বন্যায় ভেসে গেছে প্রায় ১১ কোটি টাকার মাছ

সকালের সংবাদ ডেস্ক;সকালের সংবাদ ডেস্ক;
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৯:২৯ পূর্বাহ্ণ, ২৩ জুলাই ২০২০

জেলা প্রতিনিধি, নেত্রকোনা;

গত কয়েকদিনের অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার প্রধান নদ-নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে তৃতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে নেত্রকোনায়। এরই মধ্যে সোমবার রাত থেকে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলার কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, বারহাট্টা ও খালিয়াজুরির নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকায় প্রায় লক্ষাধিক মানুষ নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। খালিয়াজুরির বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ১১৫টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। ধনু ও উব্দাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার দুর্গাপুরে বুধবার (২২ জুলাই) সকালে ৫৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়।

জেলায় বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমন বীজতলা ছাড়াও বন্যায় ডুবে নষ্ট হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সবজি ক্ষেত। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে কৃষকের শ্রমে-ঘামে লালিত স্বপ্ন। পুকুর ডুবে ভেসে গেছে মাছ। জেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের হিসাব মতে, জেলার বিভিন্ন উপজেলার তিন হাজারেরও বেশি খামারির প্রায় ১১ কোটি টাকার মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।

গত এক সপ্তাহ আগে জেলার ১০টি উপজেলার মধ্যে প্রায় সাতটি উপজেলা দ্বিতীয়বার বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। তখন অন্তত ৯৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে শতাধিক মানুষ ঠাঁই নেয়। এর মধ্যে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কলমাকান্দা উপজেলার বাসিন্দারা।

স্থানীয় বাসিন্দা, জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত জুনের শেষ দিকে অব্যাহত বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, খালিয়াজুরি, মদন, মোহনগঞ্জ ও বারহাট্টা উপজেলার আংশিক এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়। এর দুই সপ্তাহ ব্যবধানে আবার বন্যা হয়। তখন প্রায় ৯৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এর মধ্যে কলমাকান্দায় প্রায় ৭০ হাজারের মতো মানুষ পানিবন্দি হয়। বন্যার কারণে আশ্রয়কেন্দ্রের পাশাপাশি বাঁধ, উঁচু সড়কে আশ্রয় নেয়া মানুষের খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দেয়। টানা পাঁচ দিন ধরে কলমাকান্দার সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকে। কলমাকান্দায় উব্দাখালী নদীর কলমাকন্দা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার সর্বোচ ৪৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ওই নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে বিপৎসীমা ৬ দশমিক ৫৫ মিটার। ওই সময়ের বন্যায় এক হাজার ২০০ কিলোমিটার কাঁচা-পাকা সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। দুই শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ওঠে। এছাড়া প্রায় তিনশ একর আমন বীজতলা ও বিভিন্ন ধরনের সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়। মৎস্য সম্পদেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফজলুল কবীর জানিয়েছেন, অন্তত ৩ হাজার ৩৬২ জন খামারির ৩ হাজার ৬৭৩টি পুকুরের মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। এতে ৯৩৯ দশমিক ৭৪ মেট্রিক টন মাছ ও ১৯২ দশমিক ১৮ মেকট্রিক টন পোনার ক্ষতি হয়েছে। মাছ, পোনা ও অবকাঠামোগত ক্ষতিসহ সব মিলিয়ে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ কোটি ৯১ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।

তিনি আরও জানান, গত ১৪ জুলাই থেকে বন্যার পানি কমে তিন দিন পর গত ১৭ জুলাই থেকে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়। কিন্তু গত ১৯ জুলাই রাত থেকে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আবারও জেলার কংস, সোমেশ্বরী, উব্দাখালী, ধনুসহ প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ফের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বুধবার (২২ জুলাই) বিকেল জানান, জেলার সব কটি প্রধান নদ-নদীর পানিই বাড়ছে। তবে ধনু ও উব্দখালী ছাড়া অন্যান্য নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। কলমাকান্দার উব্দাখালী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে বিপৎসীমা ৬ দশমিক ৫৫ মিটার। সেখানে প্রবাহিত হচ্ছে ৬ দশমিক ৮২ মিটার। দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর বিজয়পুর পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৫ দশমিক ৮৯ মিটার। সেখানে পানির উচ্চতা ১৪ দশমিক ২৬ মিটার। ওই নদীর দুর্গাপুর পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৪ দশমিক ২৬ মিটার, সেখানে পানি প্রবাহিত হচ্ছে ১২ দশমিক ১০ মিটার উচ্চতায়। কংস নদের জারিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমা ১০ দশমিক ৫৫ মিটার, সেখানে প্রবাহিত হচ্ছে ৯ দশমিক ৯৫ মিটার। আর খালিয়াজুরির ধনু নদের খালিয়াজুরি পয়েন্টে বিপৎসীমা ৭ দশমিক ১২ মিটার, সেখানে পানি প্রবাহিত হচ্ছে ৭ দশমিক ৭১ মিটার উচ্চাতায়।

আক্তারুজ্জামান জানান, আজ মোহনগঞ্জে ২৭ দশমিক ৪ মিলিমিটার, সদর উপজেলায় ১৭ মিলিমিটার, জারিয়ায় ৩০ মিলিমিটার ও দুর্গাপুরে ৫৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়।

খালিয়াজুরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম আরিফুল ইসলাম জানান, খালিয়াজুরিতে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ইতোমধ্যেই ৪৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে ১১৫টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন।

জেলা প্রশাসক মঈন উল ইসলাম বলেন, ‘পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির কারণে আবারও পানি বাড়ছে। তবে বৃষ্টি না হলে হয়তো পানি কমে যেতে পারে।

তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যায় এ পর্যন্ত ১৬৫ মেকট্রিক টন চাল, তিন হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও নগদ সাড়ে চার লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

মঈন উল ইসলাম জানান, জেলায় ৪০০ মেট্রিক টন জিআর, নগদ আট লাখ টাকা, শিশুখাদ্য কেনার জন্য দুই লাখ টাকা, গো-খাদ্য কেনার জন্য টাকা দুই লাখ টাকা এবং দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :