শিক্ষা উন্নয়নের নামে শতকোটি টাকার অনিয়ম: নাটের গুরু তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আখতারুজ্জামান
- আপডেট সময় : ১১:৪০:১৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬ ১১৯ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক:
সরকারি শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের নামে শত শত কোটি টাকার প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম, দরপত্রে কারসাজি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং কাগজে-কলমে বিল উত্তোলনের অভিযোগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা সার্কেলে। অভিযোগের সঙ্গে জড়িত থাকার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ঢাকা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম মো. আখতারুজ্জামান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত কয়েক বছরে রাজধানী ও আশপাশের বিভিন্ন সরকারি কলেজ, স্কুল, কারিগরি প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে শতকোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন করা হলেও এর বড় একটি অংশ নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে নির্দিষ্ট ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
একাধিক কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের দাবি, শুরু থেকেই প্রকল্প পরিকল্পনা ও প্রাক্কলনে ছিল অসঙ্গতি। কাজের প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় বাড়তি অঙ্ক দেখিয়ে অনুমোদন নেওয়া হয়। এরপর সংশোধিত প্রাক্কলনের নামে আবারও বাড়ানো হয় খরচ। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী সুবিধাভোগী চক্র গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে।
এক সাবেক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“সঠিক যাচাই-বাছাই হলে অনেক প্রকল্পের ব্যয় অর্ধেকেও নামানো যেত। কিন্তু সেখানে রহস্যজনক নীরবতা ছিল।”
টেন্ডারে গরমিলের অভিযোগ:
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, সীমিত প্রচারে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রতিযোগিতা কমিয়ে আনা হয়। পরে টেকনিক্যাল মূল্যায়নের নামে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন,
“যোগ্যতা থাকার পরও নানা অজুহাতে আমাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। পরে দেখা গেছে আগে থেকেই ঠিক করা প্রতিষ্ঠানই কাজ পেয়েছে।”
যদিও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একটি সূত্র দাবি করেছে, সব টেন্ডার সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয়েছে।
নতুন ভবনে ফাটল, নিম্নমানের কাজের অভিযোগ:
সরেজমিনে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা গেছে, নতুন নির্মিত ভবনের দেয়ালে ফাটল, ছাদে পানি জমে থাকা এবং নিম্নমানের রড-সিমেন্ট ব্যবহারের অভিযোগ। কিছু ভবন উদ্বোধনের কয়েক মাসের মধ্যেই মেরামতের প্রয়োজন পড়েছে।
এক কলেজ অধ্যক্ষ সকালের সংবাদকে বলেন, “কাজ শেষ হওয়ার পর অল্প সময়েই ত্রুটি দেখা দেয়। বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছি।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদারকিতে গাফিলতি থাকলে নিম্নমানের নির্মাণকাজ সহজেই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রীয় অর্থ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ।
‘কাজ কম, বিল বেশি’:
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মচারীর দাবি, বাস্তব অগ্রগতির তুলনায় অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে যাচাই ছাড়াই বিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, “কাগজপত্রের ভিত্তিতেই অনেক বিল ছাড় হয়েছে। বাস্তবে কাজের অগ্রগতি কতটুকু, তা সবসময় যাচাই হয়নি।”
যদিও এসব অভিযোগের আনুষ্ঠানিক তদন্ত এখনো হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তীব্র আকার ধারণ করেছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের নিখুঁত তদন্ত দাবি:
সুশাসন বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা সার্কেলের প্রকল্পগুলোতে স্বাধীন তদন্ত জরুরি। তাদের মতে, অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত।
এদিকে নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, বিষয়টি নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।
শিক্ষা খাতের উন্নয়নের নামে বরাদ্দ হওয়া সরকারি অর্থ নিয়ে যদি অনিয়মের অভিযোগই বারবার উঠে আসে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই— ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বরাদ্দ এই অর্থ কার স্বার্থে ব্যয় হচ্ছে? এখন সবার চোখ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দিকে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল কালাম মো. আখতারুজ্জামান সকালের সংবাদকে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কোন বিল দেন না, অর্থাৎ বিল প্রদানের ক্ষমতা রাখেন কেবল নির্বাহী প্রকৌশলী। কোন দরপত্রের মুল্য বাড়ানোর ক্ষমতা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর নাই। আমার বক্তব্য সঠিক কিনা তা যাচাই করতে পারেন।

























