ভালুকা শিল্পাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগে বিতর্কের কেন্দ্রে এমপি ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু; ব্যবসায়ীদের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
- আপডেট সময় : ০৪:০৮:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬ ১৯৪ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক|
ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্পাঞ্চলে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ঝুট বাণিজ্য, পরিবহন খাত ও শিল্পসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, নির্বাচনের পর থেকে শিল্পাঞ্চলে এক ধরনের অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা বিনিয়োগ পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনের সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, কেউ তার নাম ব্যবহার করে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি বা অপকর্ম করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ভালুকা শিল্পাঞ্চলে ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। বিশেষ করে ঝুট ব্যবসা, পণ্যবাহী ট্রাক পরিবহন, হাট-বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি জমি দখলকে কেন্দ্র করে একাধিক অভিযোগ সামনে আসে।
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত তার বিভিন্ন ব্যবসা নির্বাচনের পর একের পর এক বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তার দাবি, কারখানা থেকে পণ্য বের হতে দেওয়া হচ্ছে না, ব্যবসা দখলের চেষ্টা চলছে এবং রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে মামলা দেওয়া হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শিল্পাঞ্চলে পণ্য পরিবহনের সময় বিভিন্নভাবে চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কারখানার গেটে গিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি, কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং উৎপাদন কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। অনেক উদ্যোক্তা উৎপাদন সচল রাখতে বাধ্য হয়ে অর্থ পরিশোধ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গণমাধ্যমকে বলেন, পোশাক কারখানার উৎপাদনজনিত বর্জ্য (ওয়েস্টেজ) সংগ্রহকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পক্ষের চাপ সৃষ্টি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে জমি-সংক্রান্ত বিষয়েও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ জাহিদুল ইসলামও গণমাধ্যমে স্বীকার করেছেন যে, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। এসব ঘটনায় একাধিক মামলা হয়েছে এবং পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।
এদিকে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন মিল-কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হুমকি দেওয়া এবং লোকজন পাঠিয়ে পেশিশক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে স্বার্থ হাসিলের অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। ওই সময় তার বিরুদ্ধে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে মামলাও দায়ের করা হয়েছিল বলে দলীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৪ অক্টোবর বিএনপি তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে এবং তাকে ধানের শীষ প্রতীকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়।
এছাড়া স্থানীয় কয়েকজন নেতাকর্মীর অভিযোগ, ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভাওয়াল কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী হিসেবে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে সখ্য বজায় রেখে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের আনুমানিক পাঁচ হাজার কোটি টাকার কার্যাদেশ পেয়েছিলেন। তবে এ অভিযোগের স্বপক্ষে কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালতের রায় প্রকাশ্যে আসেনি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু গণমাধ্যমকে বলেছেন, “কেউ যদি আমার নাম ভাঙিয়ে কোনো ধরনের অপকর্ম বা চাঁদাবাজি করার চেষ্টা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে কোনো ধরনের প্রভাব খাটানোর অনুমতি আমি দিইনি।”
স্থানীয় সচেতন মহল ও ব্যবসায়ীদের দাবি, দেশের অন্যতম বৃহৎ এই শিল্পাঞ্চলে চলমান সংঘাত কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেই প্রভাবিত করছে না, বরং বিনিয়োগ পরিবেশকেও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তাদের দাবি, বিষয়টি নিয়ে একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই সাপেক্ষে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
(প্রতিবেদনটি বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগ, প্রকাশিত সংবাদ এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকাশ্য বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।)

























