ঢাকা ০১:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo গ্যাস সংকট আগের সরকারের পাপের ফল: ডা. জাহেদ Logo ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এআই-নির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চালু Logo প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন যুবরাজ বিন সালমান Logo ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo সরকারের ১৮০ দিনের সালতামামি: ধ্বংসস্তূপ থেকে পরিকল্পিত পুনর্গঠনের পথে বাংলাদেশ Logo শিগগিরই জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করবে সরকার : নজরুল ইসলাম খান Logo রাষ্ট্র ও মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই সরকারের বড় সাফল্য:সালেহ শিবলী Logo শেখ হাসিনার কোন স্ট্যাটাসে ভারতে আছেন জানা নেই: চিফ প্রসিকিউটর Logo ১০ বছরের জ্বালানি পরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপনের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর Logo আগামীকাল কিশোরগঞ্জ সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী

শ্যামলী-আদাবরের আতঙ্ক হাসু-কাসু

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:০৮:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ অক্টোবর ২০১৯ ২৪৪ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে এলাকায় অপরাধের ত্রাস কায়েম করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল হাসেম ওরফে হাসু। ২০০২ সালে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে গড়ে তোলেন ক্যাডার বাহিনী। আদাবর ও শ্যামলী এলাকায় অর্ধশতাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট দখল করে নিয়েছেন হাসুর ক্যাডার বাহিনী। এছাড়া সরকারি খাসজমি দখলের অভিযোগ তো পুরনো। চাঁদাবাজি, অবৈধ মাদক ব্যবসা করে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন হাসু ও তার বড় ভাই থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবুল কাসেম কাসু- এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

শুধু তা-ই নয়, এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখতে ছাত্রলীগের দুই নেতাকর্মীকে হত্যা এবং নিজ দলীয় একাধিক নেতাকর্মীর ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে কাউন্সিলর হাসু ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা করে দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করায় ২০১২ সালে হাসু ও তার বড় ভাই থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবুল কাসেম কাসুকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি সাদেক খান ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান স্বাক্ষরিত ওই বহিষ্কারাদেশে বলা হয়, ‘সংগঠনের নাম বিক্রি করে নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য জমি, বাড়ি দখল, ক্যাডার বাহিনী লালন-পালন এবং এসব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্যাতন এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি মুছে সেখানে নিজের ছবি লাগানোর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে এলাকায় খুন, ডাকাতি, লুটপাটে জড়িত থাকার অপরাধে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলো।’

একাধিক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করে বলেন, জমি-প্লট দখল হাসু ও তার বড় ভাই কাসেমের নেশা। কোনো জমি ও প্লটের ওপর নজর পড়লে, সেটা দখলে মরিয়া হয়ে ওঠেন তারা। ক্যাডার বাহিনী লেলিয়ে ভয়ভীতি ও হামলা চালিয়ে দখল করে নেয়া হয় প্লট ও ফ্ল্যাট। এমনও হয়েছে, ক্যাডার বাহিনী দিয়ে জমি দখল করে ওই জমির মালিকের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদাও হাতিয়ে নেয় তারা।

বাবুল মিয়া নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘চার বছর আগে আমার আদাবরের মনসুরাবাদে ওয়াসা পাম্পের পাশের বি-৫৫ নম্বর প্লটের ওপর নজর পড়ে হাসুর। প্লটটি দখলে নিতে তার বড় ভাই আবুল কাসেম ও ভাগ্নে আবাসন ব্যবসায়ী শাওন বিশ্বাসের নেতৃত্বে আমার ওপর হামলা চালানো হয়। তার ক্যাডার বাহিনী ধারাল অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি প্রায় ৪০টি কোপ দেয়। মারা গেছে ভেবে ফেলে চলে যায় সন্ত্রাসীরা। ভাগ্যগুণে ওই যাত্রায় আমি বেঁচে যাই। এরপর হাসুর ভাগ্নেকে আসামি করে মামলা করি। কিন্তু তারা এখনও বহাল তবিয়তে। আমার জমিও তাদের দখলে।’

