বন্ড সুবিধার বিনিময়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ, রাজস্ব কর্মকর্তা ইরফানের সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন
- আপডেট সময় : ০৮:৫৩:৫৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ৩৭ বার পড়া হয়েছে

স্ত্রী-পরিবারের নামে জমি, ফ্ল্যাট, ভবন, এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র—অভিযোগে শত কোটি টাকার সম্পদের দাবি; ‘বন্ড সুবিধা’ ঘিরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ, বক্তব্য মেলেনি
বিশেষ প্রতিনিধি
কাস্টমস বন্ডের গুরুত্বপূর্ণ ফাইল। একটি অনুমোদন কিংবা ছাড়পত্রের ওপর নির্ভর করে কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। আর সেই প্রক্রিয়াকে ঘিরেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব কর্মকর্তা মো. ইরফান আলীর বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ—ফাইল আটকে অর্থ আদায়, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার।
এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এ দায়িত্ব পালনের সময় বন্ডেড লাইসেন্স নবায়ন, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল ছাড় ও প্রশাসনিক অনুমোদনের মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে চাপের মধ্যে রাখতেন ইরফান আলী।
অভিযোগকারীর দাবি, ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে নিজের, স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমি, ফ্ল্যাট, ভবনসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ এ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। অভিযোগে যেসব সম্পদের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর মালিকানা ও অর্থের উৎস সরকারি নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
যে দুই প্রতিষ্ঠানের নাম অভিযোগে
দুদকে দেওয়া অভিযোগে ‘সিলভার কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড (ইউনিট-১ গার্মেন্টস)’ এবং ‘রুপা প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ লিমিটেড’-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের বন্ড সুবিধা সংক্রান্ত কাজ দ্রুত করে দেওয়ার কথা বলে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়েছে। ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিভিন্ন আইনি জটিলতার অজুহাতে পণ্য খালাস, ছাড়পত্র কিংবা অনুমোদনের ফাইল আটকে রাখার অভিযোগও করা হয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট সময়ের ফাইল মুভমেন্ট, অনুমোদনের তারিখ, পণ্য ছাড়ের নথি এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বণ্টনের তথ্য পরীক্ষা করা জরুরি।
জমি-ফ্ল্যাট থেকে এফডিআর—অভিযোগে সম্পদের দীর্ঘ তালিকা
দুদকে দেওয়া অভিযোগে ইরফান আলী ও তাঁর পরিবারের নামে থাকা কথিত সম্পদের একটি তালিকাও দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মাগুরার ভায়নার মোড় এলাকায় তাঁর স্ত্রী তুলি আক্তারের নামে প্রায় ৫২ শতক জমি রয়েছে। অভিযোগকারীর হিসাবে জমিটির ক্রয়মূল্য প্রায় ১ কোটি ৫৫ লাখ ২০ হাজার টাকা।
একই এলাকায় একটি ১০ তলা ভবনে আত্মীয়দের সঙ্গে অংশীদারত্বে ইরফানের প্রায় ২ কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
রাজধানীর উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে প্রায় ১ হাজার ৬৬০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট থাকার দাবিও করা হয়েছে। অভিযোগকারীর হিসাবে যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
এ ছাড়া ঝিনাইদহ সদর ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৬৬ লাখ টাকায় তিন বিঘা জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে। ৮১ ও ১১০ নম্বর বিষয়খালি মৌজায় ইরফান ও তাঁর পরিবারের নামে আরও প্রায় ১০ বিঘা জমি থাকার দাবিও করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পরিবারের নামে রয়েছে প্রায় ১০০ ভরি স্বর্ণালংকার, ৮০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং বিভিন্ন ব্যাংকে কয়েক কোটি টাকার এফডিআর ও ডিপিএস।
প্রশ্ন উঠছে সম্পদের অর্থের উৎস নিয়ে
অভিযোগে উল্লিখিত সম্পদের তালিকা সত্য হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এসব সম্পদের অর্থের উৎস কী?
ইরফান আলীর চাকরিজীবনের বৈধ আয়, আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত সম্পদ, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব এবং পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা সম্পদের সঙ্গে অভিযোগে উল্লিখিত তথ্যের কোনো অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে জমির দলিল ও নামজারি নথির পাশাপাশি সম্পত্তি কেনার অর্থ কোথা থেকে এসেছে, ব্যাংক বা অন্য কোনো মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ হয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট অর্থের উৎস আয়কর নথিতে দেখানো হয়েছে কি না—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
‘কৃষকের ছেলে’ থেকে সম্পদের মালিক—অভিযোগে পারিবারিক পটভূমিও
দুদকে দেওয়া অভিযোগে ইরফান আলীর পারিবারিক পটভূমির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বেড়বাড়ী এলাকার বাসিন্দা ইরফান কৃষক পরিবারের সন্তান।
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে অভিযোগে বলা হয়েছে, তাঁর বাবা মো. শমসের আলী কৃষিকাজ করে সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয় এবং পরবর্তী সময়ে ইরফান ও তাঁর পরিবারের সম্পদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায় বলে অভিযোগকারীর দাবি।
তবে স্থানীয়দের এসব বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
বন্ডের ফাইলই হতে পারে অভিযোগ যাচাইয়ের বড় সূত্র
ইরফান আলীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের নথি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাঁর দায়িত্ব পালনকালে কোন কোন প্রতিষ্ঠানের ফাইল তাঁর হাতে ছিল, কোনো ফাইল অস্বাভাবিক সময় আটকে রাখা হয়েছিল কি না, অনুমোদন পেতে প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্বাভাবিক বিলম্ব হয়েছে কি না এবং ফাইল নিষ্পত্তির সঙ্গে কোনো আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তে উঠে আসতে পারে।
পাশাপাশি অভিযোগে উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ফাইলের নোটশিট, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং ব্যাংক লেনদেন পর্যালোচনা করলেও অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বক্তব্য জানতে যোগাযোগ, মেলেনি সাড়া
অভিযোগের বিষয়ে মো. ইরফান আলীর বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে খুদেবার্তা পাঠিয়েও বক্তব্য চাওয়া হয়। কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাঁর কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
অভিযোগ প্রমাণের অপেক্ষায়, নজর দুদকের দিকে
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে ইরফান আলীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
তবে অভিযোগ দায়ের হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে দুদকের অনুসন্ধান, কাস্টমসের নথি, সম্পত্তির দলিল, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
এখন মূল প্রশ্ন—বন্ড সুবিধার নামে সত্যিই কোনো অর্থ লেনদেন হয়েছিল কি না, অভিযোগে উল্লেখিত সম্পদ বাস্তবে ইরফান ও তাঁর পরিবারের মালিকানাধীন কি না এবং এসব সম্পদের অর্থের উৎস তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে নথিপত্র ও তদন্তে। আর সেই কারণেই দুদকে জমা পড়া অভিযোগের পর এখন নজর থাকবে অনুসন্ধানের ফলাফলের দিকে।






















