ঢাকা ১০:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo দৈনিক ‘প্রতিদিনের কাগজ’ প্রকাশনা নিয়ে আইনি জটিলতা: হাইকোর্টের রুল: মালিকানা ও সম্পাদনায় বিতর্ক Logo প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে আউটসোর্সিং নিয়োগ ঘিরে ২৫ কোটি টাকার বাণিজ্যের পরিকল্পনা! Logo মৎস্য অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের পাহাড় Logo ডিএনসিসির প্রকৌশলী আহসান হাবিবের বিরুদ্ধে টেন্ডার অনিয়ম ও ঠিকাদার হয়রানির অভিযোগ Logo অভিযোগের পাহাড় পেরিয়েও বহাল তবিয়তে ফায়ার সার্ভিসের ডিজি Logo সওজে পরিচালক ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আজাদ সিন্ডিকেটের দূর্নীতির সাম্রাজ্য Logo ঠিকাদারের মুখোশে ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে চাকরির প্রলোভনে কোটি টাকা লুটের অভিযোগ Logo জাতীয় প্রেসক্লাবে জিয়া শিশু কিশোর মেলার সাধারণ সভা ও ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত Logo গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে: সালাম Logo হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক সাবেক কাস্টমস কমিশনার নুরুজ্জামান!

সওজে পরিচালক ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আজাদ সিন্ডিকেটের দূর্নীতির সাম্রাজ্য

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১১:৪৬:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬ ৮৮ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) দেশের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান রাষ্ট্রীয় সংস্থা। তবে সংস্থাটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক বলয় সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই বলয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান। তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ.কে.এম আজাদ রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে রাজধানীর বারিধারা ও পূর্বাচল এলাকায় একাধিক জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া টাঙ্গাইলের নিজ গ্রামেও তার বিপুল পরিমাণ জমি ও স্থাপনা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব সম্পদের বিপরীতে আয়ের স্বচ্ছ কোনো ব্যাখ্যা বা ঘোষণাপত্র পাওয়া যায়নি।

২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রেক্ষাপটে তিনি তৎকালীন ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হন। প্রশাসনিক সূত্র জানায়, পরবর্তীতে তিনি পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পান। সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে দীর্ঘদিন প্রশাসনিক নিরাপত্তা বলয়ে ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতির অভিযোগে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর বিধি ৩ (বি) ও ৩ (ডি) অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নম্বর ০২/২০১২ রুজু করা হয়। তবে মামলা চলাকালে তিনি হাইকোর্টে রিট পিটিশন নম্বর ৮১৬/২০১২ দায়ের করলে আদালত প্রাথমিকভাবে তিন মাসের জন্য কার্যক্রম স্থগিত করেন। পরে স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সরকার বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যায় এবং পূর্ণাঙ্গ শুনানির পর রিট নিষ্পত্তি হয়।

তৎকালীন সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনে হাজির হয়ে তিনি জয়দেবপুর থেকে দেবগ্রাম-ভুলতা-নয়াপুর বাজার হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মদনপুর পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণ (সংশোধিত) প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে অতিরিক্ত বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক ক্ষতির বিষয় স্বীকার করেন। দুইটি গ্রুপের কাজে ২১ লাখ ১০ হাজার ৪৩৮ টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধের কথা উল্লেখ করে তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ২ লাখ টাকা জমা দেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

পরবর্তীতে দুর্নীতি না করার অঙ্গীকার থাকলেও তাকে ঘিরে বদলি-বাণিজ্য, পছন্দের পোস্টিং এবং প্রকল্প নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া, ঠিকাদার নির্বাচন ও প্রকল্প অনুমোদনে প্রভাব বিস্তারের কথাও বলছেন একাধিক কর্মকর্তা। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে প্রকৌশলী নুরু ইসলামের নামও উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প অনুমোদন ও টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

এছাড়া ৫ আগস্টের পর অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তার বিদেশ সফরের অনুমোদন দেওয়া হয়। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও যুক্তরাজ্যে এসব সফরের অধিকাংশই উন্নয়নমূলক না হয়ে ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি। সফর অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় এ.কে.এম আজাদ রহমানের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক সংস্কারের আলোচনা শুরু হলেও সওজে তার দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সাম্প্রতিক বদলিতে এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে এ.কে.এম আজাদ রহমানকে ঢাকা জোনে পদায়ন করা হয়। এতে সংস্কারের বদলে পুনর্বাসনের ইঙ্গিত রয়েছে বলে অভিমত দিয়েছেন সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা।

ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঠিকাদার সংকটের অজুহাত তুলে অনেক সময় সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে বিলম্ব করা হয়। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অচল হয়ে পড়ে, জনদুর্ভোগ বাড়ে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। এর ফলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলেও সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী কর্মকর্তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখেন।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক যোগাযোগের সমন্বয়ে একটি শক্ত বলয় গড়ে উঠেছে, যা ভাঙা না গেলে টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়। সওজে দীর্ঘদিনের এ প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক এখন সরকারের শুদ্ধি অভিযানের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

 

বিষয়টির আরও অনুসন্ধান চলছে। বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী পর্বে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
error: Content is protected !!