ভুক্তভোগী মো. ইয়াসিন আলী বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে শেখেরটেক মফিজ হাউজিং এলাকার সাত কাঠা জমি দখল করে হাসু-কাসুর লোকজন। আমার ম্যানেজারকে রাতে মেরে বের করে দেয়। আমাকে এখনও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে তেজগাঁওয়ের ডিসি, র‌্যাব-২, আদাবর থানা- সব জায়গায় অভিযোগ দিয়েছি। আইজিপি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবরও অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কেউ আমাকে সহযোগিতা করেনি। আমি কোর্টের বারান্দায় ঘুরি আর আমার জমি ভোগদখল করে খাচ্ছে কাউন্সিলর হাসু ও তার ভাই কাসু।

ভুক্তভোগীরা আরও জানান, আদাবরের মনসুরাবাদ, শ্যামলী, শেখেরটেক এলাকায় প্রকাশ্যে চলে তার দখলবাজি। কয়েক বছর আগে আদাবর এলাকার হারুন ও কামাল নামের দুই ব্যক্তির ৫৬ কাঠা জমি দখল করে নেয় হাসুর ক্যাডার বাহিনী। সেখানে শাওন ট্রেডার্স নামের একটি দোকান উঠিয়ে ভোগদখল করছে তারা। পরে সেখানে সাতটি প্লট তৈরি করে বিক্রি করে দেয়। এছাড়া আদাবরের ১০ নম্বর রোডের পাঁচ কাঠার প্লট, শেখেরটেকের ৭ নম্বর রোডের তিন কাঠার প্লট, বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটিতে আট ও ১০ কাঠার দুটি প্লট, উত্তর আদাবরের আজিজ গার্মেন্ট নামের ছয়তলা বাড়িসহ অর্ধশতাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট-বাড়ি দখলে নিয়েছে হাসুর ক্যাডার বাহিনী।

শ্যামলীর রামচন্দ্রপুর মৌজার জমির মালিক মো. আলী হোসেন বলেন, কাউন্সিলর হাসু ও তার ভাই কাসুর কাজই হচ্ছে জমি দখল করা। রামচন্দ্রপুর মৌজার ২০৩নং দাগের ৬৪ কাঠা, ২০৯নং দাগের ১৯০ কাঠা দখল করে রেখেছে। এ সংক্রান্ত মামলায় একটায় জজকোর্টের রায় আমার পক্ষে এসেছে। (জিএল-১, এর ভেতরে ২০৯ দাগের জজকোর্ট থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত, মামলা নং- ১৭৪)। আরেকটা মামলা বিচারাধীন। কিন্তু কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে প্রাণনাশের হুমকির মাধ্যমে আমার জমি দখলে রেখে সেখানে বিভিন্ন ভবন, রিকশা ও ওয়ার্কশপের গ্যারেজ তৈরি করে ভোগদখল করছে।’

‘হাসুর ক্যাডার বাহিনী আমি ছাড়াও আরও অনেকের প্লট ও বাড়ি দখল করে রেখেছে। কিন্তু বরাবরই কাউন্সিলর আবুল হাসেম ওরফে হাসু থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। থানা পুলিশ, এমনকি র‌্যাবকেও যেন তিনি ম্যানেজ করে রেখেছেন!’

