ঢাকা ০৫:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo গ্যাস সংকট আগের সরকারের পাপের ফল: ডা. জাহেদ Logo ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই-নির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চালু Logo প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যুবরাজ বিন সালমান Logo ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo সরকারের ১৮০ দিনের সালতামামি: ধ্বংসস্তূপ থেকে পরিকল্পিত পুনর্গঠনের পথে বাংলাদেশ Logo শিগগিরই জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করবে সরকার : নজরুল ইসলাম খান Logo রাষ্ট্র ও মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই সরকারের বড় সাফল্য:সালেহ শিবলী Logo শেখ হাসিনার কোন স্ট্যাটাসে ভারতে আছেন জানা নেই: চিফ প্রসিকিউটর Logo ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপনের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর Logo আগামীকাল কিশোরগঞ্জ সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী

রিকশা চোর থেকে আদাবর-শ্যামলীর অপরাধ সম্রাট হাসু-কাসু!

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:২৬:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯ ২৬৫ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক:

তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর। সেই অর্থে জনতার নির্বাচিত নেতা বা জননেতা। তা সত্ত্বেও জোর করে জনগণের মুল্লুক দখল করার মারাত্মক প্রবণতা রয়েছে তার। রাজধানীর আদাবর-শ্যামলী এলাকার অতিসাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারদলীয় কর্মী-নেতা- এমন অনেকের প্লট, বাড়ি-ফ্ল্যাট, জমি জোর করে দখল করেছেন তিনি। এমন অন্তত ৫০টি অভিযোগ রয়েছে। এসব ছাড়াও তার অবৈধ দখলের তালিকায় রয়েছে সরকারের খাসজমি, ফুটপাত, এমনকি সড়ক পর্যন্ত।

এসব নিয়ে প্রতিবাদ করতে কেউ সাহস পর্যন্ত পান না। কারণ সে ক্ষেত্রে নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে ভুক্তভোগীদের এলাকা ছাড়া করা হয়। শুধু তাই নয়, চাঁদাবাজি, মাদককারবারসহ বিভিন্ন অপকর্মের হোতাও নাকি তিনি। ডিএনসিসির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের এ কাউন্সিলরের নাম আবুল হাসেম হাসু। অভিযোগ রয়েছে, তার এহেন অপকর্মের দোসর তারই ভাই আবুল কাসেম কাসু। হাসু-কাসুর অত্যাচার আর দখলবাজির দৌরাত্ম্যে আদাবর-শ্যামলী এলাকার অনেক মানুষই এখন সর্বস্বান্ত।

জানা গেছে, হাসু-কাসুর বাবা এক সময় গ্রাম থেকে আখ এনে রাজধানীতে ফেরি করতেন। তখন তাদের বসবাস ছিল আগারগাঁও বস্তিতে। এর পর এক সময় রিকশা চুরি করতে শুরু করেন দুই ভাই। নব্বই দশকের কথা এগুলো। সে সময় তারা রিকশা চোরদের সর্দার ছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। এ বস্তিতে তখন দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অবাধ যাতায়াত ছিল। সেই সুবাদে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সঙ্গে হাসু-কাসুর সখ্য গড়ে ওঠে। এ সখ্যকে পুঁজি করে ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন দুই ভাই। পরে অস্ত্রবাজ বাহিনী গড়ে তুলে টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে এখনো বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় জনসাধারণ, রাজনীতিবিদ ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত দুই যুগে অন্তত শতাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট দখল করেছেন হাসু-কাসু। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট মালিককে ভয়ভীতি দেখিয়ে সেসব সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখিয়ে নিয়েছেন। কেবল জমি দখলই নয়, নতুন ভবন নির্মাণকারীর কাছ থেকে চাঁদা, দোকান ও অফিস থেকে মাসোহারা, মাদক কারবারসহ সব অপকর্ম তাদের ছত্রছায়াতেই নাকি হয়। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে বাধা, জমি ও বাড়ি দখল, খুন, ডাকাতি ও লুটপাটের অভিযোগে দলটি থেকে তাকে এক সময় বহিষ্কার করা হলেও পরবর্তী সময়ে ওয়ার্ড কমিটির সদস্যপদ নিয়ে তিনি ফের দলে ফেরেন।