সওজে পরিচালক ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আজাদ সিন্ডিকেটের দূর্নীতির সাম্রাজ্য

আপডেট সময় : ১১:৪৬:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক: সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) দেশের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান রাষ্ট্রীয় সংস্থা। তবে সংস্থাটির ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী প্রশাসনিক বলয় সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই বলয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান। তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি এবং অবৈধ সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ.কে.এম আজাদ রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে রাজধানীর বারিধারা ও পূর্বাচল এলাকায় একাধিক জমি ও ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া টাঙ্গাইলের নিজ গ্রামেও তার বিপুল পরিমাণ জমি ও স্থাপনা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব সম্পদের বিপরীতে আয়ের স্বচ্ছ কোনো ব্যাখ্যা বা ঘোষণাপত্র পাওয়া যায়নি।

২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রেক্ষাপটে তিনি তৎকালীন ট্রুথ কমিশনের মুখোমুখি হন। প্রশাসনিক সূত্র জানায়, পরবর্তীতে তিনি পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পান। সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে দীর্ঘদিন প্রশাসনিক নিরাপত্তা বলয়ে ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতির অভিযোগে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫-এর বিধি ৩ (বি) ও ৩ (ডি) অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা নম্বর ০২/২০১২ রুজু করা হয়। তবে মামলা চলাকালে তিনি হাইকোর্টে রিট পিটিশন নম্বর ৮১৬/২০১২ দায়ের করলে আদালত প্রাথমিকভাবে তিন মাসের জন্য কার্যক্রম স্থগিত করেন। পরে স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হয়। সরকার বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে যায় এবং পূর্ণাঙ্গ শুনানির পর রিট নিষ্পত্তি হয়।

তৎকালীন সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনে হাজির হয়ে তিনি জয়দেবপুর থেকে দেবগ্রাম-ভুলতা-নয়াপুর বাজার হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মদনপুর পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণ (সংশোধিত) প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে অতিরিক্ত বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক ক্ষতির বিষয় স্বীকার করেন। দুইটি গ্রুপের কাজে ২১ লাখ ১০ হাজার ৪৩৮ টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধের কথা উল্লেখ করে তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ২ লাখ টাকা জমা দেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

পরবর্তীতে দুর্নীতি না করার অঙ্গীকার থাকলেও তাকে ঘিরে বদলি-বাণিজ্য, পছন্দের পোস্টিং এবং প্রকল্প নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া, ঠিকাদার নির্বাচন ও প্রকল্প অনুমোদনে প্রভাব বিস্তারের কথাও বলছেন একাধিক কর্মকর্তা। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে প্রকৌশলী নুরু ইসলামের নামও উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প অনুমোদন ও টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

এছাড়া ৫ আগস্টের পর অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তার বিদেশ সফরের অনুমোদন দেওয়া হয়। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই ও যুক্তরাজ্যে এসব সফরের অধিকাংশই উন্নয়নমূলক না হয়ে ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি। সফর অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় এ.কে.এম আজাদ রহমানের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক সংস্কারের আলোচনা শুরু হলেও সওজে তার দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সাম্প্রতিক বদলিতে এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে এ.কে.এম আজাদ রহমানকে ঢাকা জোনে পদায়ন করা হয়। এতে সংস্কারের বদলে পুনর্বাসনের ইঙ্গিত রয়েছে বলে অভিমত দিয়েছেন সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা।

ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঠিকাদার সংকটের অজুহাত তুলে অনেক সময় সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে বিলম্ব করা হয়। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অচল হয়ে পড়ে, জনদুর্ভোগ বাড়ে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। এর ফলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হলেও সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী কর্মকর্তারা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখেন।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনিক সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক যোগাযোগের সমন্বয়ে একটি শক্ত বলয় গড়ে উঠেছে, যা ভাঙা না গেলে টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়। সওজে দীর্ঘদিনের এ প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক এখন সরকারের শুদ্ধি অভিযানের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

 

বিষয়টির আরও অনুসন্ধান চলছে। বিস্তারিত থাকছে পরবর্তী পর্বে।