তিনি আরও বলেন, ‘আদাবরে মিশন স্কুল কর্তৃক আলিফ হাউজিংয়ের নির্মাণকাজ চলছিল। আমি ইট, বালু ও সিমেন্ট সরবরাহের কাজ করছিলাম। কিন্তু কাউন্সিলর হাসুর লোকজন কাজটি না পেয়ে আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। ২০১৬ সালের অতর্কিতভাবে আমার ওপর হামলা চালানো হয়। ব্যাপক মারধর করে পঙ্গু করে দেয়া হয়। এখন আমি কোনো কাজ করতে পারি না।’

হামলার শিকার আদাবর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ বলেন, ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করে এলাকায় অপরাধের রাজত্ব কায়েম করেছেন হাসু কমিশনার। তার নেতৃত্বে এলাকায় জমি দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এসবের প্রতিবাদ করলেই তার ক্যাডার বাহিনীর হামলার শিকার হতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘হাসু তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে এলাকায় অন্তত অর্ধশতাধিক প্লট, জমি ও বাড়ি দখল করে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি দলীয় নাম ভাঙিয়ে এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।’

‘আদাবরের গত কমিটির ছাত্রলীগের পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মশিউর রহমান মশু হত্যায় জড়িত সাগর ও সেলিম হাসুর খুব কাছের লোক। এছাড়া তার ক্যাডার বাহিনীর হামলার শিকার ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একাধিক নেতাকর্মী’- যোগ করেন তিনি।

হাসুর রাজনৈতিক উত্থান

একসময় কাউন্সিলর আবুল হাসেম ওরফে হাসুর পুরো পরিবার ছিল বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২০০২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আদাবরের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। পরের বার আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হোন। গড়ে তোলেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে থানা ছাত্রলীগের পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মশিউর রহমান মশুকে ২০১৭ সালে হত্যা করে তার ক্যাডার সেলিম। এলাকায় তার ক্যাডার বাহিনী ছাড়া অন্য কেউ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলে তার ওপর হামলে পড়ে হাসুর ক্যাডার বাহিনী। এছাড়া বিটিভির সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম হত্যার সঙ্গে তার ক্যাডার বাহিনীও জড়িত। ওই হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে হাসুর ক্যাডার বাহিনীর সাতজনকে গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব।

হাসুর ক্যাডার বাহিনী

এলাকায় দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা পরিচালনায় কমিশনার হাসুর রয়েছে বিশাল ক্যাডার বাহিনী। তার ক্যাডার হিসেবে কাজ করেন মোজ্জাম্মেল হক, ইদ্রিস আলী ওরফে পলিথিন ইদ্রিস, স্বাধীন, ইয়াসিন, আলামিন, মধু, রায়হান, ইমরান, মাহমুদ দুলাল। তাদের নেতৃত্বে চলে সব অপকর্ম।

হাসুর ক্যাডার বাহিনীর মাদক ব্যবসা

আদাবর থানা এলাকার ১০টি স্পটে চলে হাসুর ক্যাডার বাহিনীর মাদক ব্যবসা। আলিফ হাউজিং, মনসুরাবাদ হাউজিং, শনির বিল বস্তি, শেখেরটেক, আদাবর ১০ সহ প্রায় ১০টি স্পটে তার ক্যাডার বাহিনীর নেতৃত্বে চলে মাদক বাণিজ্য।

হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলা

আদাবর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ২০১২ সালের ১৭ নভেম্বর মামলা করা হয়। মামলা নং-১৬। হামলার শিকার রিয়াজ মাহমুদ বলেন, এ মামলার বাইরেও দুই ভাই হাসু-কাসুর বিরুদ্ধে অনেক ভুক্তভোগী মামলা করেছেন। দুই ডজনেরও বেশি জিডি ও মামলা রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু অজানা কারণে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) আনিসুর রহমান বলেন, দুর্নীতি ও ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানকালে যার বিরুদ্ধেই অভিযোগ আসুক না কেন সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেয়া রয়েছে ব্যবস্থা নিতে। এক্ষেত্রে কে কাউন্সিলর, কে সরকারদলীয় নেতা, তা আমলে নেয়া হবে না। কাউন্সিলর হাসুর সঙ্গে আমার এখনও সে রকম পরিচয় হয়নি। তার বিরুদ্ধে হওয়া জিডি ও মামলাগুলোর খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকলে অবশ্যই নেয়া হবে।

হাসু যা বলেন

এসব অভিযোগের বিষয়ে কাউন্সিলর আবুল হাসেম হাসু বলেন, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। আমি তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর। আমাকে সরিয়ে দেয়ার জন্য অপজিশনরা (বিরোধী পক্ষ) নানা জায়গায় মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে যাচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :
error: Content is protected !!