দেলোয়ার হোসেন নামে স্থানীয় একজন জানান, উত্তর আদাবরের ১৪৫/৩ প্লটটির মালিক তিনি। সন্তানদের ভবিষ্যৎ ভেবে সব সহায়সম্পত্তি বিক্রি করে তিনি এ প্লটটি কিনেছিলেন। সেটি এখন হাসু-কাসুর দখলে; নির্মাণ করা হয়েছে দোতলা ভবন। নিজের বেহাত জমি ফিরে পেতে দেলোয়ার হোসেন ২০১২ সাল থেকে দ্বারে দ্বারে কম ধরনা দেননি। দেখা করেছিলেন ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে। তার বরাবরে একটি আবেদনও করেছিলেন। তাতে কাজ না হওয়ায় আবেদন করেছিলেন আইজিপি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। সবেধন নীলমণি জমিটি সেই যে বেহাত হয়েছে, আর হাতে আসেনি।

কেবল দেলোয়ার হোসেনই নন, অন্তত দশজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা হাসু-কাসুর কারণে সম্পত্তি হারিয়েছেন, উপরন্তু আতঙ্কে এলাকা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। বলছেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা নিয়েও নাকি তারা শঙ্কিত।

অভিযোগ আছে, আদাবরের ৬ নং রোডের মাথায় ২০৩ দাগে ৬৪ কাঠা এবং ২০৯ দাগে ১৬০ কাঠা জমি দখল করে রেখেছেন হাসু-কাসু। অনেক বছর ধরে দখল করা এ জমি ফিরে পেতে নানা জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করেছেন জমির মালিক আলী হোসেন। কিন্তু পাননি। উল্টো মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত ও হতাশ। পৈতৃক জমি বেদখল হয়ে যাওয়া নিজের চোখে দেখতে হচ্ছে।

এলাকায় সম্ভ্রান্ত হিসেবে পরিচিত ইউসুফ হাজির পরিবার। কিন্তু এ পরিবারের মালিকানাধীন শেখেরটেকে ৩ কাঠা ও বায়তুল আমান হাউজিংয়ে সাড়ে ৫ কাঠা জমি হাসু-কাসু দখল করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রতিকারের জন্য পুলিশের আইজিপি থেকে শুরু করে সব স্তরেই তারা আবেদন করেছেন। কাজ হয়নি, ফেরত পাওয়া যায়নি জমি। ইউসুফ হাজির ছেলে ইয়াসিন রহমান বলেন, চোখের সামনে জমি বেদখল হয়ে গেছে। কত জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করলাম। লাভ হয়নি। এখন আত্মসম্মান নিয়ে চলাই দায় হয়ে পড়েছে।

নবোদয় হাউজিংয়ে অন্তত চারটি প্লট, মালেক গলিতে দুটি, আদাবর ১৮ থেকে ৯ নং রোড পর্যন্ত অন্তত সাত থেকে দশটি প্লট দখল করেছেন কাউন্সিলর ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। এ ছাড়া আদাবর ১০ নং রোডের মাথায় ৫৯৫ নম্বরের ১০ কাঠা প্লট দখল করে সেখানে জাতীয় পার্টির কার্যালয় বানিয়ে দখলে রাখা হয়েছে। এ প্লটসংলগ্ন অনেক দোকানও রয়েছে। ১৩ নং রোডে জমি দখল করে প্রায় ১৮ থেকে ২০টি দোকান বানানো হয়েছে। হোসনাবাদ গার্মেন্টসের পশ্চিম পাশে ১০ কাঠা প্লট, এ ছাড়া আলিফ হাউজিংয়ে খাল দখল করে অফিস নির্মাণ, মনসুরাবাদ ব্রিজের পাশে জায়গা দখল করে অফিস নির্মাণ করা হয়েছে। কমফোর্ট হাউজিং ও সুনিবিড় মধ্যস্কুল এলাকায়ও কয়েকটি প্লট দখলে রয়েছে তার। আজিজ গার্মেন্টস নামে পরিচিত ভবনটির জায়গাও মাদ্রাসার নামে জোর করে লিখে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

শেখেরটেক ও বায়তুল আমান হাউজিংয়ের ১০ নম্বর রোডের শেষ মাথায় পাঁচটি প্লট দখলে নিয়েছে হাসুর ঘনিষ্ঠ হাজি মোজাম্মেল হকসহ একটি সিন্ডিকেট। এ ছাড়া কমফোর্ট হাউজিংয়ের আদাবর ১৭/এ নম্বর রোডের শেষ মাথায় দুটি প্লট, ১৬ নম্বর রোডের কাঁচাবাজারের সাত কাঠা জমি দখল এবং কমফোর্ট হাউজিংয়ের ১৬/এ রোডের মসজিদ গলিতে জমি দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করেছে কাউন্সিলরের লোকজন। অন্যের জমি দখল করে কাঁচাবাজার বানিয়ে মাসে মাসে চাঁদা তুলে যাচ্ছে তারা।

