নিজস্ব প্রতিবেদক: বিদেশগামী শ্রমিকদের হয়রানি, নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, ঘুষ, কমিশন সিন্ডিকেট এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. মাসুদ রানা-এর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তার অবৈধ সম্পদের বিস্তৃতি এখন দেশ ছাড়িয়ে মালয়েশিয়া ও দুবাই পর্যন্ত পৌঁছেছে।
সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে জমা পড়া এক লিখিত অভিযোগে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। অভিযোগটি দিয়েছেন মো. মন্টু মিয়া নামের এক ব্যক্তি। অভিযোগের পর থেকেই জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর ভেতরে-বাইরে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশগামী শ্রমিকদের ফাইল আটকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন মাসুদ রানা। প্রশাসনের দায়িত্বে থেকেও তিনি বিদেশগামী কর্মীদের নানা প্রশাসনিক জটিলতায় ফেলে ঘুষ আদায় করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া সারাদেশের বিভিন্ন টিটিসির অধ্যক্ষ ও কর্মকর্তাদের ঢাকায় ডেকে এনে গোপন বৈঠকের মাধ্যমে বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণ করতেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব বৈঠকের অধিকাংশ সময়ই তার কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকত এবং পরবর্তীতে ‘পছন্দমতো’ বদলির আদেশ জারি হতো।
অভিযোগকারীর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের আশীর্বাদে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হন মাসুদ রানা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও নানা মহলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন তিনি। জনশক্তি ব্যুরোর ভেতরে অনেকে তাকে “অঘোষিত ডিজি” হিসেবেও আখ্যা দেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নতুন কোনো মহাপরিচালক দায়িত্বে এলেও তাকে নিজের প্রভাব বলয়ে পরিচালনা করতেন মাসুদ রানা। অর্থ ও তদবিরের মাধ্যমে প্রশাসনের ভেতরে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তার বিরুদ্ধে ওঠা সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ অবৈধ সম্পদ অর্জন নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, নিকেতন ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। উত্তরা এলাকায় রয়েছে দুটি বাড়ি, সাভারে কয়েক বিঘা জমি এবং নেত্রকোনার গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল বাড়ি ও বিপুল জমির মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে।
শুধু দেশেই নয়, অভিযোগ রয়েছে বিদেশেও গড়ে তুলেছেন সম্পদের সাম্রাজ্য। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, মালয়েশিয়ায় “মালয়েশিয়া মাই সেকেন্ড হোম” সুবিধার আওতায় তার সম্পদ রয়েছে। পাশাপাশি দুবাইয়ে এক রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকের সঙ্গে যৌথভাবে জনশক্তি ব্যবসা, ভিলা এবং স্বর্ণ ব্যবসায় জড়িত থাকার অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে তার জীবনযাত্রার কোনো মিল নেই। পরিবারের সদস্যরা বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন এবং ব্যবহার করেন একাধিক দামি গাড়ি।
জনশক্তি ব্যুরোর একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, মাসুদ রানার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের সন্ধান মিলতে পারে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে রাজনৈতিক পরিচয় বদলের চেষ্টা করছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মো. মাসুদ রানা-এর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেননি।
অভিযোগকারীদের দাবি, দ্রুত সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মাসুদ রানার অবৈধ সম্পদ, বিদেশি বিনিয়োগ এবং দুর্নীতির নেপথ্যের সিন্ডিকেট উন্মোচন করা হোক।
“পরবর্তী পর্বে” থাকছে নিয়োগ বাণিজ্য, বিদেশগামী শ্রমিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং বদলি সিন্ডিকেটের আরও বিস্ফোরক তথ্য।
চলবে.....