ঢাকা ০৯:৪১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ




স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও অযত্ন-অবহেলায় তালিকাবিহীন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:১৮:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২১ ১৫ বার পড়া হয়েছে

বরিশাল থেকে ঘুরে এইচ আর শফিক: সন্ধ্যার সূর্য হস্তনির্মিত যাওয়ার সাথে সাথে পেরিয়ে গেছে অর্ধশতাব্দী, (আঠারো হাজার দুইশত পঞ্চাশ দিন) প্রতিদিন সূর্য অস্ত যায় আবার উঠে। প্রতিটি বছরেই ঢাকঢোল পিটিয়ে অনাড়ম্বর আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় মহান বিজয়। পাড়ায়-মহল্লায় মাইকের শব্দ, রাষ্ট্রীয় উৎসব ও তোপধ্বনিতে কেঁপে উঠে স্বাধীন বাংলার মাটি। কিন্তু কোন রাষ্ট্রের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষণাবেক্ষণ করা দায়িত্বশীল দপ্তরের যেন বিন্দু পরিমাণ বুক কেঁপে ওঠে না একজন শহীদ হতভাগ্য মোতালেবের স্মরণে।

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাড়িয়াল গ্রামে এভাবেই যুগের পর যুগ অযত্ন অবহেলা আর অসম্মানে পড়ে আছে সম্মুখ সমরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মোতালেব এর কবর।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণতার পরেও যেনো রাষ্ট্র জানতেই পারেননি ৭১,এ সম্মুখ সমরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাকেরগঞ্জের দাড়িয়াল গ্রামের সূর্যসন্তান শহীদ মোতালেব হাওলাদের কথা। অথচ বছরের পর বছর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা হালনাগাদ, যাচাই বাছাইয়ের অসংখ্য উদ্যোগ ও শিরোনাম হয় পত্রপত্রিকায়। তবে সেই সব যাচাই-বাছাইয়ে আর মুক্তিযোদ্ধার নিত্যনতুন হালনাগাদ তালিকায় কারা পায় ঠাই? সমগ্র স্বাধীন জাতির উদ্দেশ্যে যেন শহীদ মোতালেবের কবর এই প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।

১৯৭১ এর সেই রক্তক্ষয়ী উত্তাল দিনে মোতালেব হাওলাদারের সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে তার শশুর বাড়ি পাঠিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য ট্রেনিংয়ে যোগ দেন তিনি। ট্রেনিং শেষে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতিকালে এক ভোররাতে মাত্র বাড়ি ফিরেছেন মোতালেব। সকাল বেলা ছূটতে ছূটতে কোনো এক আত্মীয় খবর নিয়ে এলেন আগের রাতে পুত্র সন্তানের বাবা হয়েছেন মোতালেব। সন্তানের মুখ দেখার আগেই আঞ্চলিক কমান্ডার খবর পাঠিয়েছেন পাক বাহিনী আক্রমণ করেছে বাকেরগঞ্জ সদর ও তার আশেপাশের গ্রামগুলোতে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেদিনি তাদের বাকেরগঞ্জের শ্যামপুরে পাক বাহিনীকে আক্রমণ করার দিন। মোতালেব হাওলাদার তার সদ্যজাত সন্তানকে না দেখেই ছূটলেন দেশ তথা বাকেরগঞ্জ এলাকা শত্রুমুক্ত করতে। কিন্তু পরের দিন ফিরলো পাক বাহিনীর স্টেনগানের গুলিতে মোতালেবের ঝারঝা বুক আর ক্ষতবিক্ষত মোতালেব। লাশ ববহনকারী নৌকায় রক্ত স্রোত শাজরা হয়ে যাওয়া মরদেহ। স্ত্রী সন্তানের জন্য স্বাধীন একটি পতাকা ছিনিয়ে আনতে গিয়ে মোতালেব শহীদ হলেন আর তাই নানা নানী সদ্যজাত সন্তানের নাম রাখলেন “শহীদ”। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, মোতালেব এর উত্তরসূরী আসহায় মা আর সন্তান শহীদের স্থান হলো না চিরচেনা সেই দাড়িয়াল গ্রামে।

