রূপালী ব্যাংকের এমডি ছিলেন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের প্রভাবশালী নেতা!
- আপডেট সময় : ০৫:৩৮:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫ ৪০৯ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক:
গণআন্দোলনের জোয়ারে টালমাটাল দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যখন প্রশাসনিক পদগুলোতে নিরপেক্ষতার দাবি উঠছে সর্বত্র, তখনই রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ এবং ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’-এর প্রভাবশালী নেতা কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলামকে। এই নিয়োগকে ঘিরে ব্যাংকিং ও প্রশাসনিক মহলে ছড়িয়ে পড়েছে সমালোচনা ও সন্দেহ। স্বৈরাচার বিরোধী জনতার মাঝে নানান প্রশ্নের উদয় হয়েছে।
এমডি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে সরিয়ে দেয়ার পর ৫ আগস্ট পরবর্তী তিন মাস পদটি শূন্য ছিল। তবে, নতুন সরকারের অধীনে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগকে ঘিরে শুরু থেকেই লবিং, দখলদারি, নাটকীয়তা এবং বিতর্কের গল্প শোনা যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, প্রকৌশলী ওয়াহিদুল ইসলামের নিয়োগ সেই জল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিল।
কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম কে?
প্রকৌশলী ওয়াহিদ মূলত চামড়া শিল্প নিয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। সরকারি চাকরি জীবনের শুরুতে তিনি বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)-এ প্রকৌশল পদে যোগ দেন। পরে ধাপে ধাপে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে নিজের অবস্থান সুসংহত করেন।
তিনি ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’-এর সক্রিয় নেতা ছিলেন দীর্ঘদিন। ওই পরিষদের মাধ্যমে সরকারি প্রকৌশলী ও চাকরিজীবীদের মধ্যে আওয়ামী প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা রাখেন বলেও একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
সোনালী ব্যাংকে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) থাকা অবস্থায় ওয়াহিদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ওঠে—শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট একাধিক অনিয়ম, দলীয় পরিচয়ে নিয়োগ ও প্রশ্রয়, এবং উচ্চপদস্থদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার।
নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব: ‘যোগ্যতা নয়, আনুগত্যই মূল’:
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, রূপালী ব্যাংকের এমডি পদের জন্য তালিকাভুক্ত প্রার্থীদের মধ্যে আরও অভিজ্ঞ, যোগ্য এবং স্বচ্ছ পরিচয়ের পেশাদার ব্যাংকাররা ছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে উপর মহলের চাপে কাজী ওয়াহিদকে নির্বাচিত করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এক নির্বাহী পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এমডি পদে রাজনৈতিক পছন্দ ও আনুগত্যই মুখ্য হয়ে উঠেছে। কাজী ওয়াহিদের নিয়োগ তার উজ্জ্বল উদাহরণ।”
এদিকে ওয়াহিদের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারে ‘নির্দিষ্ট গ্রুপকে সহায়তা করা’, অসাধু ঋণ অনুমোদন, এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন গোপন করার মতো গুরুতর অভিযোগ থাকলেও সেগুলো কখনো তদন্ত পর্যায়ে গড়ায়নি। প্রশাসনের নিরব ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পেছনে ‘দলীয় ছত্রচ্ছায়া’?
ওয়াহিদের সোনালী ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে একটি নির্দিষ্ট শিল্প গ্রুপকে একাধিক কিস্তিতে অস্বাভাবিক ঋণ ছাড় করার অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ‘ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি’ চিহ্নিত হলেও, তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মূলত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ব্যাংকিং খাতে লুটপাটের একজন কুশীলব ছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সাবেক ব্যাংকার ও ব্যাংকিং বিশ্লেষক সকালের সংবাদকে বলেন, “তিনি (ওয়াহিদ) যে ঘরানার লোক, সেই ঘরানার পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এই ধরনের পদোন্নতি পাওয়া অসম্ভব। এটা ব্যাংকিং খাতের পেশাদারিত্বের জন্য হুমকি।”
জনগণের প্রতিক্রিয়া: হতাশা ও উদ্বেগ:
জুলাই-আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ‘ব্যক্তিত্ব, সততা ও পেশাদারিত্ব’ নির্ভর নিয়োগ প্রত্যাশা করছিল সাধারণ মানুষ ও ব্যাংকিং সংশ্লিষ্ট মহল। কিন্তু কাজী ওয়াহিদের মতো বিতর্কিত এবং দলীয় আনুগত্যে পরিচিত ব্যক্তির নিয়োগ সেই আশাকে ম্লান করে দিয়েছে।
ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে। অনেকেই বলছেন, “দুর্নীতিবাজদের সরিয়ে নতুন দিগন্তের কথা বলেছিল গণআন্দোলনের নেতৃত্ব, এখন পুরনো খেলোয়াড়রাই যদি ফিরে আসে, তাহলে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি কোথায়?”
বিশ্লেষণ: পেশাদারিত্ব বনাম রাজনৈতিক আনুগত্য:
সরকারি ব্যাংকগুলোতে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার বিষয়। কিন্তু গণআন্দোলন ও সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে এমন একজন বিতর্কিত ব্যাক্তিকে শীর্ষ পদে বসানো শুধু রূপালী ব্যাংকেরই নয়, বরং গোটা ব্যাংকিং খাতের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য হুমকি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও ট্রান্সপারেন্সি: ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) – উভয় সংস্থা থেকেই এ নিয়োগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আশা করা হচ্ছে।
রূপালী ব্যাংকের এমডি পদে কাজী মো. ওয়াহিদের নিয়োগ যেন ক্ষমতার রাজনীতির সেই পুরনো অধ্যায়কে আবার মনে করিয়ে দিল—যেখানে দলীয় আনুগত্যই পদোন্নতির মূল মাপকাঠি। এই নিয়োগ শুধু ব্যাংকিং পেশার ওপর নয়, জনগণের প্রত্যাশা ও ন্যায়বিচারের চেতনাতেও এক ধরনের আঘাত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
![]()

























