• ১৬ই এপ্রিল ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৩রা বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সুপারিশ ঝুলে আছে হিমঘরে রাজধানীর সিটিং সার্ভিস!

সকালের সংবাদ ডেস্ক;
প্রকাশিত জানুয়ারি ২০, ২০১৯, ১৩:৩৫ অপরাহ্ণ
সুপারিশ ঝুলে আছে হিমঘরে রাজধানীর সিটিং সার্ভিস!

তারিক শীবলি; রাজধানীতে সিটিং সার্ভিসের নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এখনও বন্ধ হয়নি, বাড়েনি যাত্রীসেবার মান। একই কোম্পানির লোকাল ও সিটিং আলাদা রঙের বাস চালুর কথা থাকলেও তা মানছেন না পরিবহন মালিকরা।ঢাকার ‘লোকাল’ নামে পরিচিত বাসগুলো রং বদলিয়ে হয়ে যাচ্ছে ‘গেটলক সিটিং’ বাস। এতে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরা সংকটে পড়ছেন। এসব বাসে সরকার-নির্ধারিত ভাড়ার নিয়মও মানা হচ্ছে না। রাজধানীর বিভিন্ন পথে লোকাল এবং গেটলক সিটিং নামে দুই ধরনের বাসসেবা চালু আছে। মহানগর পরিবহন নীতিমালায় লোকাল বা সিটিং ভেদে কোনো হেরফের নেই।