শ্যামলী-আদাবরের আতঙ্ক হাসু-কাসু

আপডেট সময় : ০৯:০৮:১৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ অক্টোবর ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক

জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে এলাকায় অপরাধের ত্রাস কায়েম করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ৩০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল হাসেম ওরফে হাসু। ২০০২ সালে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে গড়ে তোলেন ক্যাডার বাহিনী। আদাবর ও শ্যামলী এলাকায় অর্ধশতাধিক প্লট ও ফ্ল্যাট দখল করে নিয়েছেন হাসুর ক্যাডার বাহিনী। এছাড়া সরকারি খাসজমি দখলের অভিযোগ তো পুরনো। চাঁদাবাজি, অবৈধ মাদক ব্যবসা করে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন হাসু ও তার বড় ভাই থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবুল কাসেম কাসু- এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

শুধু তা-ই নয়, এলাকায় আধিপত্য ধরে রাখতে ছাত্রলীগের দুই নেতাকর্মীকে হত্যা এবং নিজ দলীয় একাধিক নেতাকর্মীর ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে কাউন্সিলর হাসু ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে। অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা করে দলীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করায় ২০১২ সালে হাসু ও তার বড় ভাই থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আবুল কাসেম কাসুকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা থানা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি সাদেক খান ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান স্বাক্ষরিত ওই বহিষ্কারাদেশে বলা হয়, ‘সংগঠনের নাম বিক্রি করে নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য জমি, বাড়ি দখল, ক্যাডার বাহিনী লালন-পালন এবং এসব ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্যাতন এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি মুছে সেখানে নিজের ছবি লাগানোর অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে এলাকায় খুন, ডাকাতি, লুটপাটে জড়িত থাকার অপরাধে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হলো।’

একাধিক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করে বলেন, জমি-প্লট দখল হাসু ও তার বড় ভাই কাসেমের নেশা। কোনো জমি ও প্লটের ওপর নজর পড়লে, সেটা দখলে মরিয়া হয়ে ওঠেন তারা। ক্যাডার বাহিনী লেলিয়ে ভয়ভীতি ও হামলা চালিয়ে দখল করে নেয়া হয় প্লট ও ফ্ল্যাট। এমনও হয়েছে, ক্যাডার বাহিনী দিয়ে জমি দখল করে ওই জমির মালিকের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদাও হাতিয়ে নেয় তারা।

বাবুল মিয়া নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘চার বছর আগে আমার আদাবরের মনসুরাবাদে ওয়াসা পাম্পের পাশের বি-৫৫ নম্বর প্লটের ওপর নজর পড়ে হাসুর। প্লটটি দখলে নিতে তার বড় ভাই আবুল কাসেম ও ভাগ্নে আবাসন ব্যবসায়ী শাওন বিশ্বাসের নেতৃত্বে আমার ওপর হামলা চালানো হয়। তার ক্যাডার বাহিনী ধারাল অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি প্রায় ৪০টি কোপ দেয়। মারা গেছে ভেবে ফেলে চলে যায় সন্ত্রাসীরা। ভাগ্যগুণে ওই যাত্রায় আমি বেঁচে যাই। এরপর হাসুর ভাগ্নেকে আসামি করে মামলা করি। কিন্তু তারা এখনও বহাল তবিয়তে। আমার জমিও তাদের দখলে।’

