স্টাফ রিপোর্টার: সরকারি প্রকল্পে কাজ না করেই কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলন, ভুয়া প্রত্যয়নপত্র তৈরি, কমিশন বাণিজ্য, নিয়োগ জালিয়াতি এবং প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগ-৮ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু তালেব-এর বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ নিয়ে ইতোমধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া এক লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই আবু তালেব নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে ক্ষমতার বলয় গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়েও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে ক্যাডার পরিচয়ে চাকরি বাগিয়ে নেন তিনি। পরে জ্যেষ্ঠতা জালিয়াতির মাধ্যমে ২৭তম বিসিএস কর্মকর্তাদেরও টপকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি নেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একজন নন-ক্যাডার কর্মকর্তার এভাবে প্রভাব খাটিয়ে ক্যাডার সুবিধা ভোগ করা গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভিন্ন উন্নয়ন ও মেরামত প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম করেন আবু তালেব। নিয়ম অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পুরো বিল উত্তোলন করা হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তত ১৬টি প্রকল্পে কোনো কাজ না করেই প্রায় ৫ কোটি ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে Kurmitola General Hospital-এ ১ কোটি ১৩ লাখ টাকার কাজ, National Institute of Ophthalmology-এ ৫৬ লাখ ৩০ হাজার টাকার কাজ এবং ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটে ৩৬ লাখ ১২ হাজার টাকার মেরামত প্রকল্প। অভিযোগ অনুযায়ী, কাগজে-কলমে কাজ শেষ দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক জায়গায় কোনো সংস্কার কাজই হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অনিয়ম আড়াল করতে ‘ব্যাকডেটেড’ বা পূর্বের তারিখ দেখিয়ে ভুয়া প্রত্যয়নপত্র তৈরি করা হয়েছে। সরকারি ক্রয় আইন ও দণ্ডবিধি লঙ্ঘন করে অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করেই এসব নথি তৈরি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
গণপূর্তের ভেতরে আবু তালেবকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী ‘কমিশন সিন্ডিকেট’। অভিযোগ অনুযায়ী, কোনো প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুমোদনের আগেই ১০ শতাংশ কমিশন নিশ্চিত করা হয়। তার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার সিন্ডিকেটের বাইরে কেউ কাজ পায় না বলেও অভিযোগ করেছেন প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার আমিনুল ইসলাম।
অভিযোগকারীদের দাবি, আবু তালেবের দুর্নীতির কারণে সৎ ঠিকাদাররা কাজ থেকে ছিটকে পড়ছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছেন।
এদিকে বৈধ আয়ের তুলনায় বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে এই নির্বাহী প্রকৌশলীকে ঘিরে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় তার নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট ও বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে এসব সম্পদের উৎস অনুসন্ধান শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে আবু তালেবকে সাময়িক বরখাস্ত, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং দ্রুত তদন্ত শুরুর দাবি জানানো হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মো. আবু তালেব। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
অন্যদিকে মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরে টেন্ডার সিন্ডিকেট, কমিশন বাণিজ্য ও ভুয়া বিলের অভিযোগ নতুন নয়। তবে আবু তালেবের বিরুদ্ধে ওঠা সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোকে ‘দুর্নীতির ভয়াবহ উদাহরণ’ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হলে গণপূর্তের অন্ধকার জগতের আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।