নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) পরিচালিত প্রায় সাড়ে ৬শ’ কোটি টাকার একটি সেচ উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্য ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও চট্টগ্রাম সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, “চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় ভূ-উপরিস্থ পানির মাধ্যমে সেচ উন্নয়ন” প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থেকেই তিনি একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে নুরুল ইসলাম এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার এবং ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ বণ্টনের অভিযোগ ওঠে। প্রকল্পের নানা কাজ তড়িঘড়ি করে সম্পন্ন দেখিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।
স্বল্প সময়ে শত শত টেন্ডার সম্পন্ন
গণঅভ্যুত্থানের পর গত ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটির টেন্ডার কার্যক্রমে অস্বাভাবিক গতি দেখা যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, মাত্র ৪০ দিনের কম সময়ে ৪৬১টি টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। এমনকি সরকারি ছুটির দিনেও ওয়ার্ক অর্ডার ইস্যু করার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
কৃষি উপদেষ্টার কাছে পাঠানো এক লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নিয়মনীতি উপেক্ষা করে দ্রুততার সঙ্গে কাজ বণ্টন করা হয়েছে, যাতে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করা সহজ হয়।
খাল খননের নামে দায়সারা কাজ
প্রকল্পের আওতায় খাল পুনঃখনন, পুকুর ও জলাধার খনন, কালভার্ট নির্মাণ, ডাগওয়েল স্থাপনসহ বিভিন্ন সেচ অবকাঠামো তৈরির কথা রয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক স্থানে খাল খননের নামে শুধু দুই পাশের আগাছা পরিষ্কার করা হয়েছে। কোথাও সামান্য মাটি কেটে পাশে ফেলে রাখা হয়েছে, যা বৃষ্টির পানিতে আবার খালে ভরে গেছে।
এছাড়া কালভার্ট নির্মাণেও নিম্নমানের কাজ ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
একই পরিবারের প্রতিষ্ঠানের দখলে জরিপ কাজ
প্রকল্পের ভূমি জরিপ সংক্রান্ত কাজ পেয়েছে “ডিজিটাল সার্ভে কনসালটেন্সি” এবং “ল্যান্ড সার্ভে টিম” নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, এ দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিক মা ও মেয়ে। ফলে টেন্ডার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গাড়ি ভাড়ায় কোটি টাকার ব্যয়
প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের জন্য “মেসার্স বিপ্লব ট্রেডার্স” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে চার বছরের জন্য তিনটি গাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৮১ লাখ টাকায়। বিএডিসির অভ্যন্তরীণ সূত্রে প্রচলিত রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিকানা প্রকল্প পরিচালক নুরুল ইসলামের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট।
এছাড়া নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে তিনি টেন্ডার বাছাই কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা পিপিআর নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ওটিএম বাতিল করে ম্যানুয়াল টেন্ডার
অভিযোগ অনুযায়ী, অন্তত ১০টি টেন্ডার প্রথমে ওটিএম পদ্ধতিতে আহ্বান করা হলেও পরে তা স্থগিত করে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে নতুন করে আহ্বান করা হয়। এতে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
একইভাবে ‘এন. মোহাম্মদ প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে জাল অভিজ্ঞতা সনদের ভিত্তিতে প্রায় ১১ কোটি টাকার পিভিসি পাইপ সরবরাহের কাজ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
অস্বাভাবিক সম্পদের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, চাকরির সুযোগ ও প্রভাব ব্যবহার করে নুরুল ইসলাম রাজধানীর মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে নিজের, স্ত্রী ও সন্তানের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট কিনেছেন। শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও তার সম্পদ রয়েছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।
আগেও উঠেছিল দুর্নীতির অভিযোগ
২০২১ সালে মুজিবনগর সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক থাকাকালে ঘুষ গ্রহণ ও প্রকল্পে ব্যক্তিগত গাড়ি সরবরাহ সংক্রান্ত অভিযোগ ওঠায় চার মাসের মাথায় তাকে সেই দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়। পরে তাকে হবিগঞ্জ অঞ্চলে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়।
হবিগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে অফিস ভবন নির্মাণ প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। বিএডিসির অভ্যন্তরীণ তদন্তে ভবন নির্মাণে প্রায় ৩৬টি খাতে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগ ধামাচাপার অভিযোগ
বিএডিসির একাধিক কর্মকর্তার দাবি, নুরুল ইসলামের বড় ভাই সংস্থার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা হওয়ায় তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ রহস্যজনকভাবে চাপা পড়ে গেছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পের অর্থ লুটপাট করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অসদাচরণের অভিযোগও
এদিকে, তার বিরুদ্ধে অধীনস্থ নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে অসদাচরণ ও কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, বহিরাগত নারীদের নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত অফিস কক্ষে অবস্থান করার ঘটনাও ঘটেছে বলে তারা দাবি করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক মো. নুরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
চলবে....