• ১৫ই এপ্রিল ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২রা বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

সরাইলে রাতের আধারে ৪৬ জন শহিদের নামফলক উপরে ফেললো দুর্বত্তরা।

সকালের সংবাদ ডেস্ক;
প্রকাশিত জুলাই ২০, ২০১৯, ১২:২৪ অপরাহ্ণ
সরাইলে রাতের আধারে ৪৬ জন শহিদের নামফলক উপরে ফেললো দুর্বত্তরা।

সরাইল, প্রতিনিধি
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরাইল উপজেলার ধর্মতীর্থ এলাকার ঐতিহাসিক বধ্যভূমি থেকে রাতের আধারে ৪৬জন শহিদের নাম ফলকটি উপরে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। গত ১০ জুলাই সন্ধ্যা রাতে সরাইল- নাসিরনগর লাখাই আঞ্চলিক সড়কের পাশে সরাইলের ধর্মতীর্থ বধ্যভূমিতে এ ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা প্রতিবাদ কর্মসূচি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে যানাযায় স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ১৮ অক্টোবর চুন্টা এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের একই পরিবারের ২২ সদস্যসহ শতাধিক নিরীহ লোক ও মুক্তিযোদ্ধাকে এই জায়গায় নির্মমভাবে হত্যা করেছিলো পাকবাহিনী। বধ্যভূমিটি এখন দখলে রয়েছে বর্তমান উপজেলা আ’লীগের যুগ্ম আহবায়ক ফরহাদ রহমান মাক্কি মিয়া নামের এক প্রভাবশালীর হাতে। গত ১৮ জুন ঐ জায়গায় ‘এম আব্দুল্লাহ ফরহাদ ফিলিং স্টেশন’ নামে একটি পেট্রোল পাম্প করার অনুমতি চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে অনাপত্তিপত্র চেয়ে আবেদন করেছেন ফরহাদ রহমানের ছেলে আব্দুল্লাহ ফরহাদ। ৪ জুলাই জেলাপ্রশাসক ২০৪নং স্বারকে তদন্ত করে অনাপত্তি প্রতিবেদন চেয়ে সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে প্রেরণ করেন। ইউএনও পাঠান সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারজানা প্রিংকার নিকট। সহকারী কমিশনারের মৌখিক নির্দেশে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরী করেন সার্ভেয়ার মোঃ ইব্রাহিম খান। সহকারী কমিশনার ৯ জুলাই প্রতিবেদনটি প্রেরণ করেন নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর। পরে ১০ জুলাই ইউএনও প্রতিবেদনটি পাঠান জেলাপ্রশাসক কার্যালয়ে। এরই মধ্যে সন্ধ্যা রাতেই বধ্যভূমি থেকে উপরে ফেলা হয় শহিদদের নাম ফলকটি।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও স্থানীয় সূত্র জানায় , ধর্মতীর্থ এলাকায় সড়কের পাশের সওজের খালটি দিয়ে স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই কালি কচ্ছ ইউনিয়ন ও আশপাশের ইউনিয়নের পানি নিস্কাশন হয়ে আসছিলো। এখানে ছিলো একটি নৌঘাট, ধর্মতীর্থ নামে। ৭১সালে বর্তমান কালিকচ্ছ বিজিবি ক্যাম্পটি ছিলো ঘাটিবাড়ি রাজাকার ও পাকসেনাদের ক্যাম্প। চুন্টা সেনবাড়ির ২২জন সহ সরাইল থানায় ও কালিকচ্ছ ক্যাম্পে আটক শতাধিক লোককে ১৮ অক্টোবর ধর্মতীর্থ নৌঘাটে সারিবদ্ধভাবে দাড় করিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলো পাকবাহিনী। এদের মধ্যে ৪৯ জনের পরিচয় মিলেছিল। পরবর্তীতে এই জায়গাটি ধর্মতীর্থ বধ্যভূমি ও গনহত্যা ভূমি নামে পরিচিত।
