।

২২ তলা ভবনের সিঁড়ি মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট চওড়া। উদ্ধার কাজে উদ্ধার নেয়া এক যুবক বলেন, টাওয়ারের বেশির ভাগ ইমার্জেন্সি এক্সিট গেট বন্ধ ছিল। এ জন্য মৃত্যুর সংখ্যা এত বেড়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আহতদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে নেয়া হয়। অগ্নিকাণ্ডের পর প্রতিটি সরকারি হাসপাতাল থেকে ঘটনাস্থলে অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হয়।

তৈরি রাখা হয় জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাও। সব হাসপাতালে আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। ভবনের কাজে থাকা মানুষগুলোর আত্মীয়স্বজন ও উদ্ধার হওয়া আহতদের আত্মীয়স্বজন বিভিন্ন হাসপাতালে ভিড় করতে থাকেন। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে খোঁজখবর নেন তারা।

অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, স্থানীয় সংসদ সদস্য আকবর হোসেন পাঠান ফারুক, ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিঞাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

তারা উপস্থিত থেকে উদ্ধার কাজ ও আহতদের চিকিৎসার ব্যাপারে তদারকি করেন। উদ্ধার কাজে অন্যদের সঙ্গে রেড ক্রিসেন্টের ৪০ সদস্যের স্বেচ্ছাসেবকের একটি দলও অংশ নেয়।

এদিকে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের দেখতে যান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। প্রত্যক্ষদর্শী রায়ান খান বলেন, আমরা তিন-চারজন নিচে দাঁড়িয়ে নাস্তা করছিলাম।

ভবনটির নবম তলা থেকে হঠাৎ কালো ধোঁয়া বের হতে দেখি। অনেককে জীবন বাঁচাতে ভবন থেকে লাফিয়ে নিচে পড়তেও দেখি। তখনই আমি ৯৯৯-এ ফোন দেই। পাশাপাশি আরও ২-৩ জন ফায়ার সার্ভিসে ফোন দিয়েছেন।

কয়েক মিনিটের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট সেখানে উপস্থিত হয়। এর মধ্যে ল্যাডার ইউনিট (বহুতল ভবন থেকে উদ্ধারকারী সিঁড়ি) ও মোটরসাইকেল ইউনিট ছিল। ভবনে অসংখ্য লোক আটকা পড়েন। ভবনের কাচ ভেঙে আটকে পড়া লোকজন আগুনের বিভীষিকা থেকে বাঁচতে আকুতি জানান। হাত নেড়ে, কাপড় নেড়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।

কেউ তার স্বজনকে ফোন করে জানান দিচ্ছেন তাদের অবস্থান। কেউ আবার নেটওয়ার্কের কারণে ফোন করতে পারছিলেন না পরিবারকে। অনেকে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েও বাঁচার আকুতি জানান। রশি ও তার বেয়ে অনেকেই নিচে নামার চেষ্টা করেন। এভাবে নামতে গিয়ে অনেকেই আহত হয়েছেন। তার ছিঁড়ে পড়ে নিহত হন একাধিক ব্যক্তি। অনেকে বাঁচতে চেয়ে বিভিন্ন ফ্লোর থেকে জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে নিচে নামেন।

এদের মধ্যে কয়েকজন মারা যান। বাকিরা গুরুতর আহত হন। এছাড়া আগুন ও প্রচণ্ড ধোঁয়ায় ঝুঁকিতে পড়েন আশপাশের ভবনগুলোর মানুষও। দ্রুত তাদের সরিয়ে নেয়া হয়। পাশের ভবনে থাকা বেসরকারি টিভি দুরন্ত ও রেডিও টুডের সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়।

প্রাণভয়ে কয়েকজন ছাদে ওঠেন। বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার ছাদ থেকে কয়েকজনকে উদ্ধার করে। ভবনটির বিভিন্ন তলায় আটকা পড়া মানুষ ধোঁয়ার কবলে পড়ে বাঁচার জন্য চিৎকার শুরু করেন।

