ঢাকা ০১:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo গ্যাস সংকট আগের সরকারের পাপের ফল: ডা. জাহেদ Logo ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই-নির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চালু Logo প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যুবরাজ বিন সালমান Logo ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo সরকারের ১৮০ দিনের সালতামামি: ধ্বংসস্তূপ থেকে পরিকল্পিত পুনর্গঠনের পথে বাংলাদেশ Logo শিগগিরই জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করবে সরকার : নজরুল ইসলাম খান Logo রাষ্ট্র ও মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই সরকারের বড় সাফল্য:সালেহ শিবলী Logo শেখ হাসিনার কোন স্ট্যাটাসে ভারতে আছেন জানা নেই: চিফ প্রসিকিউটর Logo ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপনের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর Logo আগামীকাল কিশোরগঞ্জ সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী

প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শাশুড়িকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৫১:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ মে ২০১৯ ২০৯ বার পড়া হয়েছে

সুন্দর আলীর কুৎসিত কাণ্ড
প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শাশুড়িকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা

গ্রামের গোষ্ঠীগত ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব কতটা কদর্য আর ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের ঢাকী ইউনিয়নের বড়কান্দার ফায়েজার খাতুনের (৫০) পরিণতি না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না কেউ। ওই গ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই সংঘর্ষ আর বিরোধ চলে আসছিল দুটি পক্ষের মধ্যে। একটি পক্ষে রয়েছেন ৩ নম্বর ঢাকী ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান মেম্বার মিকাইল হোসেন এবং আরেক পক্ষে সাবেক মেম্বার মো. বাছির। সর্বশেষ গত ১৬ মার্চ দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে খুন হন বাছির মেম্বারের ভাই অরুণ আলী। এ হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মিকাইল মেম্বারসহ আসামি করা হয় তার গ্রুপের ৪৯ জনকে। তাদের মধ্যে ৩৮ জন উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়েছিলেন। এরপর মিকাইল গ্রুপের সদস্যরা ফন্দি আঁটতে থাকে- কীভাবে প্রতিপক্ষ বাছির মেম্বারের লোকজনকে পাল্টা আরেকটি হত্যা মামলায় আসামি করা যায়।

ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মিকাইল গ্রুপ তাদেরই এক সহযোগীর স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা করে বাছির মেম্বার ও তার সহযোগীদের ফাঁসানের ছক কষে। মিকাইল তার গ্রুপের সদস্য সুন্দর আলীকে ব্যবহার করে তার শাশুড়িকে হত্যার নকশা করে। সুন্দর আলী ও তার শ্বশুর জহিরুল ইসলাম জরু মিয়াও অরুণ আলী হত্যা মামলার আসামি ছিল। শেষ পর্যন্ত সাজানো হত্যা মামলায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে সুন্দর আলীও তার সহযোগীদের নিয়ে নিষ্ঠুরভাবে শাশুড়িকে হত্যা করে। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত এমন বর্বরোচিত ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে ইউনুছ আলী নামে একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এতে বেরিয়ে আসে সুন্দর আলীর কুৎসিত কাহিনী।

মামলার তদন্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কিশোরগঞ্জ জেলার একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মিকাইল মেম্বার ও তার লোকজন ছক করেছিল, যে করেই হোক বাছির মেম্বার এবং তার লোকজনকে কোনো একটি হত্যা মামলায় ফাঁসাতে হবে। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল মিকাইল গ্রুপের সদস্য আবুল হোসেনের ভাতিজি বৃষ্টিকে হত্যা করা হবে। তবে মিকাইল গ্রুপের একজন বৃষ্টিকে এ তথ্য জানানোর পর তিনি বড়কান্দা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন ভয়ে। দ্বিতীয় দফায় তারা ছক করে একই গ্রুপের হারুনের মেয়ে আকলিকে হত্যার। সেটাতে ব্যর্থ হয় মিকাইল ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। পরে গত ২০ এপ্রিল রাতে বড়কান্দার কেরামতের বাসায় গোপন বৈঠক করে মিকাইল গ্রুপের হারুন মিয়া, আবুল হোসেন, মুছা, মানিক, মুকসাগর, মুকলেছ, সুন্দর আলী ও ইউনুছ। ফোনে তাদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছিল মিকাইল। বৈঠকে হঠাৎ আবুল হোসেন বলে, জরুর স্ত্রীকে মারতে হবে। বড়কান্দায় নির্মাণাধীন ঢাকী ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় বাড়ি ছিল জরুর। সেই বাড়িতে জরু ছাড়া অন্য কারও ঘর নেই। ঘটনার রাতে জরু তার এক ছেলের চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অবস্থান করছিল। বাড়িতে ছিলেন জরুর স্ত্রী ফায়েজা খাতুন ও তার দুই ছেলে। ফায়েজা হত্যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর রাত দেড়টার দিকে সুন্দর আলী, হারুন, মুছা, মানিক, ইলিয়াছ, মুকসাগর, মুখলেছ জরুর বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। বাসায় ঢুকেই সুন্দর আলী তার পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী দুই শ্যালককে বলতে থাকে, ‘তোরা দ্রুত বাড়ি থেকে পালা। আজ রাতে গ্রামে অভিযান চালাবে পুলিশ। তোরা ইটনার একটি ডাকাতি মামলার আসামি।’ বোন জামাইয়ের কাছ থেকে গ্রামে পুলিশের অভিযানের আগাম তথ্য পেয়ে দুই শ্যালকও সরলভাবে তা বিশ্বাস করে দ্রুত বাড়ি ছাড়েন।