গনহত্যা নির্যাতন ও মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র কতৃক প্রকাশিত কবি জয়দুল হোসেনের লেখা “ধর্মতীর্থ গণহত্যা” নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এই বধ্যভূমিটি বর্তমানে মন্নাফ ঠাকুরের ভাগিনা মাক্কি মিয়ার দখলে রয়েছে। সওজের খাল সংলগ্ন পশ্চিম পাশে ৪৭৩৬ ও ৮৮৩১ দুই দাগের ৩৪ শতাংশ জায়গা ১০ বছরআগে ক্রয় করেন ফরহাদ রহমান।
২০১৭ সালের মার্চ মাসে স্থানীয় সাবেক সাংসদ এডঃ জিয়াউল হক মৃধার সহায়তায় এই ভূমিটিতে ১২ ফুট উচ্চতা ৪ ফুট প্রস্থের লোহার তৈরী একটি ফলক স্থাপন করা হয়। ফলকে ৪৬ জন শহিদের নামের তালিকা লাগানো হয়। ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর জেলা প্রশাসক হায়াত উদ দৌলা খান বধ্যভূমিটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুর রশিদ(৫৫), আব্দুল মোতালিব মিয়া(৫৩) ও জনাব আলী(৫৬) বলেন, এখানে একটি নৌঘাট ছিলো। ৭১ সালে পাঞ্জাবীরা এই ঘাটে মানুষকে হত্যা করেছে। এখানে একটা নাম ফলকও ছিল, গত বুধবার সন্ধ্যা রাতে কালি কচ্ছ এলাকার রাসেল ও নোয়াগাও এলাকার বাবু মুন্সী সহ কয়েক জন এসে নাম ফলকটি ভেঙ্গে নিয়ে যায়। রাসেল ও বাবু মাক্কি মিয়ার সাথেই থাকে। সরাইল মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার মোঃ আনোয়ার হোসেন বলেন, জায়গাটি অনেক আগেই বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অতীতেও সেখানে এমন ঘটনা ঘটেছে, এবার আমরা চিনতে পেরেছি। বুধবারের ঘটনা ঘটিয়েছে মুসা চেয়ারম্যানের ছেলে রাসেল ও বাবু মুন্সী নামের একটি ছেলে। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই, আমরা এই ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচি দেবো।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গত ১০ জুলাই জেলা প্রশাসকের কাছে অনাপত্তিপত্র প্রেরণ করেছেন, যেদিন প্রেরণ করেছে রাতেই নাম ফলকটি উপরে ফেলেছে দুর্বত্তরা।
এবিষয়ে জানতে চাইলে, নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এ এস এম মোসা , সেখানে পেট্রোল পাম্প করার অনাপত্তিপত্র প্রেরণ করার কথা স্বীকার করে বলেন, আমি নাম ফলকটি উপরে ফেলার কথা শুনেছি উর্ধতন কতৃপক্ষের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো।
ফরহাদ রহমানের কাছে এই বিষয়ে (মুঠোফোনে) জানতে চাইলে বলেন, এই বিষয়ে আমি কিছু জানিনা। দ্বিতীয়ত আমি আমার বড় ছেলে পেট্রোল পাম্প করার জন্য জায়গাটি কিনেছি। সড়ক ও জনপদের সংযোগ সড়ক সংলগ্ন এই জায়গাটি নিয়ম মেনে করা হয়েছে এবং সওজের কথা মতো ১৪ লাখ টাকা খরচ করে এখানে কার্লভার্ট নির্মাণ করা হয়। এখানে সরকারের পক্ষ থেকে বধ্যভূমি করা হয়েছে বলে আমি জানি না। এখানে সরকারের এক ছটাক জায়গা ও নাই। তিনি আরো বলেন জেলা প্রশাসককে জিজ্ঞেস করেন এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যার বিষয়ে কিছু বলতে পারবে না। নাম ফলক বসানো বা ভাঙ্গার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি জায়গার মালিক না হলে সরকার আমায় বাধা দিতো।