কাউন্সিলর হাসুর হাত থেকে রেহাই মিলছে না সরকারদলীয় নেতাকর্মীদেরও। তিনি এলাকায় অনেক আগে থেকেই প্রভাবশালী। তদুপরি শাসকদলের মহানগর কমিটির শীর্ষপর্যায়ের এক নেতাও তাকে প্রশ্রয় দেন বলে গুঞ্জন আছে। ২০১২ সালের ১৪ নভেম্বর সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে মারাত্মক আহত করে আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ মাহমুদকে। পাঁচ মাস নিবিড় চিকিৎসা শেষে সুস্থ হন তিনি। হামলার পর রিয়াজের পরিবার হাসু-কাসুসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। এ বিষয়ে রিয়াজ মাহমুদ বলেন, হাসুর অপকর্মের বিরোধিতা করায় আমার ওপর দুবার হামলা হয়েছে। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। সব সময় মৃত্যুভয় তাড়া করে- কখন আবার হামলা হয়।

আদাবরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, শুধু ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতা রিয়াজই নন, আরও অনেকেই হাসুর ক্যাডারদের হামলার শিকার হয়েছেন। ৩০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আমির হোসেনকেও কুপিয়ে জখম করেছিল হাসুর লোকজন। ১০০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি শাহরুখ জাহান পাপ্পুর গাড়ি ভাঙচুর ও মারধরের জন্যও অভিযুক্ত হাসু। তিনিই নাকি তার নিজের লোকজন দিয়ে এ কা- ঘটিয়েছিলেন। এ ছাড়া আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রুবেলকেও পিটিয়ে আহত করে হাসুর ক্যাডার বাহিনী। হাসুরই ক্যাডার বিয়ার সেলিমের হামলায় মারা যান ছাত্রলীগ নেতা মশু। বিটিভির অনুষ্ঠান নির্মাতা শহিদুল ইসলাম হত্যায়ও সম্পৃক্ততা ছিল হাসুর অনুসারী রায়হানের।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর আবুল হাসেম হাসু বলেন, আমি স্বতন্ত্র কাউন্সিলর। কারও জমি দূরের কথা- আমি তো আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের জন্য নিজের কাজই ঠিকমতো করতে পারি না। তারা সর্বত্র সমস্যা সৃষ্টি করছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
error: Content is protected !!

রিকশা চোর থেকে আদাবর-শ্যামলীর অপরাধ সম্রাট হাসু-কাসু!

আপডেট সময় : ০৩:২৬:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক:

তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর। সেই অর্থে জনতার নির্বাচিত নেতা বা জননেতা। তা সত্ত্বেও জোর করে জনগণের মুল্লুক দখল করার মারাত্মক প্রবণতা রয়েছে তার। রাজধানীর আদাবর-শ্যামলী এলাকার অতিসাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারদলীয় কর্মী-নেতা- এমন অনেকের প্লট, বাড়ি-ফ্ল্যাট, জমি জোর করে দখল করেছেন তিনি। এমন অন্তত ৫০টি অভিযোগ রয়েছে। এসব ছাড়াও তার অবৈধ দখলের তালিকায় রয়েছে সরকারের খাসজমি, ফুটপাত, এমনকি সড়ক পর্যন্ত।

এসব নিয়ে প্রতিবাদ করতে কেউ সাহস পর্যন্ত পান না। কারণ সে ক্ষেত্রে নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে ভুক্তভোগীদের এলাকা ছাড়া করা হয়। শুধু তাই নয়, চাঁদাবাজি, মাদককারবারসহ বিভিন্ন অপকর্মের হোতাও নাকি তিনি। ডিএনসিসির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের এ কাউন্সিলরের নাম আবুল হাসেম হাসু। অভিযোগ রয়েছে, তার এহেন অপকর্মের দোসর তারই ভাই আবুল কাসেম কাসু। হাসু-কাসুর অত্যাচার আর দখলবাজির দৌরাত্ম্যে আদাবর-শ্যামলী এলাকার অনেক মানুষই এখন সর্বস্বান্ত।

