ঢাকা ০৩:১৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo কুকুর উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পাঠাতে জ্বালানি খরচের দাবি, ৩ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার Logo সরকারি কর্মচারীদের ‘গোলামি’ ও অঢেল সম্পদের পাহাড়: বেরিয়ে আসছে সদ্য বিদায়ী ডিজি জায়েদ কামালের থলের বিড়াল  Logo ফায়ার সার্ভিসের বদলি নীতিমালায় বড় পরিবর্তন: কর্মীরা পাবেন নিজ জেলায় কাজের সুযোগ Logo তৈরি পোশাকশ্রমিকদের জন্য মজুরি বোর্ড গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার Logo সিডিবিএল চালু করবে মোবাইল অ্যাপ Logo দেশবিরোধী চক্রান্তের কাছে জাতীয়তাবাদী শক্তি আত্মসমর্পণ করবে না : রিজভী Logo গঙ্গা চুক্তি নবায়ন নয়, নতুন চুক্তি চায় এনসিপি: নাহিদ ইসলাম Logo ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের কল্যাণে কাজ করছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী Logo ফের মা হতে চলেছেন কিয়ারা Logo মানবতাবিরোধী অপরাধ : হানিফসহ ৪ আ. লীগ নেতার রায় যেকোনো দিন

কোনদিন পাঠদান হয়নি অথচ এমপিওভুক্তি হয়েছে স্কুল

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৩৮:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ ৩১৩ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক;  

যে স্কুলে কোনদিন পাঠদান করানো হয়নি অথচ এমপিওভুক্তি হয়েছে, ওই স্কুলের নামে প্রতিমাসে বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় দেড়লাখ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে।

শিক্ষার্থী বিহীন এই স্কুলটি ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নে। স্কুলের নাম ‘পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’। যদিও স্থানীয়রা বলেন ‘আবুর স্কুল’। স্কুলে শিক্ষক ও কর্মচারি রয়েছেন আটজন।

অভিযোগ রয়েছে, স্কুলটিতে পাঠদান কার্যক্রম না থাকলেও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর চলছে বেতন-ভাতা উত্তোলন ও তা ভাগ বাটোয়ারা। শুধু তাই নয়, বিদ্যালয়টি অন্যের জায়গা দখল করে তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, ১৯৮৬ সালে নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন আবু বকর নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি। এরপর ১৯৯৫ সালে এমপিওভুক্ত হয়। স্থানীয়রা স্কুলটিকে ‘আবুর স্কুল’ নামেই চেনেন। আবু বকর বর্তমানে ওই বিদ্যালয়ে একজন সহকারি শিক্ষক। তার মেয়ে মুনমুন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, স্ত্রী নার্গিস বেগম অফিস সহকারি ও শ্যালিকা জাহানারা বেগম দপ্তরী। প্রতিষ্ঠার ৩৩ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনদিন এই বিদ্যালয়ে পাঠদান করানো হয়নি। তবে কাগজে কলমে ভুয়া নাম দিয়ে ছাত্র-ছাত্রী দেখানো হয়। আর কর্মকর্তারা পরিদর্শনে আসলে, বছরে এক অথবা দুই দিন বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখা যায়। এ ছাড়া সারা বছরই বিদ্যালয়টি তালাবদ্ধ থাকে।

সরেজমিনে গেলে রোববার (১৭ নভেম্বর) বেলা ১১টায় বিদ্যালয়টির অফিস ও শ্রেণিকক্ষে তালা ঝুলতে দেখা যায়। জাতীয় পতাকাটি অফিস কক্ষের বারান্দায় হেলানো অবস্থায় ছিলো। শ্রেণিকক্ষগুলোতে ধুলাময় চেয়ার-টেবিল ও কিছু বেঞ্চ থাকলেও তা ব্যবহৃত হয়নি অনেকদিন।

স্থানীয় বাবলু হাওলাদার বলেন, ‘আমার জন্মের পর থেকেই বিদ্যালয়টি দেখছি। তবে কোনদিন এখানে পাঠদান হতে দেখিনি। এ অনিয়মের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় মানুষ প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু প্রতিবাদ করা প্রত্যেকেই আবু ও তার ছেলেদের হামলার শিকার হয়েছেন। তাদের জড়ানো হয়েছে একাধিক মিথ্যা মামলায়। তাই এখন কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে চাননা।’

বাবলুর সাথে কথা বলতে বলতেই বিদ্যালয়ের পেছনে থাকা বাড়ির ভেতর থেকে খালি পায়ে এলোমেলো অবস্থায় এসে হাজির হন আবু বকরের স্ত্রী অফিস সহকারি নার্গিস বেগম। এরপরেই আসেন বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়া একমাত্র শিক্ষক অরুণা মৈত্র। তিনি নাকি কৃষি শিক্ষা পড়ান। বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা কেউ আসেনি। আর অন্য শিক্ষকরা রাজাপুরে আছেন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক আখতারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, ‘বিদ্যালয়টি থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করছি। স্থানীয় মানুষের সাথে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতার দূরত্বের কারণেই শিক্ষার্থী পাওয়া যায়না।’

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এমডি আবুল বাসার তালুকদার বলেন, ‘বিদ্যালয়টি আমি পরিদর্শন করেছি। চিঠি দিয়ে যাওয়ার পরেও মাত্র চার-পাঁচজন শিক্ষার্থী পেয়েছি।’

এ অনিয়মের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিয়েছেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘দাদারে ওদের (শিক্ষক-কর্মচারি) পেটে লাথি মেরে কি লাভ। তবে ওদের বলেছি, আগামী জানুয়ারি থেকে তিন শ্রেণিতে যদি কমপক্ষে ৭৫জন শিক্ষার্থী না থাকে, তাহলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করবো।’

এ বিষয়ে ইউএনও মো. সোহাগ হাওলাদার বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ থাকায় উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা ইমরান শাহরিয়ারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। সেই কমিটি অনিয়মের সত্যতা পেয়ে বিদ্যালয়ের এমপিও বাতিলের সুপারিশ করে। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের জমির বিষয়ে সম্প্রতি একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি যা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
error: Content is protected !!