বাংলার স্বাধীনতার অনেক অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে কখনো কোনদিন হতভাগ্য শহীদ মোতালেবের পরিবারের খোঁজ খবর রাখা তো দূরের কথা তার কবরের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় কেউ হাত লাগায়নি পর্যন্ত। তার উদ্দেশ্যে কখনো হয়নি ফাতেহা পাঠ। দেশমাতার এই সূর্য সন্তানের স্মরণ এর উদ্দেশ্যে কোনদিন তার কবরে পড়েনি একটি ফুলের পাপড়িও। এমনকি সরকারের কোনো তালিকা বা পরিসংখ্যানে নেই হতভাগ্য শহীদ মোতালেবের নাম।

দীর্ঘ ৫০ বছর পর এলাকার তরুণ মেহেদী হাসানের উদ্যোগে সম্মুখ সমরে শহীদ মোতালেবের অযত্ন অবহেলিত কবরখানা পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এটাই যেন স্বাধীনতার সূর্য সন্তানের জন্য মরণোত্তর পরম পাওয়া।

সমরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার এমন অসম্মান কোনভাবেই এলাকাবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সম্প্রতি মোতালেবের কবরের অযত্ন অবহেলা ও তালিকায় নাম না থাকা নিয়ে সোচ্চার এলাকার তরুণ মেহেদী হাসান জানান, শহীদ মোতালেব হাওলাদার আমাদের গর্ব, দেশমাতার সূর্যসন্তান। এদেশে ৫০ বছর বয়সী অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম লিখিয়েছেন কিন্তু অসংখ্য প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এমনকি শহীদ মোতালেবের মতো অনেকেই হতভাগ্য।

সমরে শহীদ তালিকাবিহীন হতভাগ্য মুক্তিযোদ্ধা মোতালেবের সামান্য সম্মান কি কখনোই দিতে এগিয়ে আসবে এই রাষ্ট্র? তার একমাত্র ছেলে ৫০ বছরের শহীদ হাওলাদার ও তার পরিবারের খোঁজ কি নেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ কোনো সরকার এই প্রশ্ন বাকেরগঞ্জের দাড়িয়ালবাসির।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :




স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও অযত্ন-অবহেলায় তালিকাবিহীন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর

আপডেট সময় : ০৭:১৮:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২১

বরিশাল থেকে ঘুরে এইচ আর শফিক: সন্ধ্যার সূর্য হস্তনির্মিত যাওয়ার সাথে সাথে পেরিয়ে গেছে অর্ধশতাব্দী, (আঠারো হাজার দুইশত পঞ্চাশ দিন) প্রতিদিন সূর্য অস্ত যায় আবার উঠে। প্রতিটি বছরেই ঢাকঢোল পিটিয়ে অনাড়ম্বর আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় মহান বিজয়। পাড়ায়-মহল্লায় মাইকের শব্দ, রাষ্ট্রীয় উৎসব ও তোপধ্বনিতে কেঁপে উঠে স্বাধীন বাংলার মাটি। কিন্তু কোন রাষ্ট্রের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষণাবেক্ষণ করা দায়িত্বশীল দপ্তরের যেন বিন্দু পরিমাণ বুক কেঁপে ওঠে না একজন শহীদ হতভাগ্য মোতালেবের স্মরণে।

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাড়িয়াল গ্রামে এভাবেই যুগের পর যুগ অযত্ন অবহেলা আর অসম্মানে পড়ে আছে সম্মুখ সমরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মোতালেব এর কবর।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণতার পরেও যেনো রাষ্ট্র জানতেই পারেননি ৭১,এ সম্মুখ সমরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাকেরগঞ্জের দাড়িয়াল গ্রামের সূর্যসন্তান শহীদ মোতালেব হাওলাদের কথা। অথচ বছরের পর বছর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা হালনাগাদ, যাচাই বাছাইয়ের অসংখ্য উদ্যোগ ও শিরোনাম হয় পত্রপত্রিকায়। তবে সেই সব যাচাই-বাছাইয়ে আর মুক্তিযোদ্ধার নিত্যনতুন হালনাগাদ তালিকায় কারা পায় ঠাই? সমগ্র স্বাধীন জাতির উদ্দেশ্যে যেন শহীদ মোতালেবের কবর এই প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।