এর কিছু সময় পরই সুন্দর আলী ও তার সঙ্গীরা আবারও জরু মিয়ার বাড়িতে যায়। সেখানে যাওয়ার পথে এলাকার বাসিন্দা রতনের ধান ভাঙার মেশিন থেকে কেরোসিন নেয় মুসা। পূর্বপরিচিত মানিক মিয়া জরু মিয়ার ঘরের দরজায় কড়া নেড়ে বলতে থাকে, ‘নানি দরজা খোলেন। আমরা আজ আপনার বাসায় রাত্রি যাপন করব।’ তখন ভেতরে জরু মিয়ার স্ত্রী ফায়েজা বলেন, ‘তোমার নানা বাসায় নেই। তোমরা অন্য দিন এসো। এখন দরজা খোলা সম্ভব নয়।’ এরপরই সুন্দর আলী, মানিক, মুসাসহ অন্যরা দরজা ভেঙে জরু মিয়ার ঘরে প্রবেশ করে। ঘরে ঢুকেই তারা ফায়েজার হাত-পা গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলে খাটের সঙ্গে। এরপর তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে তারা। হত্যার পর তার গায়ে কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বাইরে এসে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় কুলাঙ্গাররা। ঘরের মধ্যে পুড়ে অঙ্গার হন ফায়েজা। পরদিন তার স্বামী জরু সন্দেহভাজনদের আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলায় মিকাইল মেম্বার ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা আসামি ছিলেন।

ইউনুছ তার জবাবন্দিতে বলেন, হাইকোর্ট মাজারের কাছে বটতলার নিচে বসে মিকাইল মেম্বার, আবুল হোসেন, কেরামত আলী, হারুন, আজগর আলী ও সুন্দর আলী মিটিং করেছিল। সেখানে মিকাইল মেম্বার আবুল হোসেনকে বলে, ‘কাকা আমাদের যে করেই হোক জিততে হবে। হয় আমার বউ, নয় হয় আমার ভাতিজিকে হত্যা করব। তখন হারুন বলে, তাদের কাউকে মারতে হবে না। আমি আমার মেয়ে আকলিকে মেরে ফেলব। কেউ আপস করার কথা বললেও করব না। পরে করিমগঞ্জের সুতার পাড়ায় তাহের মিয়ার বাড়িতে মিটিং করি। সেখানেও আকলিকে হত্যার চূড়ান্ত ছক হয়েছিল। মিটিং থেকে উঠেই গোপনে ইউনুছ আকলিকে জানিয়ে দেন, তাকে হত্যার ছক করা হয়েছে। পরদিন লুকিয়ে ঢাকার রায়েরবাজারে একটি বাসায় আকলিকে পৌঁছে দেন ইউনুছ।

