ডিএনসিতে ‘অঘোষিত ক্ষমতার কেন্দ্র’ ডিএনসি’র বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা রাহুল সেন- পর্ব ১
- আপডেট সময় : ০৪:২৯:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬ ১১৪ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে (ডিএনসি) একসময় প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত সহকারী পরিচালক রাহুল সেনকে ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নিয়োগ-বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, আলামত গোপন, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার থেকে শুরু করে গণঅভ্যুত্থানবিরোধী অবস্থানের অভিযোগে এখন আলোচনার কেন্দ্রে এই কর্মকর্তা।
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ডিএনসির ভেতরে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন রাহুল সেন। সেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন, বদলি, নিয়োগ ও বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা নিয়ন্ত্রণ করা হতো বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে আলোচনায় এসেছে পঞ্চগড় জেলা কার্যালয়ে রাষ্ট্রীয় শোক দিবসে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত না করার অভিযোগ। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ঘোষিত শোক দিবসে এ ঘটনায় অধিদপ্তরের ভেতরে ব্যাপক গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়।
এদিকে গণঅভ্যুত্থানের সময় ডিএনসির একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে রাহুল সেনের পাঠানো একটি বার্তা নিয়েও সমালোচনা চলছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রো নর্থের অফিসিয়াল গ্রুপে তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ না নিতে অনুরোধ জানান। বিষয়টি নিয়ে অধিদপ্তরের ভেতরে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে পঞ্চগড়ে অভিযান চালিয়ে প্রায় দুই হাজার পিস ট্যাপেনডাটল ট্যাবলেট উদ্ধারের পর জব্দ তালিকায় মাত্র আড়াইশ’ পিস দেখানোর অভিযোগ উঠেছে রাহুল সেনের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এটি আলামত গোপন ও জব্দ প্রক্রিয়ায় কারসাজির গুরুতর উদাহরণ হতে পারে।
এর আগে ঢাকায় কর্মরত থাকাকালেও তাঁর বিরুদ্ধে একাধিকবার মাদক মামলার আলামত বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল বলে দাবি করেছেন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা। তবে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার কারণে এসব অভিযোগ প্রতিবারই ধামাচাপা পড়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি আলোচিত শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম কীভাবে ডিএনসির একটি বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত হন, তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে রাহুল সেনকে ঘিরে নানা তথ্য সামনে আসে।
সূত্র বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন রাহুল সেন। ছাত্ররাজনীতির সেই পরিচয়ের সূত্র ধরেই তিনি চাকরিতে সুপারিশ পান। পরে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিতি পান এবং মন্ত্রীর এপিএস মনিরের সহযোগিতায় ডিএনসির ভেতরে প্রভাবশালী বলয় গড়ে তোলেন।
অভিযোগ রয়েছে, রাহুল সেনের কার্যালয়ে নিয়মিত ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীদের যাতায়াত ছিল। এসব যোগাযোগের মাধ্যমেই চাকরি, পদায়ন ও বিশেষ সুবিধা বণ্টনের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে ডিএনসির একটি বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণের কাজেও এই সিন্ডিকেটের প্রভাব ছিল। “অ্যাপল সফট” নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণের পুরো প্রক্রিয়ায় রাহুল সেন ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের প্রভাব কাজ করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিল্পী ও কলাকুশলী নির্বাচনেও রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
ডিএনসির অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র আরও জানায়, সাবেক মহাপরিচালক মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকী ও রাহুল সেন মিলে স্পটভিত্তিক মাসোহারা আদায়, বদলি ও পদায়নকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী চক্র পরিচালনা করতেন। অধিদপ্তরের ইতিহাসে এমন প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বিরল বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ।
অভিযোগ আছে, গুলশান-১ এলাকার একটি অভিযানে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে সমঝোতায় যান রাহুল সেন। ওই ঘটনায় প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের গুঞ্জন দীর্ঘদিন ধরে ডিএনসির ভেতরে আলোচিত বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
এছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকতেন না এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলা উপেক্ষা করতেন। এসব কারণে অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।
স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক বদলির ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করেও আলোচনায় আসেন রাহুল সেন। সরকারি চাকরিতে বদলি ঠেকাতে একজন কর্মকর্তার এমন পদক্ষেপকে নজিরবিহীন বলছেন ডিএনসির অনেক কর্মকর্তা।
আরও বিস্তারিত থাকছে আগামী পর্বে…..

























