বিশেষ প্রতিবেদক:
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সদ্য বিদায়ী মহাপরিচালক (ডিজি) জায়েদ কামালের বিরুদ্ধে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য বেরিয়ে আসছে। ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে ‘গোলাম’ হিসেবে ব্যবহার, প্রিয় ড্রাইভারের পেছনে সরকারি প্রায় ৬০ লাখ টাকা অপচয় এবং বসুন্ধরা-পূর্বাচলসহ বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় কোটি কোটি টাকার গোপন সম্পদের নথিপত্র প্রকাশ্যে আসায় দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
১৫ সরকারি কর্মচারীকে ‘গোলাম’ বানিয়ে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার:
অনুসন্ধানে জানা যায়, মহাপরিচালকের চেয়ারে থাকাকালে জায়েদ কামাল সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ফায়ার সার্ভিসের ১৫ জন সরকারি কর্মচারীকে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে নিজের বাসায় ও ব্যক্তিগত কাজে নিয়োজিত রেখেছিলেন। দাপ্তরিক কাজের পরিবর্তে তাদের দিয়ে বাসার যাবতীয় ব্যক্তিগত কাজ করানো হতো, যা রীতিমতো মধ্যযুগীয় ‘গোলামি’র শামিল।
ব্যক্তিগত কাজে নিয়োজিত এই বিশাল বহরে ছিলেন ৫ জন ড্রাইভার, ২ জন বাবুর্চি, ২ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী এবং ৪ জন রানার। এছাড়া সরকারি সুযোগ-সুবিধার বাইরে তিনি ব্যক্তিগত কাজে চারটি সরকারি গাড়ি সার্বক্ষণিক ব্যবহার করতেন।
ড্রাইভারের রাজত্ব ও ৬০ লাখ টাকার রাজকীয় বাসভবন
জায়েদ কামালের ক্ষমতার অপব্যবহারের অন্যতম প্রধান সহযোগী ও চালিকাশক্তি ছিলেন ড্রাইভার জাহিদ শেখ। ফরিদপুরের বাসিন্দা জাহিদ শেখ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ পরিবারের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ফায়ার সার্ভিস অধিদপ্তরে টানা ১১ বছর একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।
কথিত রয়েছে, ফায়ার সার্ভিসের বিগত দুটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার যাবতীয় অনৈতিক দেনদরবার ও লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে এই ড্রাইভার জাহিদ শেখ এবং তার সহযোগী ৩ জন ড্রাইভারের মাধ্যমে। সাবেক ডিজি মঈন উদ্দিন এই বিতর্কিত ড্রাইভারকে সরিয়ে দিলেও জায়েদ কামাল মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই তাকে পুনরায় কাছে টেনে নেন।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বিদায়ী মহাপরিচালক জায়েদ কামাল ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এই ড্রাইভার জাহিদ শেখের জন্য সরকারি কোষাগারের প্রায় ৬০ লাখ টাকা খরচ করে কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনের পেছনে একটি বিলাসবহুল আধাপাকা বাড়ি সাজিয়ে দিয়েছেন। একজন সাধারণ গাড়িচালকের পেছনে সরকারি অর্থ পানির মতো ঢেলে রাজকীয় আবাস বানিয়ে দেওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—এই ড্রাইভারের সঙ্গে তার কী গভীর গোপন সম্পর্ক ছিল? উল্লেখ্য, ডিজিকে ব্যবহার করে অর্জিত অর্থ দিয়ে নিজের এলাকায় এক বিশাল গরুর ফার্মও গড়ে তুলেছেন ওই ড্রাইভার।
সাংবাদিক নির্যাতন ও রাজনৈতিক তোষামোদ
ফায়ার সার্ভিসে থাকাকালে জায়েদ কামাল প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের চারপাশে ভিড়িয়েছিলেন এবং প্রকাশ্যেই নানা দুর্নীতিবাজদের সুরক্ষা দিতেন। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মুখোমুখি হলে তিনি গণমাধ্যমকে তোয়াক্কা করতেন না। তার অনিয়ম ও দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করায় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিক হাফিজুর রহমান শফিককে অধীনস্থ কর্মচারীদের মাধ্যমে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে গ্রেফতার করান এবং জেল খাটান। সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে সংবাদকর্মীকে হয়রানির এই ঘটনায় সমগ্র সাংবাদিক সমাজে জায়েদ কামালের প্রতি চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল।
নথিতে ভেসে ওঠা স্থাবর সম্পদের পাহাড়
সরকারি জনবল অপব্যবহারের পাশাপাশি জায়েদ কামালের বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের নথিপত্রও এখন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। প্রাপ্ত নথি পর্যালোচনা করে যেসব স্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে:
১. জোয়ার সাহারা (বসুন্ধরা-সংলগ্ন এলাকা): ২০১৬-১০০৫১৭ নম্বর জোতে, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে সম্পাদিত ৯৬৮০ নম্বর দলিলের আওতায় ০.৪৯০১ একর জমির ওপর ১,১০০ বর্গফুটের একটি সুসজ্জিত ফ্ল্যাট ও কার পার্কিং।
২. ডুমনি মৌজা (১ম দাগ): ৬/১৯ নম্বর জোতে ৪.৯৫ শতক জমি (যা নথিতে চারজনের যৌথ মালিকানায় দর্শানো হয়েছে)।
৩. ডুমনি মৌজা (২য় দাগ): ১৪৩০/১৯ নম্বর জোতে আরও ৪.৯৫ শতক জমি (এটিও যৌথ মালিকানাধীন)।
৪. পূর্বাচল (কুতুবপুর মৌজা): ছোলমাই ভূমি অফিসের অধীন ৪৫৮৬ নম্বর জোতে ৪.৯৫ শতক জমির একটি মূল্যবান প্লট।
৫. রূপগঞ্জ (নাওড়া মৌজা): ৯৯৭৬ নম্বর জোতে ৮.২৬ শতক জমি।
উৎস নিয়ে তুলকালাম, সুষ্ঠু তদন্তের দাবি
একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদার সরকারি বেতন-ভাতা এবং পুরো চাকরিজীবনের বৈধ ও ঘোষিত আয়ের সঙ্গে মেলালে এই বিপুল স্থাবর সম্পদ ও বিলাসী জীবনযাত্রার হিসাব কোনোভাবেই মেলে না। সচেতন মহল ও সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, উল্লেখিত জমি ও ফ্ল্যাটের প্রকৃত বাজারমূল্য এবং ক্রয়ের সময়কাল পর্যালোচনা করলে থলের আসল বিড়াল বেরিয়ে আসবে।
রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ লুটপাট, সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কর্মচারীদের দিয়ে ব্যক্তিগত গোলামি করানোর মতো গুরুতর অপরাধের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজ ও ফায়ার সার্ভিস সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
চলবে.....