১৯৭১ এর সেই রক্তক্ষয়ী উত্তাল দিনে মোতালেব হাওলাদারের সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে তার শশুর বাড়ি পাঠিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য ট্রেনিংয়ে যোগ দেন তিনি। ট্রেনিং শেষে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতিকালে এক ভোররাতে মাত্র বাড়ি ফিরেছেন মোতালেব। সকাল বেলা ছূটতে ছূটতে কোনো এক আত্মীয় খবর নিয়ে এলেন আগের রাতে পুত্র সন্তানের বাবা হয়েছেন মোতালেব। সন্তানের মুখ দেখার আগেই আঞ্চলিক কমান্ডার খবর পাঠিয়েছেন পাক বাহিনী আক্রমণ করেছে বাকেরগঞ্জ সদর ও তার আশেপাশের গ্রামগুলোতে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেদিনি তাদের বাকেরগঞ্জের শ্যামপুরে পাক বাহিনীকে আক্রমণ করার দিন। মোতালেব হাওলাদার তার সদ্যজাত সন্তানকে না দেখেই ছূটলেন দেশ তথা বাকেরগঞ্জ এলাকা শত্রুমুক্ত করতে। কিন্তু পরের দিন ফিরলো পাক বাহিনীর স্টেনগানের গুলিতে মোতালেবের ঝারঝা বুক আর ক্ষতবিক্ষত মোতালেব। লাশ ববহনকারী নৌকায় রক্ত স্রোত শাজরা হয়ে যাওয়া মরদেহ। স্ত্রী সন্তানের জন্য স্বাধীন একটি পতাকা ছিনিয়ে আনতে গিয়ে মোতালেব শহীদ হলেন আর তাই নানা নানী সদ্যজাত সন্তানের নাম রাখলেন “শহীদ”। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, মোতালেব এর উত্তরসূরী আসহায় মা আর সন্তান শহীদের স্থান হলো না চিরচেনা সেই দাড়িয়াল গ্রামে।

বাংলার স্বাধীনতার অনেক অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে কখনো কোনদিন হতভাগ্য শহীদ মোতালেবের পরিবারের খোঁজ খবর রাখা তো দূরের কথা তার কবরের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় কেউ হাত লাগায়নি পর্যন্ত। তার উদ্দেশ্যে কখনো হয়নি ফাতেহা পাঠ। দেশমাতার এই সূর্য সন্তানের স্মরণ এর উদ্দেশ্যে কোনদিন তার কবরে পড়েনি একটি ফুলের পাপড়িও। এমনকি সরকারের কোনো তালিকা বা পরিসংখ্যানে নেই হতভাগ্য শহীদ মোতালেবের নাম।

দীর্ঘ ৫০ বছর পর এলাকার তরুণ মেহেদী হাসানের উদ্যোগে সম্মুখ সমরে শহীদ মোতালেবের অযত্ন অবহেলিত কবরখানা পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এটাই যেন স্বাধীনতার সূর্য সন্তানের জন্য মরণোত্তর পরম পাওয়া।

সমরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার এমন অসম্মান কোনভাবেই এলাকাবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সম্প্রতি মোতালেবের কবরের অযত্ন অবহেলা ও তালিকায় নাম না থাকা নিয়ে সোচ্চার এলাকার তরুণ মেহেদী হাসান জানান, শহীদ মোতালেব হাওলাদার আমাদের গর্ব, দেশমাতার সূর্যসন্তান। এদেশে ৫০ বছর বয়সী অনেকেই মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম লিখিয়েছেন কিন্তু অসংখ্য প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এমনকি শহীদ মোতালেবের মতো অনেকেই হতভাগ্য।

সমরে শহীদ তালিকাবিহীন হতভাগ্য মুক্তিযোদ্ধা মোতালেবের সামান্য সম্মান কি কখনোই দিতে এগিয়ে আসবে এই রাষ্ট্র? তার একমাত্র ছেলে ৫০ বছরের শহীদ হাওলাদার ও তার পরিবারের খোঁজ কি নেবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ কোনো সরকার এই প্রশ্ন বাকেরগঞ্জের দাড়িয়ালবাসির।