মো: হাফিজুর রহমান শফিক: সাঈদুর রহমান রিমন' বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে এক প্রজ্ঞাবান, সাহসী এবং সত্যনিষ্ঠ নাম। একাধারে তিনি একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, অন্যদিকে সম্পাদকীয় দায়িত্বে থেকেও তিনি তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার নিরলস সংগ্রামী হিসেবে পরিচিত। কয়েক দশকের পেশাগত জীবনে তিনি সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে। ৩০ জুলাই বুধবার সাইদুর রহমান রিমনের আকর্ষিক মৃত্যুতে সাংবাদিকতার আলোকিত অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। তার মৃত্যুতে শোকাভিভূত সারাদেশে অসংখ্য অনুজ অগ্রজ সমসাময়িক সহযোদ্ধাগণ।
সাইদুর রহমান রিমন' সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা হয় মানিকগঞ্জের অত্যন্ত এলাকা থেকে। সেই সময় থেকে দেশের গণমাধ্যমে তার পথচলা শুরু হয় কঠিন বাস্তবতা ও সত্য অনুসন্ধানের লক্ষ্য নিয়ে। দীর্ঘ এই পথচলায় তিনি যেসব গণমাধ্যমে কাজ করেছেন, সেখানে শুধু সাধারণ সংবাদ নয়, বরং অজানা, উপেক্ষিত ও গোপন সত্য উন্মোচনে নিয়োজিত থেকেছেন সর্বদা।
রিমনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো কেবল শিরোনামেই নয়, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মনেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা, সরকারি অর্থ আত্মসাৎকারী কর্মকর্তা ও গুম-খুনের নেপথ্যের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন একের পর এক সাহসী প্রতিবেদনের মাধ্যমে। প্রতিটি প্রতিবেদনই তথ্যপ্রমাণ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়ায় তার সাংবাদিকতা পাঠকদের কাছে দ্রুত আস্থা অর্জন করে।
তাঁর জীবনের একটি আলোচিত ঘটনা হলো, এক বৃদ্ধা নারী তার লেখা পড়েই এতটাই প্রভাবিত হন যে, নিজের সঞ্চিত সম্পত্তি তার নামে লিখে দিতে চান। তবে রিমন তা বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেন, যা তাঁর সততা ও মানবিক অবস্থানের অনন্য দৃষ্টান্ত।
এই দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে সাঈদুর রহমান রিমন পেয়েছেন ১১টি জাতীয় পুরস্কার। এসব পুরস্কার কেবল তার কাজের স্বীকৃতিই নয়, বরং সমাজে সৎ সাংবাদিকতার আদর্শ প্রতিষ্ঠায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তবে এই সাহসিকতা ও স্পষ্টবাদিতার মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছে। একাধিকবার তাঁর ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে চক্রান্ত, হুমকি এবং এমনকি হত্যার ষড়যন্ত্র চালানো হয়েছে। তাঁকে থামিয়ে দিতে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা ও হামলার মতো ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু কখনও তিনি ভীত হননি বা পিছু হটেননি। বরং প্রতিটি বাধা তাঁর পেশাগত অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করেছে।
জীবন ও পেশায় সাঈদুর রহমান রিমন শুধু একজন সাংবাদিক নন—তিনি সাংবাদিকতার নীতিমালা, দায়িত্ববোধ এবং নির্ভীকতার প্রতীক। আজকের যুগে যখন গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে, তখন রিমনের মতো অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা সমাজকে সত্যের আয়নায় দেখতে শেখান এবং সাহস দেন অন্যদেরও।
দেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় সাঈদুর রহমান রিমনের জীবনী ও সাংবাদিকতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে—যেখানে সত্যের পক্ষে অবিচল থাকা যায়, যদি সদিচ্ছা এবং সাহস থাকে।
তবে সাংবাদিক সাইদুর রহমান রিমন এর মৃত্যু নিয়ে তার শুভাকাঙ্ক্ষী- সহকর্মীদের মাঝে প্রশ্নের দানা বেঁধেছে। তাদের কাছে তার মৃত্যু রহস্যময় মনে হয়েছে। এবিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেককেই সরব দেখা গেছে।