জানা গেছে, হাসু-কাসুর বাবা এক সময় গ্রাম থেকে আখ এনে রাজধানীতে ফেরি করতেন। তখন তাদের বসবাস ছিল আগারগাঁও বস্তিতে। এর পর এক সময় রিকশা চুরি করতে শুরু করেন দুই ভাই। নব্বই দশকের কথা এগুলো। সে সময় তারা রিকশা চোরদের সর্দার ছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। এ বস্তিতে তখন দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অবাধ যাতায়াত ছিল। সেই সুবাদে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সঙ্গে হাসু-কাসুর সখ্য গড়ে ওঠে। এ সখ্যকে পুঁজি করে ধীরে ধীরে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন দুই ভাই। পরে অস্ত্রবাজ বাহিনী গড়ে তুলে টেন্ডারবাজি-চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েন। তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে এখনো বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় জনসাধারণ, রাজনীতিবিদ ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গত দুই যুগে অন্তত শতাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট দখল করেছেন হাসু-কাসু। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট মালিককে ভয়ভীতি দেখিয়ে সেসব সম্পত্তি নিজেদের নামে লিখিয়ে নিয়েছেন। কেবল জমি দখলই নয়, নতুন ভবন নির্মাণকারীর কাছ থেকে চাঁদা, দোকান ও অফিস থেকে মাসোহারা, মাদক কারবারসহ সব অপকর্ম তাদের ছত্রছায়াতেই নাকি হয়। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে বাধা, জমি ও বাড়ি দখল, খুন, ডাকাতি ও লুটপাটের অভিযোগে দলটি থেকে তাকে এক সময় বহিষ্কার করা হলেও পরবর্তী সময়ে ওয়ার্ড কমিটির সদস্যপদ নিয়ে তিনি ফের দলে ফেরেন।

দেলোয়ার হোসেন নামে স্থানীয় একজন জানান, উত্তর আদাবরের ১৪৫/৩ প্লটটির মালিক তিনি। সন্তানদের ভবিষ্যৎ ভেবে সব সহায়সম্পত্তি বিক্রি করে তিনি এ প্লটটি কিনেছিলেন। সেটি এখন হাসু-কাসুর দখলে; নির্মাণ করা হয়েছে দোতলা ভবন। নিজের বেহাত জমি ফিরে পেতে দেলোয়ার হোসেন ২০১২ সাল থেকে দ্বারে দ্বারে কম ধরনা দেননি। দেখা করেছিলেন ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে। তার বরাবরে একটি আবেদনও করেছিলেন। তাতে কাজ না হওয়ায় আবেদন করেছিলেন আইজিপি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। সবেধন নীলমণি জমিটি সেই যে বেহাত হয়েছে, আর হাতে আসেনি।

কেবল দেলোয়ার হোসেনই নন, অন্তত দশজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা হাসু-কাসুর কারণে সম্পত্তি হারিয়েছেন, উপরন্তু আতঙ্কে এলাকা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। বলছেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা নিয়েও নাকি তারা শঙ্কিত।

অভিযোগ আছে, আদাবরের ৬ নং রোডের মাথায় ২০৩ দাগে ৬৪ কাঠা এবং ২০৯ দাগে ১৬০ কাঠা জমি দখল করে রেখেছেন হাসু-কাসু। অনেক বছর ধরে দখল করা এ জমি ফিরে পেতে নানা জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করেছেন জমির মালিক আলী হোসেন। কিন্তু পাননি। উল্টো মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত ও হতাশ। পৈতৃক জমি বেদখল হয়ে যাওয়া নিজের চোখে দেখতে হচ্ছে।

এলাকায় সম্ভ্রান্ত হিসেবে পরিচিত ইউসুফ হাজির পরিবার। কিন্তু এ পরিবারের মালিকানাধীন শেখেরটেকে ৩ কাঠা ও বায়তুল আমান হাউজিংয়ে সাড়ে ৫ কাঠা জমি হাসু-কাসু দখল করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রতিকারের জন্য পুলিশের আইজিপি থেকে শুরু করে সব স্তরেই তারা আবেদন করেছেন। কাজ হয়নি, ফেরত পাওয়া যায়নি জমি। ইউসুফ হাজির ছেলে ইয়াসিন রহমান বলেন, চোখের সামনে জমি বেদখল হয়ে গেছে। কত জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করলাম। লাভ হয়নি। এখন আত্মসম্মান নিয়ে চলাই দায় হয়ে পড়েছে।