ভুক্তভোগী মো. ইয়াসিন আলী বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে শেখেরটেক মফিজ হাউজিং এলাকার সাত কাঠা জমি দখল করে হাসু-কাসুর লোকজন। আমার ম্যানেজারকে রাতে মেরে বের করে দেয়। আমাকে এখনও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে তেজগাঁওয়ের ডিসি, র‌্যাব-২, আদাবর থানা- সব জায়গায় অভিযোগ দিয়েছি। আইজিপি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবরও অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু কেউ আমাকে সহযোগিতা করেনি। আমি কোর্টের বারান্দায় ঘুরি আর আমার জমি ভোগদখল করে খাচ্ছে কাউন্সিলর হাসু ও তার ভাই কাসু।

ভুক্তভোগীরা আরও জানান, আদাবরের মনসুরাবাদ, শ্যামলী, শেখেরটেক এলাকায় প্রকাশ্যে চলে তার দখলবাজি। কয়েক বছর আগে আদাবর এলাকার হারুন ও কামাল নামের দুই ব্যক্তির ৫৬ কাঠা জমি দখল করে নেয় হাসুর ক্যাডার বাহিনী। সেখানে শাওন ট্রেডার্স নামের একটি দোকান উঠিয়ে ভোগদখল করছে তারা। পরে সেখানে সাতটি প্লট তৈরি করে বিক্রি করে দেয়। এছাড়া আদাবরের ১০ নম্বর রোডের পাঁচ কাঠার প্লট, শেখেরটেকের ৭ নম্বর রোডের তিন কাঠার প্লট, বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটিতে আট ও ১০ কাঠার দুটি প্লট, উত্তর আদাবরের আজিজ গার্মেন্ট নামের ছয়তলা বাড়িসহ অর্ধশতাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট-বাড়ি দখলে নিয়েছে হাসুর ক্যাডার বাহিনী।

শ্যামলীর রামচন্দ্রপুর মৌজার জমির মালিক মো. আলী হোসেন বলেন, কাউন্সিলর হাসু ও তার ভাই কাসুর কাজই হচ্ছে জমি দখল করা। রামচন্দ্রপুর মৌজার ২০৩নং দাগের ৬৪ কাঠা, ২০৯নং দাগের ১৯০ কাঠা দখল করে রেখেছে। এ সংক্রান্ত মামলায় একটায় জজকোর্টের রায় আমার পক্ষে এসেছে। (জিএল-১, এর ভেতরে ২০৯ দাগের জজকোর্ট থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত, মামলা নং- ১৭৪)। আরেকটা মামলা বিচারাধীন। কিন্তু কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে প্রাণনাশের হুমকির মাধ্যমে আমার জমি দখলে রেখে সেখানে বিভিন্ন ভবন, রিকশা ও ওয়ার্কশপের গ্যারেজ তৈরি করে ভোগদখল করছে।’

‘হাসুর ক্যাডার বাহিনী আমি ছাড়াও আরও অনেকের প্লট ও বাড়ি দখল করে রেখেছে। কিন্তু বরাবরই কাউন্সিলর আবুল হাসেম ওরফে হাসু থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। থানা পুলিশ, এমনকি র‌্যাবকেও যেন তিনি ম্যানেজ করে রেখেছেন!’

তিনি আরও বলেন, ‘আদাবরে মিশন স্কুল কর্তৃক আলিফ হাউজিংয়ের নির্মাণকাজ চলছিল। আমি ইট, বালু ও সিমেন্ট সরবরাহের কাজ করছিলাম। কিন্তু কাউন্সিলর হাসুর লোকজন কাজটি না পেয়ে আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। ২০১৬ সালের অতর্কিতভাবে আমার ওপর হামলা চালানো হয়। ব্যাপক মারধর করে পঙ্গু করে দেয়া হয়। এখন আমি কোনো কাজ করতে পারি না।’

হামলার শিকার আদাবর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ বলেন, ‘ক্ষমতার অপব্যবহার করে এলাকায় অপরাধের রাজত্ব কায়েম করেছেন হাসু কমিশনার। তার নেতৃত্বে এলাকায় জমি দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এসবের প্রতিবাদ করলেই তার ক্যাডার বাহিনীর হামলার শিকার হতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘হাসু তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে এলাকায় অন্তত অর্ধশতাধিক প্লট, জমি ও বাড়ি দখল করে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি দলীয় নাম ভাঙিয়ে এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন।’

