নিজস্ব প্রতিবেদক:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের শীর্ষ পদে পরিবর্তন এবং এর পরবর্তী বদলি কার্যক্রমকে ঘিরে দপ্তরজুড়ে আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ২৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে দীর্ঘদিন চলতি দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারকে সরিয়ে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (রিজার্ভ) পদে সংযুক্ত করা হয়। একই প্রজ্ঞাপনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (মেট্টো জোন) খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গ্রেডেশন তালিকায় তার আগে একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও পাঁচজনকে ডিঙ্গিয়ে তাকে রুটিন দায়িত্ব দেওয়ায় প্রকৌশলীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কর্মকর্তাদের কেউ কেউ বলছেন, অতীতেও জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে চলতি দায়িত্ব দেওয়ার নজির ছিল যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বর্তমান প্রধান প্রকৌশলীকে ঘিরে অতীতের বিভিন্ন অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই গণপূর্ত অধিদপ্তরে ব্যাপক বদলি কার্যক্রম শুরু করেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী। দপ্তরের একাধিক সূত্রের দাবি, এসব পদায়নের অধিকাংশই ছিল তথাকথিত ‘প্রাইজ পোস্টিং’। প্রতিবেদকের হাতে এমন অন্তত ৬৫ জন কর্মকর্তার একটি তালিকাও এসেছে।
সূত্র মতে, ‘গ্রিন কোজি কটেজ’ বিতর্ক—যেখানে ৪৬ জনের প্রাণহানি, রূপপুরে ১০০ কোটি টাকার টেন্ডার সিন্ডিকেট, চাকরির অধিকাংশ সময়ে বিদেশে থাকা, পিএইচডি ডিগ্রি সংক্রান্ত জালিয়াতি—এত কিছুর পরেও খালেকুজ্জামান টিকে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অতীতে ভুয়া সনদের ভিত্তিতে উচ্চতর শিক্ষাছুটির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং এক বছরের জন্য বেতন স্কেল স্থগিত রাখা হয়। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগগুলো আলোর মুখ দেখেনি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও দায়িত্ব ধরে রাখতে তিনি তৎপর রয়েছেন বলে দপ্তরের অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের দাবি। সম্প্রতি তাকে গুলশানে এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বাসভবন থেকে গভীর রাতে বের হতে দেখা গেছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে। নতুন মন্ত্রীসভা গঠনের পরেও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে তার যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বেইলি রোডে ৪৬ প্রাণহানি: কারিগরি ত্রুটি ও চার্জশিট বিতর্কে নতুন প্রশ্ন
রাজধানীর বেইলি রোডে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় সাততলা বাণিজ্যিক ভবন ‘গ্রিন কোজি কটেজ’। ওই ঘটনায় ৪৬ জনের মৃত্যু এবং আরও অন্তত ১৩ জন দগ্ধ ও আহত হন।
ঘটনার পর জনমনে বড় প্রশ্ন উঠে—কেন ভবনটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না? কেন জরুরি নির্গমন পথের ব্যবস্থা রাখা হয়নি? কেন একমাত্র সিঁড়িটি ছিল এত সরু? বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কারিগরি ত্রুটিই প্রাণহানির মাত্রা বাড়িয়েছে।
ভবনটির নকশা অনুমোদন দিয়েছিলেন তৎকালীন রাজউক কর্মকর্তা প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। ২০১১ সালে অথরাইজড অফিসার হিসেবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তিনি এই অনুমোদন দেন। ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও পরবর্তীতে তা ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেও শেষ পর্যন্ত চার্জশিট থেকে তার নাম প্রত্যাহার করা হয়। এ সিদ্ধান্তকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এত বড় প্রাণহানির ঘটনায় কারিগরি অনুমোদন সংশ্লিষ্টদের দায় কতটা নির্ধারিত হয়েছে?
নিহতদের পরিবারগুলোর অভিযোগ, দায়ীদের বিচারের আওতায় না আনলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে। তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও করছেন বলে জানা গেছে।
দায়িত্ব পেয়েই শতাধিক বদলি
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই খালেকুজ্জামান চৌধুরী একাধিক স্মারকের মাধ্যমে ব্যাপক বদলি আদেশ জারি করেন। ৪ নভেম্বর এবং ১৭-১৮ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা বিভিন্ন আদেশে নির্বাহী প্রকৌশলী, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলী পর্যায়ের প্রায় শতাধিক কর্মকর্তাকে ঢাকা, ময়মনসিংহ, নওগাঁ, রাজশাহী, বরিশাল, গাজীপুর, নোয়াখালী, ভোলা, পিরোজপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পদায়ন করা হয়।
একাধিক কর্মকর্তা রিজার্ভ পদ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা অনেককে অন্যত্র সংযুক্ত করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এসব বদলির ফলে দপ্তরের ভেতরে বিভাজন তৈরি হয়েছে।
কিছু কর্মকর্তার দাবি, এসব বদলি অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে এবং নির্দিষ্ট স্বার্থগোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সূত্র দাবি করেছে, কিছু পদায়নের পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অতীতের অভিযোগ ও বিতর্ক
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে অতীতে পিএইচডি ডিগ্রি সংক্রান্ত জটিলতা, উচ্চতর শিক্ষাছুটির অনিয়ম, বিদেশে অবস্থান এবং চাকরি সংক্রান্ত নানা অভিযোগ ওঠে। পাবনা গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ‘গ্রিন সিটি’ নির্মাণের দরপত্র প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগও রয়েছে।
এছাড়া তার চাকরিজীবনের একটি বড় অংশ বিদেশে কাটানোর বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। যদিও এসব বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রশাসনিক ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসেনি।
প্রশাসনিক বিভাজন ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরে তার নেতৃত্বে প্রশাসনিক প্রভাব আরও দৃঢ় হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দপ্তরের ভেতরে বিভাজন, বদলি কার্যক্রম এবং অতীতের অভিযোগ—সব মিলিয়ে নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও ভবন নিরাপত্তা তদারকির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। তাই প্রধান প্রকৌশলীর নিয়োগ, বদলি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে খালেকুজ্জামানের বক্তব্য জানতে চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
চলবে....