নবোদয় হাউজিংয়ে অন্তত চারটি প্লট, মালেক গলিতে দুটি, আদাবর ১৮ থেকে ৯ নং রোড পর্যন্ত অন্তত সাত থেকে দশটি প্লট দখল করেছেন কাউন্সিলর ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। এ ছাড়া আদাবর ১০ নং রোডের মাথায় ৫৯৫ নম্বরের ১০ কাঠা প্লট দখল করে সেখানে জাতীয় পার্টির কার্যালয় বানিয়ে দখলে রাখা হয়েছে। এ প্লটসংলগ্ন অনেক দোকানও রয়েছে। ১৩ নং রোডে জমি দখল করে প্রায় ১৮ থেকে ২০টি দোকান বানানো হয়েছে। হোসনাবাদ গার্মেন্টসের পশ্চিম পাশে ১০ কাঠা প্লট, এ ছাড়া আলিফ হাউজিংয়ে খাল দখল করে অফিস নির্মাণ, মনসুরাবাদ ব্রিজের পাশে জায়গা দখল করে অফিস নির্মাণ করা হয়েছে। কমফোর্ট হাউজিং ও সুনিবিড় মধ্যস্কুল এলাকায়ও কয়েকটি প্লট দখলে রয়েছে তার। আজিজ গার্মেন্টস নামে পরিচিত ভবনটির জায়গাও মাদ্রাসার নামে জোর করে লিখে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

শেখেরটেক ও বায়তুল আমান হাউজিংয়ের ১০ নম্বর রোডের শেষ মাথায় পাঁচটি প্লট দখলে নিয়েছে হাসুর ঘনিষ্ঠ হাজি মোজাম্মেল হকসহ একটি সিন্ডিকেট। এ ছাড়া কমফোর্ট হাউজিংয়ের আদাবর ১৭/এ নম্বর রোডের শেষ মাথায় দুটি প্লট, ১৬ নম্বর রোডের কাঁচাবাজারের সাত কাঠা জমি দখল এবং কমফোর্ট হাউজিংয়ের ১৬/এ রোডের মসজিদ গলিতে জমি দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করেছে কাউন্সিলরের লোকজন। অন্যের জমি দখল করে কাঁচাবাজার বানিয়ে মাসে মাসে চাঁদা তুলে যাচ্ছে তারা।

কাউন্সিলর হাসুর হাত থেকে রেহাই মিলছে না সরকারদলীয় নেতাকর্মীদেরও। তিনি এলাকায় অনেক আগে থেকেই প্রভাবশালী। তদুপরি শাসকদলের মহানগর কমিটির শীর্ষপর্যায়ের এক নেতাও তাকে প্রশ্রয় দেন বলে গুঞ্জন আছে। ২০১২ সালের ১৪ নভেম্বর সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে মারাত্মক আহত করে আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ মাহমুদকে। পাঁচ মাস নিবিড় চিকিৎসা শেষে সুস্থ হন তিনি। হামলার পর রিয়াজের পরিবার হাসু-কাসুসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। এ বিষয়ে রিয়াজ মাহমুদ বলেন, হাসুর অপকর্মের বিরোধিতা করায় আমার ওপর দুবার হামলা হয়েছে। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। সব সময় মৃত্যুভয় তাড়া করে- কখন আবার হামলা হয়।

আদাবরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, শুধু ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতা রিয়াজই নন, আরও অনেকেই হাসুর ক্যাডারদের হামলার শিকার হয়েছেন। ৩০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আমির হোসেনকেও কুপিয়ে জখম করেছিল হাসুর লোকজন। ১০০ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি শাহরুখ জাহান পাপ্পুর গাড়ি ভাঙচুর ও মারধরের জন্যও অভিযুক্ত হাসু। তিনিই নাকি তার নিজের লোকজন দিয়ে এ কা- ঘটিয়েছিলেন। এ ছাড়া আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রুবেলকেও পিটিয়ে আহত করে হাসুর ক্যাডার বাহিনী। হাসুরই ক্যাডার বিয়ার সেলিমের হামলায় মারা যান ছাত্রলীগ নেতা মশু। বিটিভির অনুষ্ঠান নির্মাতা শহিদুল ইসলাম হত্যায়ও সম্পৃক্ততা ছিল হাসুর অনুসারী রায়হানের।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর আবুল হাসেম হাসু বলেন, আমি স্বতন্ত্র কাউন্সিলর। কারও জমি দূরের কথা- আমি তো আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের জন্য নিজের কাজই ঠিকমতো করতে পারি না। তারা সর্বত্র সমস্যা সৃষ্টি করছে।