‘আদাবরের গত কমিটির ছাত্রলীগের পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মশিউর রহমান মশু হত্যায় জড়িত সাগর ও সেলিম হাসুর খুব কাছের লোক। এছাড়া তার ক্যাডার বাহিনীর হামলার শিকার ছাত্রলীগ ও যুবলীগের একাধিক নেতাকর্মী’- যোগ করেন তিনি।

হাসুর রাজনৈতিক উত্থান

একসময় কাউন্সিলর আবুল হাসেম ওরফে হাসুর পুরো পরিবার ছিল বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২০০২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আদাবরের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। পরের বার আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন নিয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হোন। গড়ে তোলেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে থানা ছাত্রলীগের পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক মশিউর রহমান মশুকে ২০১৭ সালে হত্যা করে তার ক্যাডার সেলিম। এলাকায় তার ক্যাডার বাহিনী ছাড়া অন্য কেউ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকলে তার ওপর হামলে পড়ে হাসুর ক্যাডার বাহিনী। এছাড়া বিটিভির সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম হত্যার সঙ্গে তার ক্যাডার বাহিনীও জড়িত। ওই হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে হাসুর ক্যাডার বাহিনীর সাতজনকে গ্রেফতার করেছিল র‌্যাব।

হাসুর ক্যাডার বাহিনী

এলাকায় দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসা পরিচালনায় কমিশনার হাসুর রয়েছে বিশাল ক্যাডার বাহিনী। তার ক্যাডার হিসেবে কাজ করেন মোজ্জাম্মেল হক, ইদ্রিস আলী ওরফে পলিথিন ইদ্রিস, স্বাধীন, ইয়াসিন, আলামিন, মধু, রায়হান, ইমরান, মাহমুদ দুলাল। তাদের নেতৃত্বে চলে সব অপকর্ম।

হাসুর ক্যাডার বাহিনীর মাদক ব্যবসা

আদাবর থানা এলাকার ১০টি স্পটে চলে হাসুর ক্যাডার বাহিনীর মাদক ব্যবসা। আলিফ হাউজিং, মনসুরাবাদ হাউজিং, শনির বিল বস্তি, শেখেরটেক, আদাবর ১০ সহ প্রায় ১০টি স্পটে তার ক্যাডার বাহিনীর নেতৃত্বে চলে মাদক বাণিজ্য।

হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলা

আদাবর থানা ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ২০১২ সালের ১৭ নভেম্বর মামলা করা হয়। মামলা নং-১৬। হামলার শিকার রিয়াজ মাহমুদ বলেন, এ মামলার বাইরেও দুই ভাই হাসু-কাসুর বিরুদ্ধে অনেক ভুক্তভোগী মামলা করেছেন। দুই ডজনেরও বেশি জিডি ও মামলা রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু অজানা কারণে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) আনিসুর রহমান বলেন, দুর্নীতি ও ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানকালে যার বিরুদ্ধেই অভিযোগ আসুক না কেন সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেয়া রয়েছে ব্যবস্থা নিতে। এক্ষেত্রে কে কাউন্সিলর, কে সরকারদলীয় নেতা, তা আমলে নেয়া হবে না। কাউন্সিলর হাসুর সঙ্গে আমার এখনও সে রকম পরিচয় হয়নি। তার বিরুদ্ধে হওয়া জিডি ও মামলাগুলোর খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ থাকলে অবশ্যই নেয়া হবে।

হাসু যা বলেন

এসব অভিযোগের বিষয়ে কাউন্সিলর আবুল হাসেম হাসু বলেন, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। আমি তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর। আমাকে সরিয়ে দেয়ার জন্য অপজিশনরা (বিরোধী পক্ষ) নানা জায়গায় মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে যাচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট।