৫ বছর বয়সে মুক্তিযোদ্ধা: মিথ্যা পরিচয়ে চাকুরী করেন সাবরেজিস্টার লুৎফর
- আপডেট সময় : ০৪:৫২:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ জুলাই ২০২৫ ৪২৮ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক | সকালের সংবাদ; সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মো. লুৎফর রহমান মোল্লা-কে ঘিরে একের পর এক চাঞ্চল্যকর দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠছে। ১৯৬৬ সালের ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করা এই কর্মকর্তা কীভাবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে “বীর মুক্তিযোদ্ধা” খেতাব পেলেন—এ নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে সরকারি মহলে, গণমাধ্যমে ও সচেতন নাগরিকদের মাঝে।
৫ বছর বয়সে ‘মুক্তিযোদ্ধা’?
লুৎফর রহমান মোল্লার জন্ম সনদ অনুযায়ী তার জন্ম তারিখ ১৯৬৬ সালের জানুয়ারির প্রথম দিন। সেই হিসাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর। অথচ তিনি নিজেকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করে সরকারি চাকরি পান ২০০৯ সালে, মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা নিয়ে। এ ঘটনায় ‘মুক্তিযোদ্ধা’ নামক গৌরবময় পরিচয়ের অপব্যবহার এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
দুর্নীতি, বদলি ও গুলশানের জমি কেলেঙ্কারি
রাজধানীর গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালনের সময় লুৎফর রহমান মোল্লার বিরুদ্ধে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে একটি ১০ তলা ভবনের ২৭টি ফ্ল্যাটকে একত্রে জমির অংশ হিসেবে রেজিস্ট্রি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। এছাড়া আরও বেশ কিছু জমির দলিল রেজিস্ট্রিতে আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য এসেছে নথিপত্র ঘেঁটে।
সাতক্ষীরায় দণ্ডিত, তবু চাকরি বহাল
সাতক্ষীরা সদরে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত থাকাকালে একটি দুর্নীতির মামলায় তার বিরুদ্ধে কারাদণ্ড হয়। সে সময় স্থানীয় গণমাধ্যমে বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলেও তিনি দলীয় প্রভাব ও প্রশাসনিক ছত্রছায়া ব্যবহার করে শাস্তি থেকে কার্যত রেহাই পান।
বদলি হয়ে আবার বিতর্ক
সম্প্রতি একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে লুৎফর রহমান মোল্লাকে ঢাকা উত্তরার পদ থেকে বদলি করে নীলফামারীর জলঢাকায় পাঠানো হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী, তাকে ৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার কথা। তবে অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিতভাবে ঢাকার শান্তিনগরের নিজস্ব বাসা ইস্টার্ন পয়েন্টে বসবাস করেন এবং জলঢাকায় অফিস কার্যক্রম কার্যত এড়িয়ে চলছেন।
চাকরিতে প্রবেশের পেছনে রহস্য
২০০৯ সালের ৭ ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকারের কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ পান লুৎফর রহমান। মামলার একটি রায়ের ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও এর প্রকৃত ভিত্তি ছিল মুক্তিযোদ্ধা কোটার সুবিধা। এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা, যাদের ভাষ্য—সাবালকত্ব না থাকলে কীভাবে কেউ মুক্তিযোদ্ধা হয়?
জাতীয় স্বার্থে জবাবদিহির দাবি;
এই ধরনের জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পদ দখল, রাজস্ব ফাঁকি ও সম্পদ অর্জন সরকারি প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন করছে। এ ঘটনায় তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।
যদি প্রমাণিত হয় যে মো. লুৎফর রহমান মোল্লার মুক্তিযোদ্ধা সনদ জাল ছিল এবং তিনি এর ভিত্তিতে সরকারি চাকরি লাভ করেন, তাহলে তা হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরাসরি অবমাননা এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা।
মো. লুৎফর রহমান মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো শুধু একজন কর্মকর্তার নয়, বরং গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতা ও রাজনৈতিক অপব্যবহারের প্রতিচ্ছবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই বিষয়ে ত্বরিত তদন্ত, সঠিক তথ্য প্রকাশ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি এখন সময়ের দাবি।

