কোনদিন পাঠদান হয়নি অথচ এমপিওভুক্তি হয়েছে স্কুল

আপডেট সময় : ০১:৩৮:৪৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক;  

যে স্কুলে কোনদিন পাঠদান করানো হয়নি অথচ এমপিওভুক্তি হয়েছে, ওই স্কুলের নামে প্রতিমাসে বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় দেড়লাখ টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে।

শিক্ষার্থী বিহীন এই স্কুলটি ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার মঠবাড়ি ইউনিয়নে। স্কুলের নাম ‘পশ্চিম বাদুরতলা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’। যদিও স্থানীয়রা বলেন ‘আবুর স্কুল’। স্কুলে শিক্ষক ও কর্মচারি রয়েছেন আটজন।

অভিযোগ রয়েছে, স্কুলটিতে পাঠদান কার্যক্রম না থাকলেও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে বছরের পর বছর চলছে বেতন-ভাতা উত্তোলন ও তা ভাগ বাটোয়ারা। শুধু তাই নয়, বিদ্যালয়টি অন্যের জায়গা দখল করে তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়রা জানায়, ১৯৮৬ সালে নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন আবু বকর নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি। এরপর ১৯৯৫ সালে এমপিওভুক্ত হয়। স্থানীয়রা স্কুলটিকে ‘আবুর স্কুল’ নামেই চেনেন। আবু বকর বর্তমানে ওই বিদ্যালয়ে একজন সহকারি শিক্ষক। তার মেয়ে মুনমুন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, স্ত্রী নার্গিস বেগম অফিস সহকারি ও শ্যালিকা জাহানারা বেগম দপ্তরী। প্রতিষ্ঠার ৩৩ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনদিন এই বিদ্যালয়ে পাঠদান করানো হয়নি। তবে কাগজে কলমে ভুয়া নাম দিয়ে ছাত্র-ছাত্রী দেখানো হয়। আর কর্মকর্তারা পরিদর্শনে আসলে, বছরে এক অথবা দুই দিন বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখা যায়। এ ছাড়া সারা বছরই বিদ্যালয়টি তালাবদ্ধ থাকে।

সরেজমিনে গেলে রোববার (১৭ নভেম্বর) বেলা ১১টায় বিদ্যালয়টির অফিস ও শ্রেণিকক্ষে তালা ঝুলতে দেখা যায়। জাতীয় পতাকাটি অফিস কক্ষের বারান্দায় হেলানো অবস্থায় ছিলো। শ্রেণিকক্ষগুলোতে ধুলাময় চেয়ার-টেবিল ও কিছু বেঞ্চ থাকলেও তা ব্যবহৃত হয়নি অনেকদিন।

স্থানীয় বাবলু হাওলাদার বলেন, ‘আমার জন্মের পর থেকেই বিদ্যালয়টি দেখছি। তবে কোনদিন এখানে পাঠদান হতে দেখিনি। এ অনিয়মের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় মানুষ প্রতিবাদ করেছিল। কিন্তু প্রতিবাদ করা প্রত্যেকেই আবু ও তার ছেলেদের হামলার শিকার হয়েছেন। তাদের জড়ানো হয়েছে একাধিক মিথ্যা মামলায়। তাই এখন কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে চাননা।’

বাবলুর সাথে কথা বলতে বলতেই বিদ্যালয়ের পেছনে থাকা বাড়ির ভেতর থেকে খালি পায়ে এলোমেলো অবস্থায় এসে হাজির হন আবু বকরের স্ত্রী অফিস সহকারি নার্গিস বেগম। এরপরেই আসেন বিদ্যালয়ে উপস্থিত হওয়া একমাত্র শিক্ষক অরুণা মৈত্র। তিনি নাকি কৃষি শিক্ষা পড়ান। বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা কেউ আসেনি। আর অন্য শিক্ষকরা রাজাপুরে আছেন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক আখতারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, ‘বিদ্যালয়টি থেকে অন্যত্র চলে যাওয়ার চেষ্টা করছি। স্থানীয় মানুষের সাথে বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতার দূরত্বের কারণেই শিক্ষার্থী পাওয়া যায়না।’

এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এমডি আবুল বাসার তালুকদার বলেন, ‘বিদ্যালয়টি আমি পরিদর্শন করেছি। চিঠি দিয়ে যাওয়ার পরেও মাত্র চার-পাঁচজন শিক্ষার্থী পেয়েছি।’

এ অনিয়মের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিয়েছেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘দাদারে ওদের (শিক্ষক-কর্মচারি) পেটে লাথি মেরে কি লাভ। তবে ওদের বলেছি, আগামী জানুয়ারি থেকে তিন শ্রেণিতে যদি কমপক্ষে ৭৫জন শিক্ষার্থী না থাকে, তাহলে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করবো।’

এ বিষয়ে ইউএনও মো. সোহাগ হাওলাদার বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ থাকায় উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা ইমরান শাহরিয়ারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। সেই কমিটি অনিয়মের সত্যতা পেয়ে বিদ্যালয়ের এমপিও বাতিলের সুপারিশ করে। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের জমির বিষয়ে সম্প্রতি একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি যা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’