নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর কর্মচারী আব্দুল মোমিনকে ঘিরে নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তার পদোন্নতি ও প্রভাব বিস্তার অব্যাহত রয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
১৯৯৮ সালে দৈনিক হাজিরাভিত্তিক কর্মচারী হিসেবে চাকরি শুরু করেন আব্দুল মোমিন। ২০০১ সালে চাকরি হারানোর পর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ২০১৩ সালে পুনরায় চুক্তিভিত্তিকভাবে কাজে ফেরেন। ২০১৭ সালে চাকরি স্থায়ী হওয়ার পর থেকেই তার জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজউকের একাধিক সূত্র দাবি করেছে, অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে তিনি ডাটা এন্ট্রি অপারেটর থেকে কানুনগো পদে পদোন্নতি পান।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থের বিনিময়ে প্ল্যান অনুমোদন, প্লট হস্তান্তর ও বিক্রিতে দালালী, আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া এবং ব্যক্তিগত অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ। এসব অভিযোগের কিছু বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৭১ নম্বর ওয়ার্ডে ৫ কাঠা জমির ওপর ‘শান্তির নীড় সুলতানা মহল’ নামে সাততলা ভবন নির্মাণ করেছেন তিনি, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। এছাড়া মান্ডা এলাকায় আরও একটি বহুতল ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে।
মতিঝিল এলাকায় প্রায় ১৮০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া ব্যবহৃত ব্যক্তিগত গাড়ির মূল্য ৩৫ লাখ টাকার বেশি বলে জানা গেছে। স্ত্রীর নামে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে একাধিক প্লট থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।
স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে বিত্তশালী হয়ে ওঠা মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনিরের সঙ্গে কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ রয়েছে, যেখানে আব্দুল মোমিনের নামও উঠে এসেছে বলে দাবি সূত্রগুলোর।
দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২৩ সালে রাজউকের ২৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করলে সেই তালিকায় আব্দুল মোমিনও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অনুসন্ধানে তার সম্পদের বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে জানা যায়।
রাজউকের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র জানিয়েছে, পূর্ববর্তী সরকারের সময় প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও অনুসন্ধান অনেক ক্ষেত্রে চাপা পড়ে যায়। এমনকি নিজেকে উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তির আত্মীয় পরিচয় দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজউকের কোনো কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
দুদক সূত্র জানায়, রাজউকের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অভিযোগ রয়েছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। তবে এসব তদন্তের অনেকগুলোই পূর্ববর্তী সময়ে থমকে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পুরনো অভিযোগগুলো পুনরায় তদন্ত করা হলে আরও বড় দুর্নীতির চিত্র সামনে আসতে পারে।
একজন দৈনিক হাজিরাভিত্তিক কর্মচারী থেকে অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠার বিষয়টি এখন বড় প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এটি ব্যক্তিগত সাফল্য নাকি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির প্রতিফলন, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।
অভিযুক্ত আব্দুল মোমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং দাবি করেন, তিনি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন।