• ১৭ই এপ্রিল ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

ফেনীর সাব-রেজিস্ট্রার শাহ আলম ও দলিল লেখকদের দুর্নীতির কারিশমা

সকালের সংবাদ ডেস্ক;
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১, ০৯:১২ পূর্বাহ্ণ
ফেনীর সাব-রেজিস্ট্রার শাহ আলম ও দলিল লেখকদের দুর্নীতির কারিশমা

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাব-রেজিস্ট্রার, দলিল লেখক, নকল নবীশ, পিয়ন ও দালালদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ফেনী সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে সেবা নিতে আসা ভুক্তভোগীরা। সাব রেজিস্ট্রার দুর্নীতিবাজ দলিল লেখকদের সাথে আতাত করে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে দলিল সম্পাদনের অভিযোগ নতুন কিছু নয়।

সুযোগ সন্ধানি দলিল লেখকরা জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে সরকারী রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। ঘুষ লেনদেনে অতিতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে বলে কানা ঘোষা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে দলিল লেখক ও অফিস স্টাফদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করলেও চাকুরীচুত্য হওয়ার ভয়ে সরাসরি কেউ মুখ খুলছেন না।

সরেজমিনে জানা গেছে, দলিল প্রতি অতিরিক্ত ৪/৫ হাজার টাকা গুনতে হয়। এর মধ্যে ১ হাজার টাকা কল্যাণ তহবিল ২ হাজার ৩৬ টাকার রয়েছে আরেকটি হিসাব। ৩ হাজার ৩৬ টাকা হিসাব যখন সামনে আসে তখন কিন্তু কোন দলিল লেখকরাই আসল কথা বলে না। তাঁরা (দলিল লেখক) দলিল গ্রহিতাদের কাছে জমির সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারন করেই টাকার হিসাব দেয়। তারপর কারসাজি করে সবচেয়ে কমমূল্যে জমির দলিল, স্ট্যাম্প, আকডুম বাকডুম খরচ সব মিলিয়ে সীমাহিন দূর্ভোগে উপজেলাবাসি।

অনেকে বলে দলিল লেখকদের প্যাঁচে আমরা অসহায়। অফিস খরচ বলে টাকার ভাগাভাগিতে দলিল লেখক সমিতি, নকলনবিশ, সাব রেজিস্ট্রার, অফিস সহকারী (কেরানী), পিয়ন ও অফিস খরচ। প্রতিদিনকার সরাসরি হিসাব কষেন অফিস সহকারী( পিয়ন) সিরাজুল ইসলাম ও সাবরেজিস্টার এর শ্যালক শামীম। সিরাজুল ইসলাম ও শ্যালক শামীম সাব রেজিস্ট্রারের খুব আস্থাভাজন বলেই কেউ কোন প্রকার কথাও বলতে পারছে না বলে জানা যায়। এ চক্রের সাথে রয়েছে দলিল লেখক, পিয়ন সিরাজুল ইসলাম, শ্যালক শামীম ও সাবরেজিস্টার।

অফিসের বাহিরে একটি সিটিজেন চার্টার দেয়া আছে কিন্তু সেটির কোন কার্যকারিতা অফিসে নেই। এমনকি সেই সিটিজেন চার্টারটি দেখার অনুপযোগি হলেও তার দেখার কেউ নেই। ভুয়া কাগজপত্র হলে সাব রেজিস্ট্রার ম্যানেজ করেই দলিল সম্পাদন হয়। বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকান থেকে খারিজ, দাখিলা ও বিআরএস প্রিন্ট করে দলিল হচ্ছে অহরহ। বনের জমি রেজিস্ট্রিতে সরাসরি কথা বলতে হয় সাব রেজিস্ট্রারের সাথে। খাস কামরার দরজা বন্ধ করে দফারফা হয় সেখানে। আর এসব দেখা শুনার জন্য আলাদা লোক বাছাই করে দেয়া আছে তাঁর। সাব রেজিস্ট্রার সপ্তাহে ৪ দিন এবং দেরিতে অফিস করায় সেবা গ্রহিতাদের সীমাহীন দূর্ভোগ পোহাতেও হচ্ছে। তিনি নিজের সময় মতো এজলাসে বসলে দলিল নিয়ে শুরু হয় দৌড়াদৌড়ি। অলিখিত একজন পিএস শ্যালক শামীমের ইশারা পেলেই দলিল লেখকদের ম্যাসেজ দেন স্যার উঠে পড়বে দলিল থাকলে তাড়াতাড়ি। আর জমির শ্রেণী পরিবর্তন করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকিতে পিছিয়ে নেই সংশ্লিষ্টরা।

আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন ম্যানুয়াল-২০১৪ এর অধ্যায়-২৬ এ উল্লেখ আছে যে, সহকারীগণ কর্তৃক দলিল পরীক্ষাকরণ কাঙ্খিত নহে, এই কার্যটি অবশ্যই স্বয়ং নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা কর্তৃক সম্পাদিত হইবে। এরপরও সাব-রেজিষ্ট্রার নিবন্ধন ম্যানুয়াল অনুযায়ী নিজের কাজ নকল নবিশ, উম্মেদার ও পিওনদের দিয়ে করাচ্ছেন। দলিল চেক করার কাজ সাব-রেজিষ্ট্রারের করার নিয়ম থাকলেও তা মানছেন না তিনি।

অনুসন্ধানে ২১ টি দলিলের বিষয়ে সাবরেজিস্ট্রার ও
দলিল লেখকদের যোগসাজশে নানা অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ ইং সালে রেজিষ্ট্রি হওয়া দলিলের মধ্যে যে ২১ টি দলিলের শ্রেনী পরিবর্তন করে দলিল রেজিষ্ট্রি করা হয় পরবর্তীতে ৬ টি দলিলের মৌজা অনুযায়ী রাজত্ব ফি পুনরায় ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে সংশোধন করা হয়েছে বলে জানায় সাব রেজিস্ট্রার। এই ০৬টি দলিল লেখকরাও জানায়, যে কোন শ্রেনীর জমি রেজিস্ট্রি করতে হলে সাব রেজিস্ট্রার সাহেবই সকল কাগজ পত্রাদি যাচাই বাছাই করেন। এখানে শ্রেণীর কোন পরিবর্তন হলে এর দায় পুরোটাই সাব রেজিস্ট্রারের। এই ছয়টি দলিল লেখক হলো ১. রহিম উল্যাহ বাবলু (সনদ নং -০১/১৪), ২. শেখ সেলিম ( সনদ নং -২৩১/৯৮), ৩. মো: শহিদ উল্যাহ (সনদ নং – ৬৩/৩৭), ৪. মোহাম্মদ ফারুক ( সনদ নং – ৩০৭), ৪. আমির হোসেন পিবলু (সনদ নং – ১৩/১৮)।

সবশেষে ২১ টি দলিলের মধ্যে বাকি ১৫ টি দলিলের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোন সংশোধন করা হয়নি। এই ১৫ টি দলিলের মধ্যে ১১ টি দলিলই মীর মোহাম্মদ দলিল লেখকের বাকি ৪ টির দলিল লেখক জসিম উদ্দিন ( সনদ নং – ১৬/০৬), মাহমুদুল হাসান(সনদ নং – ০২৬/১৫), ফরিদ আহাম্মদ ( সনদ নং -) । এই ১৫ টি দলিলে প্রায় ৬ কোটি ৪৬ লক্ষ ২১ হাজার টাকা রাজস্ব হারিয়েছে সরকার।

দলিল লেখক মীর মোহাম্মদ (সনদ-নং – ২২৬) জানায়, আমি একজন সাধারণ দলিল লেখক। বছরে শত-শত দলিল লেখি এবং দলিল রেজিষ্ট্রি করি। গ্রাহকদের কথা অনুযায়ী আমরা দলিল লেখক দলিল লেখে সাব রেজিস্ট্রার এর নিকট ফাইল জমা দেয়া হয়। কাগজ পত্রাদি যাচাই-বাছাইয়ের কাজ সাব রেজিস্ট্রারের। তবে আমার কোন দলিলের বিষয়ে আপত্তি থাকলে সাব রেজিস্ট্রার অফিসের সাথে আমিই বুঝে নিবো।

দলিল লেখক সমিতির সভাপতি মো. আনিসুর রহমান ফিরোজ জানায়, এসকল অনিয়মের বিষয়ে সভাপতি হিসেব আমি কিছুই বলতে পারবো না, তবে যে সকল দলিল লেখকরা এমন অনিয়মের সাথে জড়িত আপনি তাদের সাথে কথা বলতে পারেন।

এসব অনিয়মের বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার মো. আসরাফুজ্জামান এর মুঠোফোনে বারবার ফোন ও ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোন প্রকার জবাব দেননি।