বন্ড সুবিধার আড়ালে শত কোটি টাকার কারসাজি, নাটের গুরু কমিশনার আবু ওবায়দা
- আপডেট সময় : ০৮:২০:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে

বিশেষ প্রতিবেদকঃ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এর কমিশনার মিয়া মো. আবু ওবায়দাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে দায়িত্ব পালন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, জাল দলিলের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি এবং অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিসিএস ২২তম ব্যাচের এই কর্মকর্তা ২০০৩ সালে সহকারী কমিশনার হিসেবে বন্ড কমিশনারেটে যোগ দেন। পরবর্তীতে আইসিডি কমলাপুর, এনবিআর সচিবালয়, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং বন্ড কমিশনারেটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ঘুরেফিরে দায়িত্ব পালন করেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রশাসনিক প্রভাব ও রাজনৈতিক বলয়ের কারণে তাকে কখনো ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়নি।
সম্প্রতি মো. আক্তার উজ জামান নামের এক ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে বলা হয়, কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের ঘুষ আদায় করা হতো। এ কাজে ‘ফরিদ’ ও জামান এক্সেসরিজের মালিক জামানের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ভ্যাট থেকে এ.বি.এম মাসুম নামের এক কর্মকর্তাকে বিশেষভাবে নিজের দপ্তরে আনার অভিযোগও রয়েছে।
দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্মীয় ভাবমূর্তি ও বাহ্যিক উপস্থিতির কারণে অফিসে আবু ওবায়দা ‘বন্ড হুজুর’ নামে পরিচিত। তবে অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, এই ভাবমূর্তির আড়ালে তিনি বন্ড সুবিধাকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বজায় রাখা হয়েছে।
অভিযোগের অন্যতম আলোচিত অংশ হলো বন্ড কমিশনারেটের ভবনের নিচতলায় পরিচালিত একটি ফটোকপির দোকানকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, ওই দোকান থেকেই জাল ইউটিলাইজেশন পারমিশন (ইউপি) ও ভুয়া বন্ড দলিল তৈরি করা হতো। এর মাধ্যমে মাহমুদ গ্রুপ ও ডংবেং গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই দোকানে একাধিক কম্পিউটার ও ফটোকপি মেশিন ব্যবহার করে কাগজপত্র প্রস্তুত ও সত্যায়নের কাজ চলত। এমনকি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইমরান হাসানকে অফিস কক্ষের বাইরে সেখানে নথিপত্র সত্যায়ন করতে দেখা গেছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
এ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সেটি সরিয়ে ফেলতে নানা তৎপরতা চালানোর অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বন্ড কমিশনারেটের কয়েকজন কর্মকর্তা প্রতিবেদককে ফোন করে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ বা সরিয়ে নিতে চাপ দেন এবং অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও করেন। এমনকি কয়েকজন সাংবাদিককে তদবিরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে অভিযোগ ও অনুসন্ধানের তথ্য সামনে এলেও আবু ওবায়দার প্রশাসনিক প্রভাব কমেনি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি এক দাপ্তরিক আদেশে তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা উত্তরের কমিশনারের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। এতে এনবিআরের ভেতরে তার প্রভাব ও ‘অদৃশ্য শক্তি’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে মিয়া মো. আবু ওবায়দা বলেছেন, “এটি একটি ষড়যন্ত্র। একটি গ্রুপ আমাকে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করছে।” তিনি দাবি করেন, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি কাজ করছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
অন্যদিকে, একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্ড সুবিধায় আনা বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, এসব কাঁচামাল শুল্ক ফাঁকি দিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তদন্তে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের প্রমাণও মিলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কমিশনার মিয়া মো. আবু ওবায়দার যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। ফলে ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশের অর্থনীতি।
চলবে….