ফায়েজা হত্যা রহস্য উদ্ঘাটন করতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। সেখানে উঠে আসে, হত্যার পর ফায়েজাকে আগুনে পোড়ানো হয়েছে। এরপর নৃশংস এ ঘটনার নেপথ্যে কারা রয়েছে তা বের করতে শুরু হয় নিবিড় তদন্ত। নানা কৌশল প্রয়োগ করে পুলিশ গত মঙ্গলবার রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থেকে ইউনুছ আলীসহ গ্রেফতার করে তিনজনকে। গ্রেফতার অন্য দু’জন হলো মুকসুদ ও আজগর আলী। হত্যা মিশনের আদ্যোপান্ত জানিয়ে গত বুধবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে তারা।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, ‘প্রতিশোধপরায়ণ মনোবৃত্তি থেকে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিখুঁতভাবে ফায়েজাকে হত্যার ছক করা হয়েছিল। এমন নিষ্ঠুরতা কল্পনারও অতীত। শেষ পর্যন্ত এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। জড়িত অন্যদের দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনা হবে।’

মিঠামইন থানার ওসি মো. জাকির হোসেন রব্বানী বলেন, ‘ফায়েজা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ও পরিকল্পনাকারীদের অধিকাংশরা একই এলাকার আরেকটি হত্যা মামলায় উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিনে ছিল। তারা অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করেছিল কীভাবে প্রতিপক্ষ গ্রুপকে আরেকটি হত্যা মামলায় ফাঁসানো যায়। তারা এতটাই ভয়ঙ্কর যে, অন্যকে মামলায় জড়াতে স্বজনকে খুন করতে হৃদয় কাঁপেনি তাদের।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিঠামইন থানার এসআই নজরুল ইসলাম বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডে জড়িত সুন্দর আলীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মিঠামইনসহ বিভিন্ন থানায় ডাকাতি ও চুরির একাধিক মামলা রয়েছে। তাদের প্রায় সকলের অতীত রেকর্ড অত্যন্ত খারাপ। এখন পর্যন্ত ফায়েজা হত্যার ঘটনায় ১২ জনের সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

এ ব্যাপারে ফায়েজার স্বামী জরু মিয়া বলেন, ‘জোর করে ও ভয় দেখিয়ে আমার মেয়ে সালমাকে বিয়ে করেছিল সুন্দর আলী। তার বিরুদ্ধে মিঠামইনসহ বিভিন্ন জায়গায় একাধিক ডাকাতির মামলা ছিল। এমন ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে শুরু থেকেই আপত্তি ছিল আমার। বিয়ের পর সুন্দর আলীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। তাই ফায়েজার হত্যার সঙ্গে সুন্দর আলীর সংশ্নিষ্টতার কথা জানার পরও অবাক হইনি আমি।’

জরু মিয়া আরও বলেন, জমি কেনাবেচা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে আমাকে অরুণ আলী হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। কোনো মেম্বারের স্বার্থ সংশ্নিষ্ট বিষয়ে জড়িত নই আমি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
error: Content is protected !!

প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শাশুড়িকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা

আপডেট সময় : ১২:৫১:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ মে ২০১৯

সুন্দর আলীর কুৎসিত কাণ্ড
প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে শাশুড়িকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা

গ্রামের গোষ্ঠীগত ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব কতটা কদর্য আর ভয়ঙ্কর হতে পারে, তা কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের ঢাকী ইউনিয়নের বড়কান্দার ফায়েজার খাতুনের (৫০) পরিণতি না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না কেউ। ওই গ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই সংঘর্ষ আর বিরোধ চলে আসছিল দুটি পক্ষের মধ্যে। একটি পক্ষে রয়েছেন ৩ নম্বর ঢাকী ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান মেম্বার মিকাইল হোসেন এবং আরেক পক্ষে সাবেক মেম্বার মো. বাছির। সর্বশেষ গত ১৬ মার্চ দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে খুন হন বাছির মেম্বারের ভাই অরুণ আলী। এ হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় মিকাইল মেম্বারসহ আসামি করা হয় তার গ্রুপের ৪৯ জনকে। তাদের মধ্যে ৩৮ জন উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়েছিলেন। এরপর মিকাইল গ্রুপের সদস্যরা ফন্দি আঁটতে থাকে- কীভাবে প্রতিপক্ষ বাছির মেম্বারের লোকজনকে পাল্টা আরেকটি হত্যা মামলায় আসামি করা যায়।

ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মিকাইল গ্রুপ তাদেরই এক সহযোগীর স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা করে বাছির মেম্বার ও তার সহযোগীদের ফাঁসানের ছক কষে। মিকাইল তার গ্রুপের সদস্য সুন্দর আলীকে ব্যবহার করে তার শাশুড়িকে হত্যার নকশা করে। সুন্দর আলী ও তার শ্বশুর জহিরুল ইসলাম জরু মিয়াও অরুণ আলী হত্যা মামলার আসামি ছিল। শেষ পর্যন্ত সাজানো হত্যা মামলায় প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে সুন্দর আলীও তার সহযোগীদের নিয়ে নিষ্ঠুরভাবে শাশুড়িকে হত্যা করে। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত এমন বর্বরোচিত ঘটনার সঙ্গে যুক্ত তিনজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে ইউনুছ আলী নামে একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এতে বেরিয়ে আসে সুন্দর আলীর কুৎসিত কাহিনী।

