নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকার বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, তবে খোলস বদলে অবলীলায় নিজেদের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখে একশ্রেণীর সুযোগসন্ধানী চক্র। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে পুঁজি করে ঢাকা ওয়াসায় এমনই এক অদম্য প্রভাব খাটিয়ে যাচ্ছেন উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) হাজী মো. এনায়েত করিম। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এককালের সাধারণ কেরানী থেকে রাজস্ব কর্মকর্তা বনে যাওয়া এই ব্যক্তি ৫ আগস্টের পর নতুন রূপ ধারণ করে বাগিয়ে নিয়েছেন ওয়াসার ৬ নম্বর রাজস্ব অঞ্চলের উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার পদ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা ওয়াসের ড্রেনেজ বিভাগের অ্যাডহক ভিত্তিক ইউডিএ (উচ্চমান সহকারী) অর্থাৎ একজন সাধারণ কেরানী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন মো. এনায়েত করিম। কিন্তু দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক লবিং, তদবির এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেটের ওপর ভর করে তিনি একের পর এক পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। ওয়াসা শ্রমিক ইউনিয়ন (লীগ-২৫২২)-এর সভাপতি ও কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি হাফিজ উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত এনায়েত করিম প্রথমে জোন-১০-এ ফিল্ড অফিসার এবং পরবর্তীতে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে পিপিআই জোন-৯-এর প্রজেক্ট ম্যানেজার পদ হাতিয়ে নেন। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত তাঁর দাপ্তরিক টেবিলে প্রদর্শিত হতো ক্ষমতাসীন দলের প্রতীক 'নৌকা' সংবলিত ক্রেস্ট।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম মোজাম্মেল হকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এনায়েত করিম। প্রশাসনিক নিয়মনীতি পেছনে ফেলে মন্ত্রীদের সঙ্গে ছবি তোলা ও সখ্য তুলে ধরেই তিনি একের পর এক পদোন্নতি নিশ্চিত করেন। ওয়াসার এক ভুক্তভোগী কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা যারা সারাজীবন সততার সঙ্গে চাকরি করেছি, তারা যোগ্য পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছি। অন্যদিকে এনায়েত করিম প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতাদের ছবি ভাঙিয়ে পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।"
তবে গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তাঁর ভাগ্যচক্রে পতন তো দূরে থাক, উল্টো নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজের খোলস বদলে ফেলেন এনায়েত করিম। বর্তমানে বিএনপি হাইকমান্ডের সাথে লিয়াজোঁ রক্ষা করে এবং দলটির কিছু প্রভাবশালী নেতার সাথে সম্পর্ক তৈরি করে নিজের অবস্থান আরও পাকাপোক্ত করেছেন। আর এই নতুন রাজনৈতিক আশীর্বাদ কাজে লাগিয়েই তিনি ভাগিয়ে নিয়েছেন ঢাকা ওয়াসের ৬ নম্বর রাজস্ব অঞ্চলের উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার (চলতি দায়িত্ব) পদ।
বর্তমানে ৬ নম্বর রাজস্ব অঞ্চলকে নিজের ‘দুর্নীতির সাম্রাজ্য’ বানিয়ে ফেলেছেন এই কর্মকর্তা। তাঁর নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত 'কোড বাণিজ্য' ও 'সাইড বাণিজ্য'-এর মাধ্যমে তিনি নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, দাপ্তরিক ক্ষমতার দম্ভে তিনি সাবেক রেল ও সড়ক প্রতিমন্ত্রী জনাব হাবিবুর রশিদ হাবিব এমপির সঙ্গেও চরম দুর্ব্যবহার করেন। এই ঘটনার পর তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বদলি ও ওএসডি করার নির্দেশ দেওয়া হলেও, অদৃশ্য প্রভাব খাটিয়ে করে তিনি তা ঠেকিয়ে দেন এবং পুনরায় একই পদে বহাল থাকেন।
একজন সাধারণ কেরানী কীভাবে কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন, তা নিয়ে এখন ওয়াসার প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিরপুর ডিওএইচএস (DOHS)-এ কোটি টাকা মূল্যের নিজস্ব আলিশান ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন এনায়েত করিম। এছাড়া উত্তরা, মিরপুর, ধানমন্ডিসহ রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তাঁর একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লটের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাঁর নিজ জেলা টাঙ্গাইলেও নামে-বেনামে রয়েছে বিপুল পরিমাণ জমি ও স্থাবর সম্পত্তি।
ঢাকা ওয়াসের সৎ কর্মকর্তা ও কর্মীরা দ্রুত এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার পদোন্নতির নথি পুনঃতদন্ত, অবৈধ সম্পদের হিসাব গ্রহণ এবং ৬ নম্বর রাজস্ব অঞ্চলের যাবতীয় বাণিজ্যের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য গ্রহণের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
(এ বিষয়ে ওয়াসার ভেতরের আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য ও নথিপত্র নিয়ে আসছে দ্বিতীয় পর্ব...)