রাজধানীর বিভিন্ন রুটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রীবাহী বাস বিভিন্ন কোম্পানির অধীনে চলাচল করলেও এর সবগুলোই ছিলো সিটিং সার্ভিস। কোনো কোম্পানির আলাদা লোকাল সার্ভিসের বাস চোখে পড়েনি। আবার দাঁড়ানো যাত্রীও ছিলো প্রতিটি সিটিং সার্ভিসে। দাঁড়ানো যাত্রী নিলেও ভাড়া আদায় হয়েছেন সিটিং সার্ভিসেরই।বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে ঢাকা মহানগরে অভ্যন্তরীণ রুটে নিয়মিত চলাচল করে প্রায় ছয় হাজার বাস। ঢাকা মহানগরে বিআরটির নির্ধারিত সর্বনিম্ন ভাড়া বাসের জন্য ৭ টাকা আর মিনিবাসের জন্য ৫ টাকা। অথচ গেটলক সিটিং সার্ভিসের বাসগুলোতে সর্বনি¤œœ ভাড়া ১০ টাকা থেকে ক্ষেত্র বিশেষে ৫০ টাকা পর্যন্ত নিতে দেখা যায়।প্রতিটি বাসে বিআরটির নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা টাঙানোর নিয়ম আছে। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন পথে চলাচলকারী অন্তত ২০ টি পরিবহনের বাসে উঠে দেখা যায়, নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা টাঙানো নেই। আর গেটলক সিটিং সেবা বলা হলেও দাঁড়ানো যাত্রী নিতে এবং যেখানে–সেখানে থামিয়ে যাত্রী নামাতে দেখা গেছে অন্তত ১১ টি পরিবহনের বাসকে।নির্ধারিত সময় পার করে কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়ে গত বছরের নভেম্বরে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিটি। পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে কমিটি ১০ টি সুপারিশ করলেও তার বাস্তবায়নে নীতিমালা প্রণয়ন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকে নজর নেই কর্তৃপক্ষের। আর তাদের অবহেলার সুযোগ নিয়ে যাত্রীদের জিম্মি করে ব্যবসা করে চলেছেন সিটিং সার্ভিস নামধারী পরিবহন ব্যবসায়ীরা। প্রতিবেদনের ব্যাপারে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ বলেন, ‘আমরা সিটিং সার্ভিস চালু রাখার সুপারিশ করেছি। তবে সিটিং ও নন সিটিং গাড়ির রং আলাদা করতে হবে। মানুষ যেন দূর থেকে দেখলেই বুঝতে পারে গাড়ি সিটিং কিনা। পাশাপাশি সিটিং সার্ভিসের ভাড়া ও রুট নির্ধারণ করতে হবে।’ তিনি বলেন, গণপরিবহনের মালিকানা থাকবে চার-পাঁচটি কোম্পানির হাতে। সিটিং সার্ভিসের স্টপেজ আলাদা থাকবে। নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠানো-নামানো যাবে না। এর সঙ্গে ট্রাভেল কার্ডের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে যাত্রী কার্ড রিচার্জ করে বাসে যাতায়াত করতে পারবেন। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগাতে হবে। এতে কেউ নিয়ম ভঙ্গ বা কোনো অপরাধ করলে তাকে শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনা যাবে। এ ছাড়া বিআরটিএর নতুন কিছু ডবল ডেকার নামানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এতে কম গাড়িতে বেশি যাত্রী পরিবহন করা যাবে। তবে ভাড়া কোন রুটে কত হবে তা নির্ধারণ করবে বিআরটিএ। রাজধানীতে সিটিং সার্ভিসের নামে নৈরাজ্য বন্ধ করতে ২০১৭ এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), পরিবহন মালিক সমিতি ও পুলিশের যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। সেই সময় বাস মালিকেরা প্রায় ৪০ শতাংশ বাস বন্ধ করে দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। এরপর পুনরায় সিটিং সার্ভিস চালু করতে বিআরটিএ, মালিক-শ্রমিক, নাগরিক প্রতিনিধি ও পুলিশের সমন্বয়ে আট সদস্যের কমিটি করা হয়।বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ গঠিত ওই কমিটি বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ৭ টি সুপারিশ করে সিটিং সার্ভিস নিয়ে। কিন্তু ১৮ মাসে এসব সুপারিশ আলোর মুখ না দেখায় কমিটির সদস্যরাই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ঢাকায় বাস চলাচলের অনুমতি দেয় এই মেট্রো আরটিসি। এর সভাপতি হলেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার। তার সঙ্গে বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ, সিটি করপোরেশনসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমিতির প্রতিনিধিরা আছেন এই কমিটিতে।এখানেই সুপারিশগুলো আটকে আছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্লাহ, যিনি নিজেও মেট্রো আরটিসির সদস্য।২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি বিআরটিএর একটা বৈঠক হয়। সেখানে বাস মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পক্ষের লোকজন ছিলেন। এ বৈঠকের পর সুপারিশগুলো চূড়ান্ত করে ১৭ এপ্রিল তা মেট্রো আরটিসিতে পাঠানো হয়।তা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।এ ব্যাপারে গণমাধ্যমকে এনায়েত উল্লাহ বলেন, “নির্বাচনের আগে যে মিটিং হয়েছে সেখানেই এটি নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কমিশনার সাহেব বলেছেন- ‘না এটা ইলেকশনের পরে করেন’। আরটিসির চেয়ারম্যান হলেন তিনি। তিনি যদি বলেন নির্বাচনের পরে করবেন তাহলে সেখানে আমাদের কিছু বলার থাকে না। নির্বাচনের পরে এখন পর্যন্ত আর মিটিং হয় নাই।”
মেট্রো আরটিসির সদস্য ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম।তিনি বলেন, “আমরা এ সিদ্ধান্তটা পরে নেব বলেই মন¯ি’র করেছি। সবশেষ যে মিটিং করেছি সেখানেও ওটা আলোচনায় ছিল। কিন্তু আমরা বলেছি, এটা নিয়ে পরে আরও আলোচনা করব।”বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ কমিটি বৈঠক করে কিছু শর্তপূরণের মাধ্যমে রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস রাখার পক্ষে পরামর্শ দেয়। সেই শর্তের মধ্যে ছিলো, রাজধানীতে চলাচলকারী সব পরিবহনকে কিছু কোম্পানির অধীনে চলাচল করতে হবে। প্রতিটি কোম্পানির সিটিং সার্ভিস ও লোকাল পরিবহন থাকবে। এ জন্য (লোকাল ও সিটিং) একই নামে দুটি ভিন্ন রঙের বাস চলবে। সিটিং সার্ভিসে দাঁড়িয়ে যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। এটার স্টপেজ থাকবে সীমিত।
সুপ্রভাত স্পেশাল বাসের যাত্রী আসিক বলেন, আমি সদরঘাট থেকে গাজীপুর যাব। আমার কাছ থেকে সিটিং ভাড়া (৬০ টাকা) নিয়েছে। অথচ তারা লোকাল যাত্রী উঠাচ্ছে একাধিক। প্রতিবাদ করলে আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছে। একই অবস্থা দেখা গেছে আজমেরি গ্লোরী, বিহঙ্গ, মিরপুরই উনাইটেড, তানজিল, ৩ নং স্পেশাল, বন্ধু পরিবহন, রাইদা পরিবহনে। তবে এখনও সর্বনিম্ন ৫ টাকা ভাড়ার প্রচলন রয়েছে ৬ নং বাস, ৭ নং, ৪ নং বাসগুলোতে।সুপ্রভাত স্পেশাল পরিবহনের ড্রাইভার বলেন, আমাদের কোম্পানির সব বাস সিটিং সার্ভিস। লোকাল কোনো বাস নেই। সিটিং সার্ভিসে কেন দাঁড়ানো যাত্রী নেওয়া হচ্ছে এ বিষয়ে বলেন, আমরা না চাইলেও অনেক সময় যাত্রীরা উঠে পড়েন। তাছাড়া বড় বাসের মধ্যে অনেক জায়গা আছে এখানে কিছু লোক দাঁড়ালে তো কেউ অভিযোগ করেন না।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির নাম প্রকাশে আনিছুক বলেন, রাজধানীতে সিটিং সার্ভিসের নামে প্রতারণা দীর্ঘদিনের। এটা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো মাথা ব্যথা নেই। মালিকদের স্বার্থের দিকে সরকারের সমর্থন। সরকার কোনদিনই নির্ধারিত ভাড়ার হার কার্যকর করতে পারেনি। তবে প্রতিটি বাস ২০ শতাংশ খালি সিট নিয়ে চলবে এভাবেই বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে আলাদা সিটিং সার্ভিসের নামে ভাড়া আদায় অযৌক্তিক। যা পরিবহন ও মটরযান আইনে নাই।