মামলার তদন্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কিশোরগঞ্জ জেলার একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মিকাইল মেম্বার ও তার লোকজন ছক করেছিল, যে করেই হোক বাছির মেম্বার এবং তার লোকজনকে কোনো একটি হত্যা মামলায় ফাঁসাতে হবে। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল মিকাইল গ্রুপের সদস্য আবুল হোসেনের ভাতিজি বৃষ্টিকে হত্যা করা হবে। তবে মিকাইল গ্রুপের একজন বৃষ্টিকে এ তথ্য জানানোর পর তিনি বড়কান্দা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন ভয়ে। দ্বিতীয় দফায় তারা ছক করে একই গ্রুপের হারুনের মেয়ে আকলিকে হত্যার। সেটাতে ব্যর্থ হয় মিকাইল ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। পরে গত ২০ এপ্রিল রাতে বড়কান্দার কেরামতের বাসায় গোপন বৈঠক করে মিকাইল গ্রুপের হারুন মিয়া, আবুল হোসেন, মুছা, মানিক, মুকসাগর, মুকলেছ, সুন্দর আলী ও ইউনুছ। ফোনে তাদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছিল মিকাইল। বৈঠকে হঠাৎ আবুল হোসেন বলে, জরুর স্ত্রীকে মারতে হবে। বড়কান্দায় নির্মাণাধীন ঢাকী ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় বাড়ি ছিল জরুর। সেই বাড়িতে জরু ছাড়া অন্য কারও ঘর নেই। ঘটনার রাতে জরু তার এক ছেলের চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অবস্থান করছিল। বাড়িতে ছিলেন জরুর স্ত্রী ফায়েজা খাতুন ও তার দুই ছেলে। ফায়েজা হত্যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর রাত দেড়টার দিকে সুন্দর আলী, হারুন, মুছা, মানিক, ইলিয়াছ, মুকসাগর, মুখলেছ জরুর বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। বাসায় ঢুকেই সুন্দর আলী তার পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী দুই শ্যালককে বলতে থাকে, ‘তোরা দ্রুত বাড়ি থেকে পালা। আজ রাতে গ্রামে অভিযান চালাবে পুলিশ। তোরা ইটনার একটি ডাকাতি মামলার আসামি।’ বোন জামাইয়ের কাছ থেকে গ্রামে পুলিশের অভিযানের আগাম তথ্য পেয়ে দুই শ্যালকও সরলভাবে তা বিশ্বাস করে দ্রুত বাড়ি ছাড়েন।

এর কিছু সময় পরই সুন্দর আলী ও তার সঙ্গীরা আবারও জরু মিয়ার বাড়িতে যায়। সেখানে যাওয়ার পথে এলাকার বাসিন্দা রতনের ধান ভাঙার মেশিন থেকে কেরোসিন নেয় মুসা। পূর্বপরিচিত মানিক মিয়া জরু মিয়ার ঘরের দরজায় কড়া নেড়ে বলতে থাকে, ‘নানি দরজা খোলেন। আমরা আজ আপনার বাসায় রাত্রি যাপন করব।’ তখন ভেতরে জরু মিয়ার স্ত্রী ফায়েজা বলেন, ‘তোমার নানা বাসায় নেই। তোমরা অন্য দিন এসো। এখন দরজা খোলা সম্ভব নয়।’ এরপরই সুন্দর আলী, মানিক, মুসাসহ অন্যরা দরজা ভেঙে জরু মিয়ার ঘরে প্রবেশ করে। ঘরে ঢুকেই তারা ফায়েজার হাত-পা গামছা দিয়ে বেঁধে ফেলে খাটের সঙ্গে। এরপর তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে তারা। হত্যার পর তার গায়ে কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। বাইরে এসে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় কুলাঙ্গাররা। ঘরের মধ্যে পুড়ে অঙ্গার হন ফায়েজা। পরদিন তার স্বামী জরু সন্দেহভাজনদের আসামি করে মামলা করেন। ওই মামলায় মিকাইল মেম্বার ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা আসামি ছিলেন।

