নিজস্ব প্রতিবেদক: গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে টেন্ডার অনিয়ম, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, বেনামি ব্যবসা, প্রকল্পে পক্ষপাতমূলক কার্যাদেশ প্রদান এবং সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠলেও প্রভাবশালী রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের কয়েকজন ঠিকাদার ও স্থানীয় সূত্র।
অভিযোগ রয়েছে, কুষ্টিয়ায় দায়িত্ব পালনকালে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবউল আলম হানিফ এবং তার ঘনিষ্ঠজন আতাউর রহমান আতার প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পগুলোতে একটি বিশেষ সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ প্রদান এবং কমিশনভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
সূত্রমতে, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নতুন সার্কিট হাউস, মডেল মসজিদসহ একাধিক বড় প্রকল্পে দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কয়েকটি ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দরদাতাদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি দরদাতা প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন।
বিশেষ করে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লিফট স্থাপনসংক্রান্ত একাধিক প্যাকেজে সর্বনিম্ন দরদাতাদের উপেক্ষা করে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ উঠে। সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কয়েকটি টেন্ডারে দরপত্র মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ প্রদানের মধ্যে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করা হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই সময়টুকু ব্যবহার করা হয়েছে দরপত্র প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার জন্য।
এছাড়া রাস্তা, ড্রেন, পুকুর খননসহ আনুষঙ্গিক কাজের ক্ষেত্রেও পছন্দের ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লিখিত অভিযোগ দিলেও সেসবের কার্যকর নিষ্পত্তি হয়নি বলে জানা গেছে।
অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে অনিয়ম। কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের বিভিন্ন মেরামত ও সংস্কার প্রকল্পে একই ধরনের কাজ বারবার দেখিয়ে পৃথক দরপত্র আহ্বান, ওভারল্যাপিং প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জজ কোর্ট, সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থাপনায় একই অর্থবছরে একাধিকবার কাজ দেখিয়ে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
কুষ্টিয়া ডিসি কোর্ট চত্বরে নির্মিত একটি সাবস্টেশন ভবনের যন্ত্রপাতি গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় সরেজমিন যাচাই ছাড়াই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। পরে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে নতুন করে যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ শুরু হয়, যা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, জাহিদুল ইসলামের ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরির পাশাপাশি বেনামি ঠিকাদারি ব্যবসা ও প্রভাব খাটিয়ে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। খুলনায় বহুতল বাড়ি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা, ঢাকায় বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টসহ নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদের তথ্য অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন এলাকায় বদলি হলেও তিনি নতুন নতুন ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। যশোর অঞ্চলেও তার ঘনিষ্ঠ কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একই ধরনের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম। তার দাবি, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি বলেন, সরকারি বিধি-বিধান অনুসরণ করেই সব কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং ব্যক্তিগতভাবে কোনো অনিয়মের সঙ্গে তিনি জড়িত নন।
এদিকে, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর আর্থিক ও কারিগরি নিরীক্ষার দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের ঠিকাদার, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এবং দুর্নীতি পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।