জানালা দিয়ে হাত নেড়ে বাঁচার আকুতি জানান অনেকে। অনেকে কাপড় দিয়ে পতাকা বানিয়ে নিজেদের অবস্থান জানান দেন। অনেকে চিৎকার করে বলতে থাকেন- বিকল্প সিঁড়ি পাঠান।

ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা তাদের সাহস জোগান। আটকা পড়াদের ওপর থেকে লাফ দিতে নানাভাবে নিষেধ করেন তারা। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আটকে পড়াদের কাছে ভেজা কাপড় ও পানির বোতল ছুড়ে মারেন।

জানালা দিয়ে যারা হাত নাড়াচ্ছিলেন তাদের পানি দিয়ে ভিজিয়ে দেয়া হয়। সুউচ্চ যান্ত্রিক মই দিয়ে তাদের পর্যায়ক্রমে নিচে নামিয়ে আনা হয়।

তবে পানি স্বল্পতার কারণে ফায়ার সার্ভিসের কাজে খুব সমস্যা হয়। বারবার তাদের পানি ফুরিয়ে যাচ্ছিল। আটকে পড়াদের বাঁচাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। তাদের নিরলস প্রচেষ্টায় অধিকাংশকেই জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। ফায়ার সার্ভিসের অনেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কয়েকজনকে।

এক ফায়ার সার্ভিস কর্মী জানান, পানি স্বল্পতার পাশাপাশি ওই ভবনের বেশিরভাগ তলায় রয়েছে বিভিন্ন অফিস, যেগুলো ডেকোরেট বা সজ্জার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে সিনথেটিক ফাইবার।

এ সিনথেটিক ফাইবারে আগুন ধরে গিয়ে প্রচুর ধোঁয়া হয়েছে। আর এ ধোঁয়ার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে সময় বেশি লেগেছে।

উদ্ধার হওয়া অনেকেই অভিযোগ করেন, ভবনে আগুন লাগার পর অনেকেই সিঁড়ি দিয়ে ছাদে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ছাদের গেট বন্ধ থাকায় উপরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ছাদে যেতে পারলে অনেক প্রাণ বেঁচে যেত।

আগুনের তীব্রতা এতটা ভয়াবহ ছিল যে ভবনের গ্লাস খসে পড়ছিল বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। তারা বলেন, ধোঁয়ায় অনেকের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে অনেকে মারা যান।

ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে আত্মীয়স্বজনসহ হাজার হাজার মানুষ সেখানে জড়ো হতে থাকেন। নিরাপত্তার স্বার্থে বনানীর প্রায় সব সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে উৎসুক জনতার কারণে উদ্ধার কাজে বিঘ্ন ঘটে।

দুপুর ২টার পর বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ২২ তলা ওই ভবনসহ আশপাশের এলাকায় চক্কর দিতে দেখা যায় হেলিকপ্টারটিকে। বেলা ৩টা ৪৮ মিনিটে ভবনের ছাদ থেকে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার কাজ করা হয়।

এর আগে কিছুক্ষণ হেলিকপ্টারটি ওই এলাকা রেকি করে। পরে ছাদের ওপর শূন্যে অবস্থান করে একটি দড়ি ফেলে। সেই দড়ি বেয়েই আটকে পড়া একজন হেলিকপ্টারে ওঠেন। পরে আরও কয়েকজনকে উদ্ধার করা হয়।

আটকে পড়াদের উদ্ধারে দুটি স্কাই লিফট ব্যবহার করা হয়। একেকটি লিফটে ১০-১২ জনকে উদ্ধার করে ভবনটির নিচে নামিয়ে আনা হয়। লিফট দুটি ব্যবহার করে ভবনটি থেকে শতাধিক ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধারের পর আহতদের দ্রুত বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভবনের ওপর থেকে কাগজপত্র উড়ে নিচে ছড়িয়ে পড়ে। বাতাসে ধোঁয়া আর পোড়া গন্ধে নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসে। জানা গেছে, ভবনটিতে দ্য ওয়েভ গ্রুপ, হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস, আমরা টেকনোলজিস লিমিটেড ছাড়াও অর্ধশতাধিক অফিস রয়েছে।