ইউনুছ তার জবাবন্দিতে বলেন, হাইকোর্ট মাজারের কাছে বটতলার নিচে বসে মিকাইল মেম্বার, আবুল হোসেন, কেরামত আলী, হারুন, আজগর আলী ও সুন্দর আলী মিটিং করেছিল। সেখানে মিকাইল মেম্বার আবুল হোসেনকে বলে, ‘কাকা আমাদের যে করেই হোক জিততে হবে। হয় আমার বউ, নয় হয় আমার ভাতিজিকে হত্যা করব। তখন হারুন বলে, তাদের কাউকে মারতে হবে না। আমি আমার মেয়ে আকলিকে মেরে ফেলব। কেউ আপস করার কথা বললেও করব না। পরে করিমগঞ্জের সুতার পাড়ায় তাহের মিয়ার বাড়িতে মিটিং করি। সেখানেও আকলিকে হত্যার চূড়ান্ত ছক হয়েছিল। মিটিং থেকে উঠেই গোপনে ইউনুছ আকলিকে জানিয়ে দেন, তাকে হত্যার ছক করা হয়েছে। পরদিন লুকিয়ে ঢাকার রায়েরবাজারে একটি বাসায় আকলিকে পৌঁছে দেন ইউনুছ।

ফায়েজা হত্যা রহস্য উদ্ঘাটন করতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। সেখানে উঠে আসে, হত্যার পর ফায়েজাকে আগুনে পোড়ানো হয়েছে। এরপর নৃশংস এ ঘটনার নেপথ্যে কারা রয়েছে তা বের করতে শুরু হয় নিবিড় তদন্ত। নানা কৌশল প্রয়োগ করে পুলিশ গত মঙ্গলবার রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থেকে ইউনুছ আলীসহ গ্রেফতার করে তিনজনকে। গ্রেফতার অন্য দু’জন হলো মুকসুদ ও আজগর আলী। হত্যা মিশনের আদ্যোপান্ত জানিয়ে গত বুধবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে তারা।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, ‘প্রতিশোধপরায়ণ মনোবৃত্তি থেকে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে নিখুঁতভাবে ফায়েজাকে হত্যার ছক করা হয়েছিল। এমন নিষ্ঠুরতা কল্পনারও অতীত। শেষ পর্যন্ত এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। জড়িত অন্যদের দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনা হবে।’

মিঠামইন থানার ওসি মো. জাকির হোসেন রব্বানী বলেন, ‘ফায়েজা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ও পরিকল্পনাকারীদের অধিকাংশরা একই এলাকার আরেকটি হত্যা মামলায় উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিনে ছিল। তারা অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করেছিল কীভাবে প্রতিপক্ষ গ্রুপকে আরেকটি হত্যা মামলায় ফাঁসানো যায়। তারা এতটাই ভয়ঙ্কর যে, অন্যকে মামলায় জড়াতে স্বজনকে খুন করতে হৃদয় কাঁপেনি তাদের।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিঠামইন থানার এসআই নজরুল ইসলাম বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডে জড়িত সুন্দর আলীসহ অন্যদের বিরুদ্ধে মিঠামইনসহ বিভিন্ন থানায় ডাকাতি ও চুরির একাধিক মামলা রয়েছে। তাদের প্রায় সকলের অতীত রেকর্ড অত্যন্ত খারাপ। এখন পর্যন্ত ফায়েজা হত্যার ঘটনায় ১২ জনের সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

এ ব্যাপারে ফায়েজার স্বামী জরু মিয়া বলেন, ‘জোর করে ও ভয় দেখিয়ে আমার মেয়ে সালমাকে বিয়ে করেছিল সুন্দর আলী। তার বিরুদ্ধে মিঠামইনসহ বিভিন্ন জায়গায় একাধিক ডাকাতির মামলা ছিল। এমন ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে শুরু থেকেই আপত্তি ছিল আমার। বিয়ের পর সুন্দর আলীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। তাই ফায়েজার হত্যার সঙ্গে সুন্দর আলীর সংশ্নিষ্টতার কথা জানার পরও অবাক হইনি আমি।’

জরু মিয়া আরও বলেন, জমি কেনাবেচা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে আমাকে অরুণ আলী হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। কোনো মেম্বারের স্বার্থ সংশ্নিষ্ট বিষয়ে জড়িত নই আমি।