নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবন সংস্কারকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, অস্বচ্ছতা এবং ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ধরা পড়েছে সরকারি তদন্তে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাত্র ৩০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ১৬ লাখ টাকায়, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই ২০২৫ সালের মার্চে গোপনে সংস্কার কাজ শুরু হয়। কাজের প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকতার খাতিরে দরপত্র আহ্বান করা হয়। তদন্ত কমিটি এই প্রক্রিয়াকে সরাসরি নিয়মবহির্ভূত ও প্রহসনমূলক বলে মন্তব্য করেছে। অভিযোগ রয়েছে, আগে থেকেই নির্ধারিত ঠিকাদারকে বৈধতা দিতেই এমন কাগুজে দরপত্র আয়োজন করা হয়।
গুলশান-৬ নম্বর সড়কের ১ নম্বর প্লটে অবস্থিত চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবনের সংস্কারের প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ ছিল ৩০ লাখ টাকা। তবে চূড়ান্ত হিসাবে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা, যা প্রায় সাত গুণ বেশি। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ব্যয় বৃদ্ধি অযৌক্তিক এবং পরিকল্পিত আর্থিক অনিয়মের স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। ব্যয়ের খাত, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং বাস্তব কাজের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যও শনাক্ত হয়েছে।
এই ঘটনায় প্রধান নগর স্থপতি মোস্তাক আহমেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাহাত মুসলেমীনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ এবং দায়িত্ব পালনে গুরুতর ব্যত্যয় ঘটেছে।
এছাড়া, সাবেক চেয়ারম্যান মো. দিদিকুর রহমানের নামও আলোচনায় এসেছে। তবে গত বছরের ২৪ অক্টোবর তার মৃত্যু হওয়ায় তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, কাজ শেষ হওয়ার পর দরপত্র আহ্বান করা দুর্নীতির একটি প্রচলিত কৌশল, যেখানে প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা পুরোপুরি উপেক্ষিত থাকে। এতে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয় না এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতাও ভেঙে পড়ে।
যদিও তদন্ত কমিটি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে, এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কঠোর পদক্ষেপের খবর পাওয়া যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এটি কি বিচ্ছিন্ন অনিয়ম, নাকি পুরো ব্যবস্থার ভেতরে গভীর দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
এদিকে অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রধান নগর স্থপতি মোস্তাক আহমেদ দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয় এবং তদন্তে তাদের দায়মুক্ত করা হয়েছে। তবে এ সংক্রান্ত কোনো প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেননি। অপরদিকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাহাত মুসলেমীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট মহল দ্রুত তদন্ত সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম রোধ করা যায়।